Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

অবিচার-অনাচার ও বৈষম্যের মূলোৎপাটন করতে হবে

জামাল উদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ৯ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা লুণ্ঠন ও অপরাধ জগতের গডফাদারদের কেউ কেউ হঠাৎ করেই এলিট ফোর্স র‌্যাবের অভিযানে ধরা পড়তে শুরু করেছে। অনেকটা আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া এই অভিযান নিয়ে দেশের মানুষ কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠলেও অভিযান সম্পর্কে বিষ্ময়, সংশয় সন্দেহেরও কমতি নেই। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে গিয়ে এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, আরেকটি এক-এগারোর মত পরিস্থিতি যাতে না হয়, সে কারণেই চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযান সম্পর্কে সেনা প্রধানের একটি বিবৃতি থেকে বোঝা যাচ্ছে, এ ধরনের অভিযানে সেনাবাহিনীর সমর্থন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন, অপরাধিদের ধরতে কারো অনুমতির প্রয়োজন নেই। কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বরখাস্ত করার পর প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী যুবলীগের একশ্রেণীর নেতার অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এরপরই সেসব কথিত যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে র‌্যাবের অভিযান শুরু হয়। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়াকে গুলশান থেকে গ্রেফতার করার পর তার অফিস এবং মতিঝিলে তার নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে নগদ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব। এরপর একে একে ধরা পড়ে জিকে শামীম, কৃষকলীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, অনলাইন ক্যাসিনোর গডফাদার সেলিম, ক্লাব পাড়ার লোকমান হোসেন, আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গডফাদার জিসানকে দুবাই থেকে আটক করে ইন্টারপোল। মাত্র কয়েকদিনে সাঙ্গপাঙ্গসহ এই পাঁচজন ধরা পড়ার পর কিছুটা শিথিল হয়ে পড়া র‌্যাবের অভিযান নিয়ে জনমনে নতুন করে সংশয় দেখা দেয়। খালেদ ও জিকে শামীম ধরা পড়ার পর তাদের সাথে যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের সংশ্লিষ্টতাসহ দেশে-বিদেশে সম্রাটের জুয়াড়ি জীবনের নানা কাহিনী-উপাখ্যান বেরিয়ে আসে। অপরাধি যে বা যত বড়ই হোক তাকে ধরা হবে, এমনটাই বলা হয়েছিল সরকারের উচ্চ মহল থেকে। কিন্তু খালেদ ও জিকে শামীমের সাথেই সম্রাটকে ধরার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও প্রায় দুই সপ্তাহেও সম্রাটকে না ধরার কারণে র‌্যাবের অভিযান নিয়ে সমালোচকদের মুখ ক্রমেই মুখর হতে থাকার এক পর্যায়ে অবশেষে গত রবিবার কুমিল্লা থেকে সম্রাটকে তার ক্যাসিনো সহযোগী আরমানকেসহ ধরা হয়। একের পর এক ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান এবং যুবলীগ নেতাদের গ্রেফতারে হতচকিত যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ঢাকার ৬০টি স্থানে বছরের পর বছর ধরে ক্যাসিনোর জুয়া চলেছে, এতদিন কেন ক্যাসিনোর নায়কদের ধরা হয়নি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা কি এতদিন আঙুৃল চুষছিলেন? এই প্রশ্ন রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও গ্রেফতারের দাবী জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর এই অভিযোগও দাবী একেবারে ভিত্তিহীন নয়। ক্যাসিনো কি জিনিস তিনি নাকি তার কিছুই জানেন না, প্রসঙ্গক্রমে তিনি ক্যাসিনো দেখার আগ্রহও ব্যক্ত করেছেন। তবে গ্রেফতার অভিযান শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে গ্রেফতার হওয়া প্রায় সবার সঙ্গেই ওমর ফারুক চৌধুরীর সাথে ঘনিষ্টতার ছবি প্রকাশিত হতে থাকে। ক্যাসিনো সম্পর্কে ওমর ফারুক চৌধুরী যে অজ্ঞতার দাবী করেছেন তা ভণিতা ও সত্যতা নিয়ে এখানেই সংশয় তৈরী হয়। ক্যাসিনো সংশ্লিষ্ট যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর ওমর ফারুক চৌধুরীর বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার এক পর্যায়ে তিনি নাকি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিও আঙ্গুল তুলেছিলেন। অবশেষে জানা গেল, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনানসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব তলবসহ তার দুর্নীতি সম্পর্কেও খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো তেমন কিছুই জানা যায়নি, এক প্রকার রাখঢাক দেখা গেলেও ইতিমধ্যে যুবলীগ চেয়ারম্যানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাসহ সীমান্তে সর্তকতা জারি করা হয়েছে।

দেশ আজ দুর্নীতি, লুণ্ঠন, দখলবাজি, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, টেন্ডারবাজ, জুয়াড়ি, মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্রব্যবসায়ী, কালোবাজারি সিন্ডিকেটের মুনাফাবাজি ও মানিলন্ডারিংয়ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সামাজিক অবক্ষয় বল্গাহীনভাবে সামাজিক শান্তি-সৌহার্দ্য ও স্থিতিশীলতায় চরম অবনতি ঘটেছে। পাঁচ বছরের শিশু থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষণ-নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র হঠাৎ করেই এমন পরিস্থিতিতে পড়েনি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক অনিয়ম-অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক মোড়কে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদেরকে এহেন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করার কারণে এর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব বহুলাংশে দায়ী হলেও রাজনীতির মুখোশ পড়ে যেসব অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের প্রশাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় রাজনীতির লেজুড়ে পরিণত করেছে তারাও কম দায়ী নয়। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আত্মঘাতী প্রবণতা দেখা যায় না। এ ধরনের প্রবণতা জনগণের জন্য অত্যন্ত গ্লানিকর, গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত এবং রাষ্ট্রকে অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়। এভাবেই আমাদের দেশে বারবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ঘটেছে। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে অগণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত করার চোরাগলি দিয়ে সামরিক শাসন অথবা সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের পথ রচনা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জনগণ এবং সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের প্রথম টার্গেট হলেও যেসব আমলা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজনীতির মোড়কে সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পক্ষপাতদুষ্ট, অকার্যকর ও জনগণের কাছে আস্থাহীন করে তোলার জন্য দায়ী, সে সব আমলা ও কর্মকর্তারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও এমন রাজনৈতিক মোড়কে সন্ত্রাস-লুণ্ঠনের মচ্ছবে লিপ্ত হওয়ার এক পর্যায়ে সামরিক বাহিনীর প্রচ্ছন্ন প্রভাবে যৌথ বাহিনী অপারেশন ক্লিনহার্ট নামের দুর্নীতি-সন্ত্রাস বিরোধি অভিযান চালিয়ে ছিল। কয়েক মাসের অপারেশনে শত শত রাজনৈতিক কর্মী এই বাহিনীর হাতে বিনাবিচারে নিহত হয়েছিল। এমনকি সরকারী দলের এমপি, মন্ত্রীরাও হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন। অনেকেই আত্মগোপণে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা, সরকারের প্রথম সারির আমলা এবং প্রশাসনের স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দেশে এহেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেসব আমলা ও কর্মকর্তাদের তেমন কিছুই হয়না। যাদের ছত্রছায়া এবং যোগসাজশে জিকে শামীমরা হাজার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে অবৈধ ক্যাসিনো ও মদ-জুয়ার আসর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে সব কর্মকর্তারা নিয়মিত মাসোহারা আদায় করতো তারা অতীতেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল বর্তমানেও আছে। যে ক্ষোভ বা খেদ থেকেই যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী কথা বলুন না কেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সে সব সুবিধাভোগী-আঙুল চোষা ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো না হলে কোনো অভিযানেই অবস্থার বাস্তব বা টেকসই পরিবর্তন হবে না।
নানা ধরনের অপকর্ম ও ফৌজদারি অপরাধমূলক ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গত এক দশকে লক্ষাধিক পুলিশ সদস্য নানা মাত্রিক বিভাগীয় শাস্তির সম্মুখীন হলেও এর ফলে পুলিশে অপরাধ প্রবণতা কমেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণীর সদস্য ভাড়াটিয়া খুনির ভূমিকা পালন করার বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাতখুনের ঘটনায় এলিট ফোর্স র‌্যাবের সুনাম চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকা, মুক্তিপণ আদায়, মিথ্যা মামলায় নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির মত গুরুতর অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের তিরস্কার, বদলি বা বরখাস্ত করার মত সর্বোচ্চ শাস্তি লঘুদন্ড হিসেবেই বিবেচিত হয়। জনগনের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভুক্ত কর্মচারিরা যদি মানুষকে বিচার বঞ্চিত করে, হয়রানি করে, জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা কামানোর পর স্রফে বদলি বা চাকুরীচ্যুতির চেয়ে বেশি কোনো ঝুঁকি না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেসব অপরাধপ্রবণ সদস্যরা সে ঝুঁকি নিয়েই সব ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের এসপি, থানার ওসি-দারোগারা আইনের রক্ষক হিসেবে মাঠ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বেআইনী কার্যকলাপের ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই অভিযোগ জানাতে ভয় পায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সব অপরাধের অভিযোগ জনসম্মুখে আসে না। এরপরও বছরে ১২-১৩ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য বিভাগীয় লঘুদন্ডের সম্মুখীন হচ্ছে। তাহলে পুলিশের অপরাধপ্রবণ সদস্যের তালিকা কত দীর্ঘ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। যেসব পুলিশ সদস্য বিভাগীয় শাস্তির সম্মুখীন হচ্ছে তাদের অনেকেই গুরুদন্ডে দন্ডিত হওয়ার অপরাধে অপরাধী হওয়া সত্তে¡ও তারা লঘুদন্ড নিয়ে দিব্যি অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এদের অর্ধেকও যদি অপরাধ বিচারে দৃষ্টান্তমূলক গুরুদন্ডে দন্ডিত হতো তাহলে পুলিশের অপরাধ অনেকটা কমে আসতো। পুলিশ সরাসরি জনগনের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করার কারণে তাদের বেআইনী কর্মকান্ডের কারণে জনসাধারণকে ভুক্তভোগি হতে হয়। সামরিক বাহিনীর পেশাগত শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে সমাজে সরাসরি তেমন কোনো প্রভাব পড়েনা। সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গুরুতর অপরাধের জন্য বিভাগীয় শাস্তি বা কোর্ট মার্শালের সম্মুখীন হয়ে থাকেন। তবে সরকারী আমলা তথা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতার প্রভাব সমাজে সবচেয়ে বেশি পড়লেও তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি ছাড় দেয়া হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সামগ্রিক নীতিমালা এবং আইনকানুনগুলো যাদের হাত দিয়ে বাস্তব রূপ লাভ করে, তাদের হাত দিয়েই প্রশাসনে রদবদল, পদন্নোতি ও সুযোগ সুবিধার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে। এদের অযোগ্যতা, অদক্ষতা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং হীনস্বার্থের অপতৎপরতা সমাজ ও রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তারা সব সময়ই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। নানা অপরাধে অভিযুক্ত সরকারী দলের ক্যাসিনো গডফাদার ও ডাকসাইটে ক্যাডারদের ধরতে কারো অনুমতির প্রয়োজন নাই বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু যে সব সরকারী কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে জনগণকে সরকারী সেবা থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি পেশাদার অপরাধিদের সহযোগী হিসেবে কোটি কোটি টাকার ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলছেন তারা নিজেদের জন্য একের পর এক নিরাপত্তামূলক সুরক্ষা আদায় করে নিচ্ছেন। গত বছর অক্টোবরে পাশ হওয়া সরকারী চাকুরী আইনে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত সরকারী কর্মচারীদের গ্রেফতারে পূর্বানুমতির বিধান করা হয়েছে। এভাবেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুবিধাভোগী শ্রেণীটিকে জনগণের সেবকের স্থান থেকে বিশেষ আইনগত সুরক্ষাপ্রাপ্ত শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে।
সামাজিক অনাচার-অবিচার, বিশৃঙ্খলা, অবক্ষয় ও যুব সমাজের অপরাধ প্রবণ হয়ে ওঠার জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করা হচ্ছে। এই বিচারহীনতার শুরু ক্ষমতাদর্পি রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবনমন থেকে। আইনের চোখে সমতার নীতির ব্যত্যয় ঘটার কারণে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের লাখ লাখ নেতা-কর্মী সারাদেশে নিজেদেরকে আইন ও জবাবদিহিতার বাইরের শক্তি বলে ভাবতে শুরু করেছে। সিলেটের বদরুল, বরগুনার রিফাত, বগুড়ার তুফান সরকারের মত অসংখ্য তুফান সরকার সারাদেশে তাদের থাবা বিছিয়ে রেখেছে। একইভাবে থানায় বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তার দ্বারা নারী ধর্ষিত হওয়ার উদাহরণও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনা। ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদসহ গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন ডিআইজি প্রিজনের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতা ও অপকর্মের খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। সাবেক ডিআইজি প্রিজন পার্থ বণিকের বাসায় দুদক টীম অভিযান চালিয়ে নগদ ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে। আরো কয়েকজন ডিআইজি, জেলারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রাতারাতি টাকার কুমির হয়ে যাওয়ার কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। রাজনৈতিক মামলাবাজিকে টাকা কামানোর হাতিয়ারে পরিনত করার মধ্য দিয়ে গত এক দশকে কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা সরকারী দলের এমপি-মন্ত্রীদের টেক্কা দিতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা যায়। লুটেরা, টেন্ডারবাজ, দখলবাজ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ধরার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে অবস্থার টেকসই পরিবর্তন অসম্ভব। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ডিউটি অফিসারদের দায়িত্ব হচ্ছে, নাগরিকদের অভিযোগ রেকর্ড করা এবং প্রয়োজনে তদন্ত করে মামলা এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এখানে তাদের নিজেদের বিচারকের ভূমিকা পালনের সুযোগ না থাকলেও থানার একশ্রেনীর ওসি এখন নিজেদের ইচ্ছামত অভিযোগ নেয়া- না নেয়ার এখতিয়ার গ্রহণ করছে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতা বেড়ে চলেছে। কয়েকদিন আগে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে জানা যায়, দুদকে দায়ের করা জনগণের অভিযোগের শতকরা ৯৩ ভাগই তফশিলভুক্ত নয় এমন অজুহাতে আমলে নিচ্ছে না দুর্নীতি দমন কমিশন। এভাবেই দুর্নীতির লালনে দুর্নীতি দমন কমিশনও পরোক্ষভাবে ভ’মিকা পালন করছে। এ সপ্তাহে প্রকাশিত আরেকটি সংবাদে জানা যায়, স্বামীর নির্যাতনের বিচার চাইতে রাজশাহীর শাহ মাখদুম থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গিয়েছিল ১৯ বছরের তরুণী লিজা রহমান। কয়েকদিন থানায় ধর্ণা দিয়েও অভিযোগ দায়ের করতে ব্যর্থ হয়ে বিক্ষুব্ধ তরুণী থানার সামনে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যাওয়া তরুণী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে কয়েকদিন চিকিৎসাধীণ থাকার পর মৃত্যুবরণ করেছে। এই ঘটনা আমাদেরকে গত দশকে তিউনিসিয়ার সেই জেসমিন বিপ্লবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বেকার যুবক মোহাম্মদ বাওজিজি ভ্যান গাড়িতে পণ্য বিক্রি করতে গেলে পুলিশ তার গাড়ীটি একাধিকবার আটক করে এবং মোটা অংকের ঘুষ দাবী করে। এর প্রতিকার চাইতে বাওজিজি সিটি কাউন্সিলরের কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি প্রতিকারের বদলে তিরস্কার পেয়েছিলেন। প্রতিবাদে তিনি প্রকাশ্য রাস্তায় নিজের গায়ে পেট্টোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই আগুনের সাথে সাথেই পুরো তিউনিসিয়ার নাগরিক সমাজে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় স্বৈরশাসক বেন আলীর বিরুদ্ধে জেসমিন বিপ্লব। প্রায় দুইযুগ ধরে প্রবল প্রতাপশালী শাসক বেনআলী দেশ পদত্যাগ করে গোপণে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রভাবশালীদের দ্বারা নারীরা ধর্ষিত হয়, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, অভিযোগ দিতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর থানার সামনে নিজ গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করার পরও সমাজবিপ্লব তো দূরের কথা, নাগরিক সমাজের টনক নড়ে না। অপরাধিদের সাজাও হয় না। এভাবেই অবিচার, অনাস্থার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র। এসব অবিচার-অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের উত্তাল উত্থান ছাড়া এ থেকে মুক্তির স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা আমাদের সামনে নেই।
bari_zamal@yahoo.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন