Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলাম নয়

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ৩১ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

অধিকাংশ ধর্মে দ্বীনদারী ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের সর্বাত্মক পরিচিতি হিসেবে কোন গুহায়, গর্তে, পর্বতারণ্যে বসে দুনিয়ার সংযোগ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবস্থান করাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এজাতীয় কার্যক্রমকে ইসলাম ইবাদত হিসেবে গণ্য করে না। এমনকি তা ইবাদতের যথার্থ তরীকাও হতে পারে না। বস্তুুত: ইবাদত হচ্ছে আল্লাহ এবং বান্দাহর হক-হুকুক আদায় করা। এতদর্থে যে ব্যক্তি নিজের পরিবেশ ও প্রয়োজনকে পরিহার করে পলায়নী মনোবৃত্তির পথ অবলম্বন করে কিংবা একান্ত নিভৃতে অজানার অন্তরালে লুকানোর চেষ্টা করে সে প্রকৃতই তার স্বগোত্রীয়দের দায়-দায়িত্ব ও অধিকার আদায় হতে বঞ্চিত থাকে। যা কখনো প্রশংসার উপাত্ত হতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মূল লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এই যে, মানুষ তার চতুষ্পার্শ্বের ভিড় এবং আনুষঙ্গিক আবশ্যকীয় সম্পর্কের হজ্জুম সত্ত্বেও এগুলোর দায়-দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালন করে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ভীক সৈনিকের মত সম্পাদন করে যাবে। জাগতিক সম্পর্কের উপাদানগুলোকে ভয় করে কিংবা এগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে নিজেকে নিঝুম মায়াজালে আবদ্ধ করলে সেটা হবে ভীতি-সন্ত্রস্ত মতিভ্রম সৈনিকের পদচারণা মাত্র। তা ইসলামের কাম্য নয়। বরং ইসলাম চায়, তার প্রতিটি অনুসারী অকৃতোভয় কালজয়ী সৈনিকরূপে গড়ে উঠুক এবং শত ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর স্মরণে নিজেকে ব্যাপৃত রাখুক। ইসলামের দৃষ্টিতে সৃষ্টির কল্যাণার্থে সকল কাজ-কর্মই ইবাদত। দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্জনের নাম ইবাদত নয়; বরং কর্তব্য ও দায়িত্ব প্রতিপালনের পরিপূর্ণ রূপই সত্যিকার ইবাদত হিসেবে গরিগণ্য। সংক্ষেপে বলতে গেলে ফরজ আদায় করাই ইবাদত। এই ফরজ আদায় নি:সন্দেহে র্নিনতায় কখনো সম্ভব হতে পারে না। যে সকল সাহাবী পরিবার-পরিজনদের ছেড়ে এবং বন্ধু-বান্ধবদের হক বিস্মৃত হয়ে দিনভর রোজা রাখতেন এবং রাতভর ইবাদত-বন্দেগী করতেন তাদেরকে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ (সা:) নির্দেশ দিয়েছিলেন, “হে অমুক! তুমি এমন আর করো না। জেনে রেখ, তোমার উপর স্ত্রীর, ছেলে-সন্তানের হক আছে, তোমার মেহমানদের হক আছে, তোমার প্রাণের হক আছে, তোমার চোখেরও হক আছে।” (সহীহ বুখারী)

ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদত হচ্ছে যাবতীয় হক-হুকুক আদায় করা, কিন্তুু এসকল হক-হুকুক আদায় করা নয়। একবার কোন ও এক যুদ্ধের সময় জনৈক সাহাবী এমন একটি স্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে একটি নিভৃত গুহা ছিল এর পাশেই ছিল একটি স্বচ্ছ পানির ঝর্ণা এবং একপ্রান্তে ছিল ছোটখাট একটি মরুদ্যান ও ফল-ফলারীর লকাকুঞ্জ। নিজের একাকীত্ব জীবনযাপনের জন্য স্থানটি তাঁর কাছে খুবই উপযোগী বলে মনে হল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর পবিত্র দেখমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি একটি গুহার সন্ধান লাভ করেছি। এখানে জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে। আমার মন চাচ্ছে এই নির্জন গুহায় বসে জীবন-যাপন করি এবং জাগতিক সমুদয় সম্পর্ক ছিন্ন করে এখানে চলে আসি। প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করলেন, ইহুদী ও নাসারাতের বিকৃত জীবন-ব্যবস্থা নিয়ে আমি আগমন করিনি। বরং আমি নিয়ে এসেছি হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এর ঐ জীবন-ব্যবস্থা যা সহজ, সরল, আসান ও আলোকোজ্জ্বল। (মোসনাদে ইবনে হাম্বল : ৫ খ: ৪৬৬ পৃ:)

অহী লাভ করার আগে রাসূলুল্লাহ (সা:) জাবালে নূরের হেরা গুহায় মাঝে মধ্যে গমন করে কয়েকদিন অবস্থান করতেন এবং আল্লাহ পাকের ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকতেন। কিন্তু যখন অহী নাজিল শুরু হল এবং তিনি আল্লাহর বাণী লাভ করলেন তখন দাওয়াত ও তাবলীগের বোঝাও তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। দিন-রাতের মাঝে কেল রাতের কয়েকটি ঘণ্টা এবং বছরে রমজান মাসের শেষ দশদিন এতেকাফ ও নিবিষ্ট-চিত্ততার সাথে আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন থাকতেন। তাছাড়া সারাদিন অতিবাহিত হত, জমায়াতের সাথে আল্লাহর ইবাদতের ভিতর দিয়ে এবং তারপর মাখলুকের কল্যাণার্থে তিনি সময় ব্যয় করতেন। এটাই ছিল খোলাফায়ে রাশেদিন এবং সকল সাহাবীদের কর্মময় জীবনের একান্ত গতিধারা। ঠিক এভাবেই পরিপূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে ইসলাম ধর্মের প্রতিটি ইবাদত বন্দেগীর প্রবাহ। ইসলামের কোনও গৃহকোণে অবস্থান করা ও বাইরের ছোঁয়া এবং সংস্পর্শ হতে বিরত থাকার অবকাশ কখন আসতে পারে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি ও কানুন মাফিক চলতে হবে। কোনক্রমেই কানুন ও নিয়ম-শৃংখলা লংঘন করা যাবে না।

এখন লক্ষ্য করা যাক, কোন অবস্থায় এবং কখন একজন লোক একাকীত্ব বরণ করে নিতে পারে। (ক) এমন কোন ব্যক্তি যার সমুদয় কার্যকলাপই অমঙ্গলের সাথে জড়িত। যার চলাফেরা কথাবার্তা, চিন্তা-ভাবনার দ্বারা কোন সৃষ্ট পদার্থই উপকার লাভ করে না, বরং অপকারের যাঁতাকলে নিষ্পৃষ্ট হয়। এমন ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সা:) অমঙ্গলের হাত হতে বেঁচে থাকার জন্য এই পরামর্শ প্রদান করেছেন যে, সে যেন জনমানুষের সংস্পর্শ হতে দূরে সরে থাকে। একবার একজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলোÑ ‘সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি কে?’ রাসূলুল্লাহ (সা:) প্রত্যুত্তরে জানালেন, (১) ‘ঐ ব্যক্তি যে নিজের জান ও মাল আল্লাহর পথে কুরবানী করে। (২) ঐ ব্যক্তি যে কোনও নির্জন ঘাটিতে বসে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করে এবং স্বীয় অপকার হতে মানুষকে রক্ষা করে।’ (সহীহ বুখারী : কিতাবুল আদব)

রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর এই শিক্ষার দ্বারা সকল মানুষকে দু’টি শ্রেণীতে বিন্যাস করা যায়। প্রথমত : সৃষ্টির শুভলগ্ন হতে যার মাঝে হেদায়েত এবং সৃষ্টজগতের খেদমতের তাওফীক প্রদান করা হয়েছে তার উচিত লোকালয়ে ও জনসমুদ্রে বসবাস করে মঙ্গলের পথে নিজে সুদৃঢ় থাকা এবং অন্যকেও মঙ্গলের দিকে আহ্বান করা। এপথে তার জান ও মাল উৎসর্গ হয়ে যাওয়াটাই উত্তম। দ্বিতীয়ত : ঐ ব্যক্তি যার সহজাত স্বাভবই হচ্ছে অন্যের অনিষ্টি সাধন করা ও অমঙ্গলের পরিধি বিস্তৃত করা, তার চারিত্রিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য উচিত হচ্ছে জনগণের সান্নিধ্য হতে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং নিবিষ্টচিত্তে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করা। এতে করে তার গোনাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে না এবং মানুষও তার অনিষ্টকারিতা হতে নিরাপদ থাকবে।

(খ) যদি লোকালয়, জনবসতি, গোত্র বা দেশে ফেতনা-ফাসাদের বাজার এমনভাবে গরম হয় যে, তা প্রতিহত করা বা সংস্কার সাধন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন উত্তম পন্থা হচ্ছে এই যে, তা প্রতিহত করা বা সংস্কার সাধন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন উত্তম পন্থা হচ্ছে এই যে, জনতার সংস্পর্শ হতে নিজেকে দূরে রাখা। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা:) সাহাবীদের লক্ষ্য করে একবার বললেনÑ “এমন একটি সময় মানুষের সামনে আসবে, যখন একজন মুসলমানের উত্তম সম্পদ হবে তার ছাগলের পাল। (চলবে)

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ