Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

কয়লা ও সীসা কারখানার জন্য বন উজাড়

জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়

মো. শরীফুল ইসলাম, সখিপুর (টাঙ্গাইল) থেকে | প্রকাশের সময় : ২৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

টাঙ্গাইলের সখিপুরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে অবৈধ করাতকলের পর এবার অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ২টি সীসা ও ১৯টি কয়লা কারখানা। এসব কারখানায় প্রতিনিয়ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সংরক্ষিত বনের শাল-গজারি, আকাশমনি, ইউক্লিপটাস, মেহগণি, মিউজিয়ামসহ অন্যান্য কাঠ পুড়িয়ে কয়লা বানানো হচ্ছে। এতে সামাজিক বনায়ন উজাড়ের পাশাপাশি কালো ধোঁয়ায় জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এতে শ^াসকষ্টসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এছাড়া গৃহপালিত পশু-পাখি, বন্যপ্রানি অজানা রোগে প্রায়ই মারা যাচ্ছে।

সরেজমিন উপজেলার তেঁতুলিয়া চালা গ্রামে ৬টি, কীর্ত্তণখোলা গ্রামের ধুমখালী এলাকায় ৬টি এবং কালিয়ান-পাড়া গ্রামে ৭টি কয়লার কারখানা দেখা গেছে। প্রতিটি সীসা, কয়লা কারখানায় গড়ে তোলা হয়েছে সামাজিক বন এবং গনবসতি এলাকায়। প্রতিটি কারখানাই টাঙ্গাইল বন বিভাগের সখিপুর হতেয়া রেঞ্জের কালিদাস, বহেড়াতলী রেঞ্জের কচুয়া বিট কার্যালয়ের আওতাধীন। মাটির তৈরি বড় আকারের প্রতিটি চুলাই সংরক্ষিত ও সামাজিক বন থেকে আনা কাঠ দিনরাত পুড়িয়ে কয়লা বানানো হচ্ছে। কারখানার আশপাশে বিশাল আকৃতির কাঠ স্তুপ করে রাখা আছে। এর প্রতিটি কারখানায় চার-পাঁচজন শ্রমিক দিনরাত কাঠ চুলায় পোড়ানোর কাজ করছে। এসব কারখানায় তৈরিকৃত সীসা, কয়লা বস্তায় ভরে উত্তরাঞ্চল, ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়। প্রতি বস্তা কয়লা ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকায় এবং সীসা ৫/৬হাজার টাকায় বিক্রি হয়। দিনরাত ওইসব চুলা থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে সারা গ্রামে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। ধ্বংস হচ্ছে সামাজিক বনায়ন ও সংরক্ষিত শাল-গজারি বাগান। অপরদিকে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। হুমকির মুখে পড়েছে জীবন যাত্রা। ফলে জলবায়ূ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হওয়া জানমালের নিরাপত্তা বিনষ্ট হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার কয়েকজন জানায়, বনের কর্মকর্তারা প্রায়ই কারখানায় এসে টাকা নিয়ে যান। মালিক পক্ষ সবাইকে ম্যানেজ করেই কয়লা পোড়ানোর কাজ করছেন বলেও তারা জানান। এ ব্যাপারে কারখানা মালিকরা বলেন, বনবিভাগ, স্থানীয় ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করেই কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরী করা হয়। তবে তিনি এসব কাঠ বনবিভাগের নয় উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারদের মাধ্যমে কেনা কাঠ বলে দাবি করেন তারা। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) টাঙ্গাইল শাখার জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা সোমনাথ লাহিরী বলেন, বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকলসহ বন ও পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো কারখানা গড়ে তোলা বেআইনি। অবৈধ কয়লা কারখানার ধোঁয়া পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং কালো ধোঁয়া থেকে নির্গত কার্বন স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়।

কারখানা থেকে ১০০ গজের মধ্যে আবদুল করিমের বাড়ি। তিনি বলেন, ‘দিনরাত কারাখানার ধোঁয়া ও গন্ধে বাড়িতে থাকা যায় না। পরিবারের প্রায় সকলেই কোন না কোন অসুখে আক্রান্ত হচ্ছি। বিশেষ করে শ^াসকষ্ট, কাশিতো আছেই। কয়লা কিনতে আসা ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এখান থেকে কয়লা কিনে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ আশপাশের জেলাগুলোতে কামার, কর্মকার ও হোটেল মালিকদের মাঝে সরবরাহ করি। কালিদাস বিট কর্মকর্তা মো. এমরান খান তাঁর বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কারখানা বনবিভাগের জমিতে নির্মিত না হওয়ায় আমরা কিছু করতে পারছি না। কচুয়া বিট কর্মকর্তা শাহ আহমেদ বলেন, সীসা রাতে আমরা পোড়াই আর যেখানে পোড়াই সে জায়গা বনবিভাগের না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আয়শা জান্নাত তাহেরা বলেন, অচিরেই কয়লা কারখানা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে, ইতিমধ্যে অবৈধ করাতকল উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত আছে। টাঙ্গাইল বন বিভাগের বিভাগীয় বন সংরক্ষক (ডিএফও) মো. হারুন অর রশিদ বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা ও সীসা বানানোর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ