Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, ১২ শাবান ১৪৪১ হিজরী

কর্ণফুলীর ক্ষতি আর নয়

এই নদী রক্ষণাবেক্ষণে রূপরেখা তৈরি করুন চট্টগ্রামে গোলটেবিল আলোচনায় ভূমিমন্ত্রী

বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ১৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

অবৈধ দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে কর্ণফুলীর অবস্থা আজ ভয়াবহ। দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের প্রাণপ্রবাহ কর্ণফুলী নদীর দুর্দশা এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে টিকে থাকবে কিনা অর্থাৎ নদীটির অস্তিত্ব নিয়েই আমার সন্দেহ আছে।
যতদূর ক্ষতি হয়েছে, এখন যে অবস্থায় আছে তা আর ক্ষতি করতে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। দখল, ভরাট, দূষণ রোধ এবং কর্ণফুলী নদী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে একটি স্থায়ী ও টেকসই রূপরেখা তৈরির জন্য এখনই এগিয়ে আসতে হবে।

গতকাল শনিবার বন্দরনগরীর অভয়মিত্র ঘাটে ‘কর্ণফুলী নদী দখল-দূষণমুক্তসহ অবিলম্বে ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী উপরোক্ত অভিমত এবং নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি হাজার বছরের এই সমুদ্র বন্দরের ধারক কর্ণফুলী নদী সুরক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও সক্রিয় হওয়ার তাগিদ প্রদান করেন।

২১ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে চ্যানেল আই চট্টগ্রাম অফিস উক্ত আলোচনার আয়োজন করে। এতে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াল এডমিরাল জুলফিকার আজিজ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগ, সংস্থার কর্মকর্তা, গবেষকবৃন্দ, প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিবর্গও আলোচনায় অংশ নেন।
ভূমিমন্ত্রী আরও বলেন, এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কর্ণফুলী নদীর আর কোনো ক্ষতি করার সুযোগ কাউকে দেয়া যাবে না। আমি মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পরই আরএস দলিলমূলে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদী উদ্ধারের কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু আইনের প্রতি সম্মান রেখে বলছি মাঝপথে হাইকোর্টের নির্দেশনার কারণে সব বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমি চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে প্রত্যাশা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই নদীর রক্ষণাবেক্ষণে এগিয়ে আসুন।

কর্ণফুলী রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে ভ‚মিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের মধ্যে একমাত্র গড গিফটেড পোর্ট চট্টগ্রাম বন্দর। ২ হাজার ১শ’ বছরেরও বেশি এ বন্দরের বয়স। তাই কর্ণফুলী নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে ঘিরে সরকারের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, সবই সরকার করে দেবে এমন নয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ৮ শতাংশে থাকছে। রিজার্ভ বেড়েছে। কর্মসংস্থান বেড়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক। এর সঙ্গে যদি আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন না আসে তাহলে এতসব অর্জন টেকসই হবে না।

বন্দর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, নদী সুরক্ষায় দ্রুত যা যা করার করতে হবে। ড্রেজিং অত্যন্ত প্রয়োজন, বলিষ্ঠতার সাথে তা সম্পন্ন করুন। আমি চাই আপনি থাকাবস্থায় একটি ম্যানুয়াল তৈরি করে যান। যাতে টেকসই হয়। দরকার হলে বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বসতে হবে। বন্দরকেই অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করতে হবে। নদীর বালু এখন স্বর্ণের মতো দামি। অনেকে নানা ভাবে নদীর বালু নিয়ে যাচ্ছে। কর্ণফুলী নদী রক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখেই বন্দরকে দায়িত্ব নিতে হবে। কর্ণফুলীর দুই পাড়ঘেঁষে শিল্প-কারখানাগুলো সরাতে হবে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
বন্দরের প্রবেশমুখে কর্ণফুলীর মোহনায় লাইটারেজ জাহাজ বহরের যত্রতত্র পার্কিং বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, সাগরের সঙ্গে এ নদীর লিংক আছে। আমাদের বাণিজ্য বাড়ছে। লাইটারেজ জাহাজ বাড়ছে। ১০ বছর আগেও এত জাহাজ ছিল না নদীতে। এখন কেন? হতে পারে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে জাহাজ আসবে নদীতে। কিন্তু পার্কিংয়ের জন্য এ নদী নয়। নেভিগেশনে সমস্যা হচ্ছে। সিলটেশন, দূষণ হচ্ছে। বন্দরকে এ বিষয়টি কড়াকড়িভাবে দেখতে হবে। প্রয়োজনে কোস্টগার্ডের সহযোগিতা নিন।

পলিথিনের কারণে কর্ণফুলীতে ড্রেজার মেশিন অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ছবি দেখিয়ে মন্ত্রী বলেন, পলিথিনের ভারে এই ভয়াবহ অবস্থা। এটা কার দায়িত্বে পড়ে? সমন্বয়ের অভাব আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ হলে সময় ও টাকা বাঁচবে। সিটি করপোরেশন, সিডিএ সবাই সরকারের টাকা খরচ করছে। তা জনগণেরই টাকা। যথাযথ সমন্বয় থাকলে শুধুই কর্ণফুলী নয়, টেকসই চট্টগ্রাম মহানগর গড়ে তোলা সম্ভব।

কালুরঘাট নতুন সেতু নির্মাণের দাবি প্রসঙ্গে ভ‚মিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান কালুরঘাট সেতুটি বহু পুরনো। এখন যেহেতু দোহাজারী-ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন যাচ্ছে, আরেকটি সেতু অবশ্যই প্রয়োজন। বোয়ালখালীবাসীর দাবি সড়কসহ যেন সেতুটি হয়। এতে কোনো সমস্যা দেখছি না। তবে পিলারের কাছে যে পলি জমা হবে সেগুলো নিয়মিত অপসারণ করে নাব্যতা ঠিক রাখতে হবে। ব্রিজ নির্মাণে উন্নত প্রযুক্তি অনুসরণ করতে হবে যাতে পলি জমে নাব্যতার ক্ষতি না হয়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, কর্ণফুলী আমাদের অস্তিত্ব। এ নদীকে বেদখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে। কর্ণফুলীর সঙ্কটের জন্য বন্দরকে দায়ী করা হয়। ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা যাচ্ছে না, পলিথিনের স্তর জমে গেছে। কোনো মেকানিজমে কাজ হচ্ছে না। এরজন্য নাগরিকদের ভ‚মিকা বেশি। জনসচেতনতা প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথি চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়াল এডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, কর্ণফুলী নদীতে এক নম্বর জেটি অর্থাৎ নিচের দিকে নাব্যতা অনেক বেড়েছে। এখন ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ আসছে। কিন্তু উপরের দিকে নাব্যতা কমেছে। আমরা নিয়মিত ড্রেজিং করছি বলেই নাব্যতা বেড়েছে। উপরের দিকে পারছি না, সেখানে অনেক প্রতিবন্ধকতা। নদীর তলদেশে মাটি নেই, সব আবর্জনা আর পলিথিন। প্রতিদিন টনে টনে বর্জ্য যাচ্ছে নদীতে। আমরাও একমত কর্ণফুলী নদীর নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে, যত খরচই লাগুক। এ বিষয়ে একটি মনিটরিং কমিটি করা যায়।

জাহাজ চলাচল সুবিধার জন্য কর্ণফুলী নদীর বাঁকগুলো সোজা করার উপর গুরুত্ব দিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, কর্ণফুলী নদী আঁকাবাঁকা। একে সোজা করতে না পারলে জাহাজ চলাচলে সমস্যা থেকে যাবে। আমরা স্টাডি করছি। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা যেটা হচ্ছে, অনেক কিছুই ভাঙতে হবে। কারখানাগুলো কোথায় প্রতিস্থাপন করা যাবে তাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। সীমানা নির্ধারণও আরেক প্রতিবন্ধক।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন জানান, চলতি বছরে ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর হাইকোর্টে রিট এবং ১২টি মামলার কারণে কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করার প্রক্রিয়া থেমে আছে।
আলোচনায় আরও অংশ নেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম ফজলুল্লাহ, চিটাগাং চেম্বারের সহ-সভাপতি ও সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন, বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি এমএ সালাম, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক, হালদা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া, কর্ণফুলী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী, আইবিএফবি’র সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব, স্থপতি আশিক ইমরান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘কর্ণফুলী বাঁচাও আন্দোলন’র উদ্যোক্তা আলীউর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান চৌধুরী ফরিদ।



 

Show all comments
  • মাইনুল করিম ১৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১:৪২ এএম says : 0
    চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের প্রাণ ভোমরা কর্ণফুলী নদীর অবস্থা আজ বুড়িগঙ্গার মতোই। এ নদীকে না বাঁচাতে পারলে বাঁচবে কী বন্দর? দেশের অর্থনীতির কী পরিণাম হবে? সরকারকে এবং চট্টগ্রামবাসীকে সেটা গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। দখল দূষণ ভরাট কঠোর হস্তে বন্ধ করুন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কর্ণফুলী

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ