Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

সারাদেশের রেলের ঠিকাদারি ছিল খালেদ বহিনীর নিয়ন্ত্রণে

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৯ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

শুধু ক্যাসিনো নয়, সারাদেশের রেলওয়ের সব ধরনের ঠিকাদারী নিয়ন্ত্রণ ছিল যুবলীগ নেতা খালেদের হাতে। গ্রেফতার হওয়ার আগে পর্যন্ত খালেদের ভূঁইয়া রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদেন কাছে ছিল আতঙ্কের নাম। তার ইশারা ছাড়া স্ক্র্যাব বিক্রি, ক্যাটারিং সার্ভিস (খাবার গাড়ি পরিচলনা), বেসরকারী পর্যায় রেল পরিচালনায় লিজ দেয়াসহ কোন কাজের দরপত্র বিক্রি করতে পারতেন না রেলের কর্মকর্তারা। খালেদ বহিনীর হয়ে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী জোনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতো যুবলীগ নেতা রমজান আলী ও শামীম। আর পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে দরপত্র বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতো সাবেক যুবদল নেতা শাহ্ আলম ও বাবর। জানা গেছে, ২০১৪ সালে থেকে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ বাংলাদেশ রেওয়েতে একছত্র রাজত্ব কায়েম করে। এর আাগে স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল এবং কিছু যুবলীগ নেতাদের সাথে থেকে টেন্ডার (দরপত্রের) শিডিউল নিয়ন্ত্রণে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। ২০১৪ সালে খালেদ মাহমুদ যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আসীন হওয়ার পর রেলওয়ের সব সেক্টরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। রেওয়ের পূর্ব জোন সদরদপ্তর চট্টগ্রাম, পশ্চিম জোনের সদরদপ্তর রাজশাহী, বিভাগীয় সদরদপ্তর ঢাকা, পাকশী এবং লালমনিরহাটসহ সব স্থানে যুবলীগ নামধারী স্থানীয় সন্ত্রাসীদের নিয়ে চাঁদাবাজি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতো খালেদ। রেলওয়ের এমন কোন বিভাগ নেই যেখানে খালেদের থাবা পড়েনি। খালেদের প্রভাব ও উপরমহলের ফোনের কারণে রেলভবনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তটস্থ থাকতেন।

জানা গেছে, এর আগে রেলওয়ে পূর্ব ও পশ্চিম জোনের ৭ প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদের কথা না শোনায় অপমান করে বদলী করা হয়েছিল। খালেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে ঢাকার রেলওয়ে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পরিবারের সামনেই খালেদ নিজে তার লোকজন নিয়ে অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয় দেখাতো।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ সালে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার জন্য লিমিটেড টেন্ডারিং ম্যাথডের (এলটিএম) নামে কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকাভুক্ত করে তাদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগি কারার নিয়ম চালু করার চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের কারণে তা করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, খালেদের পক্ষে তার ছোট ভাই মারুফ এবং মাজহার ঢাকার কমলাপুর অফিসের সবধরনের কাজের দরপত্র বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতো। কাজ অনুযায়ী খালেদের সাথে যেসব ঠিকাদাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সমঝোতা হতো কেবল তাদের কাছেই দরপত্র বিক্রির নির্দেশ থাকতো। এর ব্যতিক্রম ঘটলে দরপত্র বিক্রির সাথে যুক্ত কর্মকর্তাদের পরিবারের সামনেই অস্ত্র দেখিয়ে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হতো।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রেলওয়ের সকল স্পেয়ার পার্স ক্রয় করা হতো। যা চীফ কন্ট্রোলার অফ স্টোরর্স (সিসিএস) অফিস হিসেবে পরিচিত। খালেদ কাউকে দরপত্র কিনতে না দিয়ে নিজেই রেলওয়ের লোকোমোটিভ, যাত্রীবাহী ও মালবাহী কোচের কয়েকশ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। এর মধ্যে অনেক যন্ত্রাংশ সরবরাহ না করেই বুঝে পেয়েছে বলে লিখে দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, খালেদের ভয়ভীতি উপক্ষো করে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি ঢাকার কমলাপুর থেকে রেওয়ের স্ক্র্যাবের (ওয়াগন, লোকোমোটিভের পুরাতন লোহা) একটি দরপত্রে অংশ গ্রহণ করে। এতে খালেদের দেয়া প্রতিষ্ঠানের টেন্ডারের চেয়ে সরকারের সাড়ে তিন কোটি টাকা বেশি আয় হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে খালেদ আদালতে মামলা করায়। তবে আদালত স্ক্র্যাব বিক্রিতে সরকারের রাজস্ব বাড়ার কারণে খালেদের মামলা খারিজ করে দেয়।

শুধু দরপত্র নিয়ন্ত্রণ নয়, রেলওয়ের জমি দখল করে মার্কেট ক্লাব করার অভিযোগ রয়েছে খালেদের বিরুদ্ধে। ঢাকার শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনীতে রেলের জায়গা দখল করে মার্কেট করার অভিযোগ রয়েছে খালেদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। তবে খালেদ গ্রেফতার হওয়ার পরে অবৈধ মার্কেট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খালেদ চট্টগ্রামের শাহ্ আলম বাবরকে নিয়ে চট্টগ্রামের আইস ফ্যাক্টরি রোডে কয়েকশ কোটি টাকা মূল্যের রেলওয়ের ৫ একর জায়গা দখল করে সুপার মার্কেট নির্মাণ করার চেষ্টা চালায়। তবে মার্কেট তৈরির একপর্যায় তাদের নামে রেওয়ের জমি বরাদ্দের কাগজটি যে জাল তা প্রমাণিত হওয়ায় নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।

শুধু জমি দখলের মধ্যে ক্ষান্ত থাকেনি খালেদ। চট্টগ্রামে শাহ্ আলম বাবরকে নিয়ে হালিশহরে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমীর পুকুরের ৩১ একর জমি এবং রেক্টর এবং এডিশনাল রেক্টরের বাংলো লীজ দেখিয়ে দখল করে নেয়। আবার প্রকৌশলীকে ভয় দেখিয়ে ৭ কোটি টাকা খরচ করে লীজের সেই বাংলোর মেরামতসহ আধুনিকায়ন করানো হয়।
এব্যাপারে জানতে চাইলে, রেলভবনের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, রেলওয়ের কর্মকর্তারা চাইলেও জীবনের ভয়ে অনেক সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তবে শাজাহানপুরে রেলের জায়গা অবৈধ দখলে বিরুদ্ধে উচ্ছদ অভিযান চালিয়ে দখলদারমুক্ত করা হয়েছে। সারাদেশেই উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।



 

Show all comments
  • দীনমজুর কহে ১৯ অক্টোবর, ২০১৯, ৬:৪২ এএম says : 0
    এরা গোটা দেশের প্রতিষ্ঠান প্রশাষন সব কিছুর নিয়ন্ত্রক।এদের দমন করা এখন সময়ের দাবী।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: যুবলীগ

২১ অক্টোবর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ