Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬, ০৫ শাবান ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

ইকোনমিক পলিসির আওতায় এ সিদ্ধান্ত

ঋণ খেলাপিদের বিশেষ সুবিধা-রিট শুনানিতে বিএবি’র কৌঁসুলি

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৮ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০১ এএম


বিশ্বব্যাপি প্রচলিত ‘বেলআউট’ ফিলোসফি অনুকরণে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের জন্য ২শতাংশ ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ সাপেক্ষে রেয়াতি সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি করা হচ্ছে একটি ‘ইকনোমিক পলিসি’র আওতায়। কাউকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য নয়। সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে (৯শতাংশ হারে সুদ আদায়) নামিয়ে আনার পলিসি বাস্তবায়নের জন্যই এ সিদ্ধান্ত।

এ বক্তব্য দিয়েছেন ‘ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন বাংলাদেশ’র (বিএবি) আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি জেবিএম হাসান এবং বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের ডিভিশন বেঞ্চে চুতর্থ দিনের মতো শুনানি হয়। দ্বিতীয়ার্ধে শুনানি করেন রিটকারি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।
ইতিপূর্বে তুলে ধরা বিভিন্ন আইন, দৃষ্টান্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহিত সিদ্ধান্তের জের টেনে অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, রিটে কিছু পত্রপত্রিকার নিউজ কাটিং এবং ‘সিপিডি ডায়লগ’র ভিত্তিতে রিট করা হয়েছে। সিপিডি বলেছে ২২ হাজার কোটি টাকা আতœসাৎ ও পাচার হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট এবং বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। সিপিডি তার প্রতিবেদনেই বলেছে, এটি একটি সেকেন্ডারি রিপোর্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। দুদক মামলা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি কিভাবে রোধ করা যায় ২০০৯ সাল থেকেই সে বিষয়ে কাজ চলছে। ব্যাংক বিভিন্ন বিধি-বিধান জারি করছে। মানিলন্ডারিং আইন করা হয়েছে। জঙ্গি অর্থায়ন রোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ও নানামুখি উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, রিটে অর্র্থ পাচারের কথা বলা হয়েছে। অথচ এটি বাংলাদেশের কোনো একক ইস্যু নয়। আন্তর্জাতিক সমস্যা এটি। ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এ প্রতিবেদন দিতে হয়। ‘ভেসেল থ্রি’ নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে। চুক্তির আওতায় অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক পারফর্মেন্স শো করছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করেছে। সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ রয়েছেন। তিনজন মন্ত্রী, পাঁচ/ছয়জন সচিব, বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং এটর্নিজেনারেল রয়েছেন। এ কমিটির কাজই হচ্ছে, ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে বাংলাদেশ ব্যাংককে তাগিদ দেয়া। তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে নানাভাবে তাগিদ দিচ্ছে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পাচার বন্ধে। এছাড়া অনেক আইন কানুন রয়েছে। এনআই অ্যাক্টে মামলা হচ্ছে। অর্থ ঋণ আদালতে মামলা হচ্ছে। একজন গ্রাহকের বিরুদ্ধে কমপক্ষে তিনটি আইনে মামলা হচ্ছে। তার ওপর যদি রিটে উল্লেখিত কোনো কমিশন গঠন করা হয় তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হবে। তাই এখন আর কমিশনের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কমিশন গঠন করা হলে কার্যক্রম সিস্টেমগুলোও কলাপস করবে।

শাহ মঞ্জুরুল হক আরো বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ করে খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর রেয়াতি সুবিধা দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ‘বেলআউট’ দর্শনের ভিত্তিতে।সিঙ্গাপুরে ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে বেলাউট করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় ১৭টি প্রতিষ্ঠান বেলআউট হয়েছে। আমেরিকা, ইউরোপ, গ্রিস. উত্তর কোরিয়ার বড় বড় কোম্পানির ’বেলআউট’ হয়েছে। একটি কোম্পানি ঋণের দায়ে জর্জরিত। চলতে পারছে না । তাকেতো এখান থেকে বের হতে হবে। তাকে এ সুযোগ দিতে হবে। পাবলিক মানি কোম্পানির হাতে চলে যাচ্ছে। আমরা বলেছি, যে প্রতিষ্ঠানকে সুবিধাটি দেয়া হচ্ছে সেওতো পাবলিকের জন্যই অর্থটি ব্যয় করছেন। একটি কোম্পানি নিজে খাওয়ার জন্যই শুধু অর্থ নিচ্ছে না। তিনিও একটি পাবলিক পারপাসেই অর্থ নিচ্ছেন। তার ওখানে বিনিয়োগ হচ্ছে। কর্মসংস্থান রয়েছে। উৎপাদন হচ্ছে। তিনি ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছেন। পাবলিক মানি পারসেনপশন আর ব্যাংক কারো ব্যক্তিগত অর্থ নয়। এটি ব্যাংক এবং গ্রাহকের মধ্যকার বাণিজ্যিক চুক্তি। ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের সম্পর্কটা হচ্ছে ক্লায়েন্ট-কাস্টমার রিলেশন্স। পিটিশনার বলছেন এটি বৈষম্য। কিন্তু না। পিটিশনে বলা হয়েছে, দশ বছরের জন্য নাকি ঋণ খেলাপিরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার বক্তব্য হচ্ছে, সার্কুলারে উল্লেখিত সুবিধাভোগীরা নিরাপদ আশ্রয়ে যাবে না। যে শর্তে এ সুবিধা দেয়া হচ্ছে সেটিতো খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলো অতিক্রম করতে পারবে না। আটঘাট বেধেই সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এটি করা হচ্ছে একটি ইকনোমিক পলিসির আওতায় । বিশেষ করে ‘সিঙ্গেল ডিজিট’। সেখানে সুদের হার ৯ শতাংশ ঠিক করা হয়েছে। এ স্কিমের আওতায় এসে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত হয় তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকর করা সম্ভব হবে। অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ তার শুনানিতে বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপিরা ঋণ থেকে মুক্তি পাবে। এ কারণে সিআইবিতে তাদের নাম থাকবে না। তখন নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যাবে। এতে ব্যাংকের মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাবে। তিনি বলেন, যেসব কমিটি এবং আইনের কথা বলা হচ্ছে, এগুলো ভঙ্গুর এবং অকার্যকর। এধরণের বিধি-বিধান এবং কমিটি সব সময়ই ছিলো। তা সত্ত্বেও ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে। জনগণের অর্থ এভাবে ব্যক্তিমালিকের হাতে তুলে দেয়ার কোনো এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। শুনানি শেষে আদালত আগামি রোববার পর্যন্ত কার্যক্রম মুলতবি করেন।

উল্লেখ্য, মাত্র ২ শতাংশ এককালীন নগদ জমা (ডাউন পেমেন্ট) দিয়ে ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃ তফসিল বা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধের বিশেষ সুবিধা পাবেন ঋণখেলাপিরা। এ ক্ষেত্রে তাদের ঋণের সুদ হার হবে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ৩ শতাংশ, যদিও তা কোনোভাবেই ৯ শতাংশের বেশি হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক জারিকৃত এমন সার্কুলার চ্যালেঞ্জ করে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রিট করেন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পীস ফর বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। রিটে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে ব্যাংক ঋণের ওপর সুদ মওকুফের বিষয় তদন্ত এবং তা বন্ধে সুপারিশ প্রণয়নে কমিশন গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়। শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেন। এখন সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি চলছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন