Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের জন্য সারা দেশে ইলিশ আহরন, পরিবহন ও বিপনন বন্ধ

ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ বন্ধের দাবী

নাছিম উল আলম | প্রকাশের সময় : ৮ অক্টোবর, ২০১৯, ৪:৫২ পিএম

নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করনের মাধ্যমে বংশ বিস্তারের লক্ষে মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের জন্য দেশের উপক’ল ভাগের ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার মূল প্রজননস্থলে সব ধরনের মাছ সহ সারাদেশে ইলিশের আহরন, পরিবহন ও বিপনন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মৎস বিজ্ঞানীদের সুপারিশের আলোকে ১৯৯৫ সলে সংশোধিত ১৯৫০ সালের ‘ফিস প্রটেশশন এন্ড কনজার্ভেশন আইন’ অনুযায়ী সরকার এলক্ষে গোজেট বিজ্ঞপ্তি জারী করেছে। প্রজননকালে ইলিশ আহরন বন্ধ থাকায় দেশে ইলিশের উৎপাদন আরো বাড়বে বলে আশা করছে মৎস অধিদপ্তর সহ বিজ্ঞানীগন। আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে ৪ দিন, পূর্ণিমার দিন ও পরের ১৭ দিন সহ মোট ২২ দিন দেশের অভ্যন্তরীন ও উপক’লীয় জলাশয়ে ইলিশ আহরন নিষদ্ধ থাকবে। এ লক্ষে মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে পুরো কার্যক্রম মনিটরিং করা হবে। এ সময়কালে ইলিশ আহরন বন্ধে জেলা-উপজেলা প্রশাসন ছাড়াও পুলিশ, কোষ্টগার্ড, র‌্যাব ও বাংলাদেশ নৌবাহিনী কঠোর নজরদারী চালাবে। তবে এ মূল প্রজননকালের আহরন নিষিদ্ধ সময়ে ভারতীয় জেলেরা বঙ্গোপসাগরে আমাদের নৌসীমা থেকে যাতে ইলিশ লুটে নিতে না পাড়ে সে বিষয়ে অধিকতর নজরদারীর দাবী জানিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের মৎসজীবীগন।
‘হিলসা ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্লান’এর আওতায় ২০০৫ সালেই সর্বপ্রথম প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশের আহরণ বন্ধ রাখা হয় ১০ দিন। ২০১১ সালে তা ১১ দিন এবং ২০১৫ সালে ১৫ দিনে এবং ২০১৭ সাল থেকে তা ২২ দিনে উন্নীত করা হয়। আমাদের অর্থনীতিতে জাতীয় মাছ ইলিশের একক অবদান এখন ১%-এরও বেশী। আর মৎস্য খাতে এমাছের অবদান প্রায় ১২-১৩%। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, সারাবিশ্বে উৎপাদন হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৬০% বাংলাদেশে উৎপাদিত ও আহরিত হয়ে থাকে। আর গতবছর দেশে যে প্রায় সোয়া ৫ লাখ টন ইলিশ আহরিত হয়েছে তার ৬০%ই পাওয়া গেছে বরিশালে বিভাগের অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় জলাশয় থেকে। গত দুই দশকে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১৫০%-এরও বেশী।
মৎস বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের ইকাসিস্টেমে সারা বছরই ৩০% ইলিশ ডিম বহন করে। এসব ইলিশ পরিপক্ক হয়ে ডিম ছাড়ে। যে ডিমগুলো পুরুষ ইলিশ দ্বারা নিষিক্ত হয়ে থাকে তা এ মাছের নতুন প্রজন্ম গঠন করে। আর আশ্বিনের পূর্ণিমার আগে পড়ের এ সময়ে দেশের চট্টগ্রাম উপক’লের মায়ানী পয়েন্টÑমীরসরাই, ভোলার পশ্চিম আউলিয়া পয়েন্টÑতজুমদ্দিন, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পয়েন্ট এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লতা চাপলি পয়েন্ট-এর ধলচর দ্বীপ, মনপুরাদ্বীপ, মৌলভীরচর দ্বীপ ও কালিরচর দ্বীপ এলাকায় মা ইলিশের অত্যাধীক প্রচুর্য লক্ষ করা যায়। ঐসব এলকার ৭হাজার বর্গ কিলোমিটারে আগামী ২২দিন সবধরনের মৎস আহরন নিষিদ্ধ থাকবে। ইলিশ আহরন নিষিদ্ধ ২২ দিনের এসময়কালে উপক’লের ১৭টি জেলার ৮৫টি উপজেলার বেকার জেলেদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় ৪০ কেজি করে চাল বিনামূল্যে প্রদান করা হবে বলে মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী জানিয়েছেন।
আশ্বিনের পূর্ণিমার এ মূল প্রজনন সময়ের ২২ দিন আহরন নিষদ্ধ সহ নভেম্বর থেকে জুনমাস পর্যন্ত জাটকা আহরন নিষদ্ধ করা সহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী বাস্তবায়নের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭-১৮ সালে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন এবং সদ্য সমাপ্ত অর্থ বছরে তা সোয়া ৫ লাখ টনেরও বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে। গত বছর আশ্বিনের পূর্ণিমার আগে পরের ২২ দিন ইলিশ আহরন নিষদ্ধকালীন সময়ে ৪৮% মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস গবেষনা ইনস্টিটিউট-বিএফআরআই। ইনস্টিটিউট-এর মতে প্রজননক্ষম মা ইলিশের হার ২০১৭ সালে ৭৩% থেকে ’১৮ সালে ৯৩%-এ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি প্রজনন সাফল্যের হারও ৮০%-এ উন্নীত হয়েছে। গত বছর ইলিশ আহরন নিষিদ্ধকালীন সময়ে দেশের উপক’লভাগের প্রজনন এলাকায় ৭ লাখ ৬ হাজার কেজি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। যার ৫০% ডিম পরিস্ফুটিত হয়ে ১০% বেঁচে থাকলেও দেশে গত বছর শুধু মূল প্রজনন মৌশুমে ৩ হাজার কোটি জাটকা মূল ইলিশ পরিবারে যূক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএফআরআই-এর বিশেষজ্ঞগন।
এমনকি গতবছর প্রজনকালীন সময়ে প্রজনন ক্ষেত্রসমুহে নমুনা পরিক্ষা করে ৮৩% ইলিশ রেনুপোনা পাওয়া যায়। এসময়ে ইলিশের মূল প্রজনন ক্ষেত্রসমুহে অন্যান্য মাছের রেনু পোনাও পাওয়া যায় ১৭%। ফলে ইলিশ আহরন নিষদ্ধকালীন ২২ দিনে উপক’লে অন্যান্য মাছেরও নিরাপদ প্রজনন স¤পন্ন হচ্ছে। যা দেশে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি সহ চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে মৎস অধিদপ্তর।
ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র ও মাইগ্রেশন পথ নির্বিঘœ রাখা সহ সামুদ্রিক মৎস সম্পদের মজুদ ও জীব বৈচিত্রকে আরো সমৃদ্ধ করার লক্ষে গত ২৬জুন থেকে নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম ‘সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বা মেরিন রিজর্ভ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মৎস বিজ্ঞানীদের মতে, দেশে এখনো নিষিদ্ধ ঘোষিত কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জাল সহ অন্যন্য ক্ষতিকর জাল দিয়ে যে পরিমান জাটকা আহরন করা হয়, তার এক-দশমাংশ রক্ষা করা গেলেও বছরে আরো অন্তত ১ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পেত।
মৎস বিজ্ঞানীদের মতে, অভিপ্রয়াণী মাছ ইলিশ তার জীবনচক্রে স্বাদু পানি থেকে সমুদ্রের নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়াণ করে। একটি পরিপক্ক ইলিশ প্রতিদিন শ্রোতের বিপরিতি ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলতে পারে। উপক’লের ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মূক্তভাবে ভাসমান ডিম থেকে ফুটে বের হবার পরে ইলিশের লার্ভা, স্বাদু পানি ও নোনা পানির নর্সারী ক্ষেত্রসমুহে বিচরন করে। এরা খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে। নার্সারী ক্ষেত্রসমুহে ৭Ñ১০সপ্তাহ ভেসে বেড়াবার পরে জাটকা হিসেব সমুদ্রে চলে যায় পরিপক্কতা অর্জনের লক্ষে। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় ১২Ñ১৮ মাস অবস্থানের পরে পরিপক্কতা অর্জন করে প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে। এর পরে তারা আবার স্বাদু পানির নার্সারী ক্ষেত্রে ফিরে আসে।
সমুদ্রে যাবার সময় পর্যন্ত যেসব এলাকায় জাটকা খাদ্য গ্রহন করে বেড়ে ওঠে সেগুলোকে মৎস বিজ্ঞানীগন গুরুত্বপূর্ণ নার্সারী ক্ষেত্র হিসেবে চিহিৃত করায় অভয়াশ্রম ঘোষনা করা হয়েছে। চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্য়ন্ত ১শ কিলোমিটার, মদনপুর থেকে ভোলার চরইলিশা হয়ে চরপিয়াল পর্যন্ত মেঘনার শাহবাজপুর চ্যানেলের ৯০ কিলোমিটার, ভোলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালী চর রুস্তম পর্যন্ত তেতুলিয়া নদীর ১শ কিলোমিটার,পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর ৪০কিলোমিটার, শরিয়তপুরের নরিয়া থেকে ভেদরগঞ্জ পর্যন্ত নিম্ন পদ্মার ১২০কিলোমিটার এবং বরিশালের হিজলা এবং মেহদিগঞ্জের লতা, নয়া ভাঙ্গনী ও ধর্মগঞ্জ নদীর মিলনস্থলের ৮২ কিলোমিটার এলাকায় নভেম্বর থে কে মার্চ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে অভয়াশ্রম ঘোষনা করে ইলিশ অধহরন নিষিদ্ধ করায় এ মাছের উৎপাদন আশাব্যাঞ্জকভাবে বাড়ছে।
আগামী ২২দিন দেশে ইলিশের আহরন, পরিবহন ও বিপনন বন্ধ থাকলে চলতি অর্থ বছরে এ মাছের উৎপাদন সাড়ে ৫ লাখ টনের কাছে পৌছতে পারে বলে আশাবাদী মৎস বিজ্ঞানীগন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ