Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৬ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৪ জামাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

ট্রানজিটে বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা

প্রকাশের সময় : ২২ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট বা করিডোর এখন আনুষ্ঠানিক বাস্তবতায় উপনীত হয়েছে। বলতে গেলে ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ও মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই অনানুষ্ঠানিক বা পরীক্ষামূলকভাবে ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভোগ করে আসছে। ভারতের আগ্রহে আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর, কন্টেইনার টার্মিনাল এবং ত্রিপুরা পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার সড়কপথ ব্যবহার করে ত্রিপুরা নির্মীয়মাণ বিদ্যুত কেন্দ্রের জন্য হেভি যন্ত্রাংশ এবং একেকটি কনসাইনমেন্টে হাজার হাজার টন খাদ্যশস্য পাঠানো হলেও এসব কনসাইনমেন্ট থেকে বাংলাদেশ এক টাকাও রাজস্ব পায়নি। অর্থাৎ ৫ বছর ধরে বাংলাদেশের উপর দিয়ে বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যবহার করে বিনাশুল্কে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভোগ করছে ভারত। ভারতের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ও অমীমাংসিত অনেক সমস্যা রয়েছে। চুক্তি হওয়ার পরও গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়া, ভারতের অনিচ্ছার কারণে বছরের পর বছর ধরে জেআরসি (জয়েন্ট রিভার কমিশন) বৈঠক না হওয়া, বিভিন্ন সময়ের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তিস্তার পানিচুক্তি নিয়ে টালবাহানা, টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে অস্বচ্ছতা ও ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশকে একটি অনিবার্য বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এহেন বাস্তবতায় ভারতের প্রতি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা কেমন হতে পারে তা বিবেচ্য এবং একটি বড় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে আরো দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য। যদিও ভারত কখনো বাংলাদেশের অত্যন্ত জরুরী চাহিদা ও ন্যায়সঙ্গত অধিকারের প্রশ্নেও যথাযথ সাড়া দেয়নি বরং সব সময় আঞ্চলিক পরাশক্তির প্রভাব খাটিয়ে তার চাহিদার পুরোটাই বাগিয়ে নিতে সবকিছুই করেছে।
ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে বাংলাদেশ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পাবে বলে প্রচার চালানো হয়েছিল। গত ১৬ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশের সেই অর্থনৈতিক স্বার্থের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে গেছে। বাংলাদেশের ভূ-খ- ও অবকাঠামো ব্যবহার করে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে মালামাল পাঠালে সময় এবং খরচ উভয়েই তিনভাগের দুইভাগ সাশ্রয় হয়। প্রতিটন পণ্য পরিবহনে যেখানে ভারতের কমপক্ষে ১০০ ডলার বা ৮ হাজার টাকা এবং ৩০ দিনের স্থলে ২০ দিনের সাশ্রয় হচ্ছে, সেখানে ট্যারিফ সংক্রান্ত কোর কমিটি প্রতিটন পণ্য পরিবহনে ১০৫৮ টাকা শুল্ক নির্ধারণের সুপারিশ করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে টনপ্রতি ১৯২ টাকা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ট্রান্সশিপমেন্টের এই শুল্কহার অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য। কেন, কার স্বার্থে তড়িঘড়ি এই হারে শুল্ক নির্ধারণ করা হল তা’ দেশবাসী জানে না। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় সংসদে বা ওপেন কোন ফোরামে আলোচনাও হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা বা বক্তব্য জানার অধিকার এ দেশের জনগণের রয়েছে। গতকাল প্রকাশিত একটি রিপোর্টে জানা যায়, আশুগঞ্জ নৌবন্দর ও আখাউড়া স্থল বন্দর দিয়ে ট্রানজিটের প্রথম চালানে দুই দফায় ১০২ টন পণ্য ত্রিপুরায় পৌঁছেছে। এই চালান থেকে ভারতের লাভ হয়েছে ৫০ লাখ টাকা, সেই সাথে রাস্তার দূরত্ব ১১০০ কিলোমিটার কমায় সময় এবং ঝুঁকিও বহুলাংশে কমে গেছে। তবে ১৯২ টাকা হারে ট্যারিফ হিসাবে বাংলাদেশ রাজস্ব পেয়েছে ২০ হাজার টাকারও কম। অথচ ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে হলে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশকে অন্তত এক লক্ষকোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
বিশ্বায়নের এই যুগে কোন দেশের পক্ষেই প্রতিবেশীদের সাথে সব দরোজা বন্ধ করে বসে থাকার সুযোগ নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো যখন যোগাযোগ, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় নতুন নতুন মাইল ফলক উন্মোচন করেছে সেখানে সার্কভুক্ত দেশগুলো কিছুই করতে পারেনি। সার্কের এই ব্যর্থতার পেছনেও ভারতের একগুঁয়েমি বা অনাগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। এখন বিবিআইএন বা চারদেশীয় সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের কথা বলা হলেও ট্রানজিটের লাভের গুড় মূলত ভারত একাই ভোগ করছে। ট্রানজিটের নামে ভারতকে করিডোর দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকিও সীমাহীন বেড়ে গেল। পাশাপাশি ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও রফতানীকারকদের যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিদ্যমান আছে ট্রানজিটের কারণে তা’ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ট্রানজিটের কারণে এই বাজার হাতছাড়া হলে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৈষম্যও নিশ্চিতভাবেই আরো বেড়ে যাবে। এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের অবকাঠামোকে ট্রানজিটের উপযোগী করে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ লক্ষকোটি টাকা খরচ করলেও বিনিময়ে বাংলাদেশ তেমন কিছুই পাবেনা। উপরন্তু ভারতের উত্তরাঞ্চলে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার হাতছাড়া হবে এবং বাংলাদেশ ভারতীয় সেভেন সিস্টার্স’র বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর টার্গেটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যাবে। আখাউড়া স্থলবন্দরটি মূলত ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বাংলাদেশী পণ্য রফতানীর কাজে ব্যবহৃত হলেও এখন তা’ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং আশুগঞ্জ নৌবন্দর হয়ে ভারতের অবশিষ্ট অংশের ট্রানশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের বন্দর ও সড়ক অবকাঠামো ভারতীয় ট্রানজিটের জন্য প্রস্তুত নয়। বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বছরে হাজার হাজার কোটি বিনিয়োগ করার পরও ভারতীয় ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশ তার কাক্সিক্ষত রাজস্বের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারছেনা। আরো ৬ বছর আগে গঠিত এ সংক্রান্ত কোর কমিটি টনপ্রতি সর্বনিম্ন ৪ ডলার থেকে ৫০ ডলারের মধ্যে ট্যারিফ নির্ধারণের যে প্রস্তাব দিয়েছিল সর্বশেষ গৃহীত মাশুল ৪ ডলারেরও কম হওয়া বিস্ময়কর। ক্ষমতায় টিকে থাকতে বর্তমান সরকার দেশের স্বার্থ বিপন্ন করে ভারতকে খুশি রাখতে চাইছে বলে সরকারের সমালোচকরা যে অভিযোগ করছে, ভারতকে তড়িঘড়ি ট্রানজিটের নামে করিডোর প্রদান এবং নামমাত্র মাশুল নির্ধারণের মধ্য দিয়ে সে অভিযোগের সারবত্তাই যেন বাস্তবে ফুটে উঠছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সামগ্রিক বিষয়গুলো পুনর্মূল্যায়নের দাবী রাখে।   




 





 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন