Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার , ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৯ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের উদ্যোগ

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১১ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে রেলওয়ে। পরিবর্তে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে রূপান্তর করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে হাইস্পিড ট্রেনের জন্য রেললাইন নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই করছে রেলওয়ে। এটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ কোটি টাকা। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলপথটি রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয়ও হবে অনেক বেশি। এতে হাইস্পিড ট্রেনের ভাড়া পড়বে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিমান ভাড়ার কাছাকাছি। এতে করে হাইস্পিড ট্রেনে আশানুরূপ যাত্রী পাওয়া নিয়ে রয়েছে সংশয়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, এর প্রেক্ষিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেন যোগাযোগ উন্নয়নে বিকল্প উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে কুমিল্লার লাকসাম পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে কর্ড লাইন। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে রূপান্তর করা হবে। এতে ব্যয় হবে হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এ দুই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মাত্র আড়াই ঘণ্টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, হাইস্পিড ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে এক ঘণ্টা। তবে এক্ষেত্রে রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হবে কমপক্ষে এক লাখ কোটি টাকা। এছাড়া রেলপথটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড ট্রেনে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নিতে হবে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা, যা এ রুটের বিমান ভাড়ার সমান।
বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আন্তঃনগর ট্রেনে এসি চেয়ারের ভাড়া ৬৫৬ টাকা। আর এসি বার্থে যাত্রীদের গুনতে হয় এক হাজার ১৭৯ টাকা। কিন্তু হাইস্পিড ট্রেনে এই ভাড়া হবে এসি চেয়ারের ক্ষেত্রে পাঁচ গুণ এবং এসি বার্থের ক্ষেত্রে তিন গুণ।
অন্যদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিমানের ভাড়া তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। সময় লাগে সর্বোচ্চ ৫০ মিনিট। তাই বিমানের সমান ভাড়া হলে হাইস্পিড ট্রেনে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত সম্ভব নয় বলে মনে করছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা হবে দৈনিক গড়ে এক লাখ। তবে এর বড় অংশই দ্বিতীয় শ্রেণি, শোভন ও শোভন চেয়ারের যাত্রী। এক্ষেত্রে যাত্রীদের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ট্রেনে যাতায়াতে ব্যয় হয় যথাক্রমে ৯০ টাকা, ২৮৫ টাকা ও ৩৪৫ টাকা। এ হিসাবে হাইস্পিড ট্রেনে আশানুরূপ যাত্রী পাওয়া যাবে না। এতে বড় বিনিয়োগ করেও লোকসানের মুখে পড়বে প্রকল্পটি।
সূত্র জানায়, এসব হিসাব-নিকাশ করেই হাইস্পিড ট্রেনের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিকল্প প্রকল্প নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। এক্ষেত্রে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব কমিয়ে আনতে ৫০ বছর আগে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এজন্য ১৯৬৯ সালে কর্ড লাইন নির্মাণে পরিকল্পনা ও জরিপ সম্পন্ন হয়। এতে ঢাকা থেকে লাকসাম পর্যন্ত ১১০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হলে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে।
বর্তমানে উল্টো পথে অনেকটা ঘুরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে পাড়ি দিতে হয় ৩২৪ কিলোমিটার। তবে কর্ড লাইন নির্মাণ করা হলে এ দূরত্ব কমে দাঁড়াবে ২১৪ কিলোমিটার। যদিও কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়ে এ রেলপথ আর নির্মাণ করা হয়নি। সর্বশেষ ২০০৮ সালে এ রেলপথ নির্মাণে সমীক্ষা চালানো হয়। তবে সে সময় শুধু মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এবার ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণে নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের রেলপথ ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগেই। তবে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প প্রস্তাবটি ঝুলে ছিল। যদিও সরকারের সর্বোচ্চ মহলের আগ্রহে স¤প্রতি প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্ড লাইন নির্মাণ করা হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথ যাতায়াতের সময় এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে। আর ব্রডগেজ রেলপথে ট্রেনের গতিও মিটারগেজের চেয়ে অনেক বেশি। ঘণ্টায় কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার গতিতে এ পথে সাধারণ ট্রেন চালানো সম্ভব। এছাড়া রেলপথ ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন হলে তাতে চালানো হবে বৈদ্যুতিক (ইলেকট্রিক) ইঞ্জিন, যার এক্সেল লোড অনেক কম।
রেলওয়ের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা গেছে, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনের গতি সাধারণ ইঞ্জিনের চেয়ে কমপক্ষে দেড় গুণ বেশি হয়ে থাকে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে ব্রডগেজ ট্রেন চালানো যাবে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেনের সর্বোচ্চ গতিবেগ ৭৫ কিলোমিটার। অন্যান্য ট্রেনের গতিবেগ এর চেয়েও কম। ফলে কর্ড লাইন ও ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দুই থেকে সোয়া দুই ঘণ্টায় (বিরতিসহ) যাতায়াত করা সম্ভব হবে। আর ইলেকট্রিক ট্রেনের ভাড়াও সাধারণ ট্রেনের মতো কম। এতে বর্তমান ভাড়াতে রেলওয়ে মুনাফা করতে পারবে।
রেলওয়ে প্রকৌশল শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালে ভারতে পরিচালিত যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেনের ৬৫ শতাংশ ছিল ইলেকট্রিক। বাকি ৩৫ শতাংশ ছিল ডিজেলচালিত ট্রেন। আর ভারতীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পরিচালনা ব্যয়ের অর্ধেকে চলত ৬৫ শতাংশ ইলেকট্রিক ট্রেন। বাকি ৩৫ শতাংশ ডিজেলচালিত ট্রেনে অর্ধেক পরিচালন ব্যয় যেত। এতে ভারতের ইলেকট্রিক ট্রেনের মুনাফা থেকে ডিজেলচালিত ট্রেনে ভর্তুকি দেয়া হয়। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হলে তা রেলের জন্য লাভজনক হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে। বর্তমানে অনেক উন্নত বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়েছে। তাই রেলে আমূল পরিবর্তন আনতে হলে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ইলেকট্রিক রেলপথে খুব বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় না। তবে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে যাওয়ার আগে বর্তমান লাইনের যে অবস্থা, সেটির ওপর জোর দিতে হবে। হাজার হাজার বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিং একটি কাঠামোর মাধ্যমে আনতে হবে।



 

Show all comments
  • দীনমজুর কহে ১১ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:৩৮ পিএম says : 0
    এত বায়বহুল ট্রেনলাইন তৈরী করা কি শুধু যাত্রি পরিবহন সুবীদার জন্য ?না কি দ্রুত পন্য পরিবহন সুবিদা ও থাকবে??
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ট্রেন


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ