Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

স্কুল ব্যাংকিং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের বুনিয়াদ

মো. এমদাদ উল্যাহ | প্রকাশের সময় : ১৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

অর্থব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, সঞ্চয়ের মনোভাব বৃদ্ধি ও অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো ‘স্কুল ব্যাংকিং’। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও ২০১০ সাল থেকে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এতে আগ্রহ বাড়ছে ১১ থেকে ১৭ বছরের ছেলে-মেয়েদের। এ বয়সে তাদের কোনো আয় নেই। পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা স্বজন থেকে উৎসব উপলক্ষে বা নিয়মিত খরচের জন্য পাওনা টাকা থেকে উদ্বৃত্ত টাকা ব্যাংকে জমা রাখার নামই স্কুল ব্যাংকিং। এর মাধ্যমে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা ব্যাংক হিসাব খোলার নিয়ম-কানুন ও হিসাব পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। নিয়মিত ব্যাংকে আসা-যাওয়া ও টাকা জমা রাখতে রাখতে এক সময় দেখা যাবে তাদের একাউন্টে একটা বড় অংকের টাকা জমা হয়েছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো চার্জ না কাটায় সব টাকাই একাউন্টে জমা থাকে। ফলে পড়ালেখা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ছাত্র-ছাত্রী ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মুলধন হিসেবে ব্যাংকে জমানো টাকা ব্যবহার করতে পারবে। ফলে কারও কাছ থেকে ঋণ নিতে হবে না। জমানো টাকার সুফল পাবে সারাজীবন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকায় দিন দিন সারাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশের প্রায় ২০ লাখ ছেলে-মেয়ের এখন ব্যাংক হিসাব রয়েছে। তাদের জমানো অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গেøাবাল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, দি ফারমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, মধুমতি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকসহ চল্লিশটিরও বেশি ব্যাংকে স্কুল ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল ব্যাংকিং সেবাকে জনপ্রিয় করতে কোনো কোনো ব্যাংক আলাদা কাউন্টার বা ডেস্ক খুলেছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে এই কার্যক্রমের আওতায় খোলা হিসাবের পাশাপাশি আমানতের পরিমাণও বাড়ছে। এখন পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই এগিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের ২ নভেম্বর স্কুল ব্যাংকিং বিষয়ে জারিকৃত পরিপত্রে উল্লেখ করে, শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সুবিধা ও তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবার সঙ্গে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে সব ব্যাংকে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। এরপর থেকেই স্কুল পড়–য়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আকর্ষণীয় মুনাফার নানা স্কিম চালু করে। ২০১০ সালে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সাল থেকে। প্রথম বছরেই স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয় ২৯ হাজার ৮০টি। ইতোমধ্যেই ব্যাংকগুলো এই অর্থ ক্ষুদ্র ঋণে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে।

স্কুল ব্যাংকিংয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ বাড়াতে নোয়াখালীর চৌমুহনী শাখা এবি ব্যাংকের তত্ত¡বধানে ও জেলার সকল তফসীলি ব্যাংকের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে স্কুল ব্যাংকিং কনফারেন্স-২০১৯। গত ২ নভেম্বর নোয়াখালী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ৩৮টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে এ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস। বিশেষ অতিথি ছিলেন নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের উপ-পরিচালক এস এম জোবায়ের হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের রিটেল ব্যাংকিং ডিভিশনের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক এবি ব্যাংক চৌমুহনী শাখার ব্যবস্থাপক ইসরাফিল মজুমদার স্বাগত বক্তব্যে স্কুল ব্যাংকিংয়ের তাৎপর্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য আহবান জানান। জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এবং ক্যুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
ব্যাংক হিসাব চালাতে গ্রাহককে কোনো না কোনো চার্জ দিতে হয়। কিন্তু স্কুলের শিক্ষার্থীদের এই হিসাব চালাতে কোনো খরচ দিতে হয় না। চেক বই নিতে গুনতে হয় না কোনো মাশুল। জমা বই, ডেবিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিংসহ অন্যান্য সুবিধা তো আছেই। লেনদেন করা যায় যত খুশি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জন্য স্কুল ব্যাংকিংয়ের আমানত মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী আমানত, যা স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগযোগ্য। স্কুল ব্যাংকিংয়ে তুলনামূলকভাবে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে অনেকদূর এগিয়ে আছে প্রাইভেট ব্যাংকগুলো। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতে পারব। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের অন্যতম পদক্ষেপ স্কুল ব্যাংকিং। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৮ বছরের কম বয়সের শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সেবা ও আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য। অর্থনৈতিক কর্মকাÐে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অংগ্রহণের মাধ্যমে তাদেরকে দেশের আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসা স্কুল ব্যাংকিংয়ের লক্ষ্য। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম স¤প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২ নভেম্বর ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার লেটার নং-১২ এর মাধ্যমে সব তফসিলি ব্যাংককে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে ২৮ অক্টোবর ২০১৩ অন্য একটি সার্কুলারের মাধ্যমে স্কুল ব্যাংকিংয়ের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের উপ-পরিচালক এস এম জোবায়ের হোসেন নোয়াখালীতে স্কুল ব্যাংকিং কনফারেন্সে ভিডিও শো-তে উল্লেখ করেন, ‘সরকারি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী সব ব্যাংকেই এই হিসাব খোলা হচ্ছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাব খোলার কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি ব্যাংক স্কুল নির্ধারণ করে নিয়মিত এই হিসাব খুলছে। এই হিসাব খোলার মাধ্য শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা হচ্ছে।’

শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রচার হলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়বে। এতে করে রিজার্ভ অর্থ বাড়বে। দেশের অর্থনীতি উন্নত হবে। একাউন্টধারী ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চিন্তা কমে যাবে।
লেখক: সাংবাদিক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন