Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার , ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

পুলিশকে কেবল জনগণের বন্ধুই নয় আইনের প্রতিও দায়বদ্ধ হতে হবে

তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশের সময় : ১৬ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

সরকার ও পুলিশ বিভাগ বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে যে, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’। ১৫৮ বছরের পুরানো ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি সংগঠন, যার আনুষ্ঠানিক জন্ম ১৮৬১ সালে। বহুবার সংগঠনটির আকার, প্রকার, রকম পরিবর্তন, পরিবর্ধন, মার্জন, পরিমার্জন করা হয়েছে। তারপরও প্রশ্ন উঠে, জনগণ কি পুলিশের উপর আস্থাশীল, না কি এখনো পুলিশ জনগণের আন্থাহীনতায়? আন্তর্জতিক পরিমন্ডলে Robert Peel-কে আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়। তিনি বলেছেন যে, That the police are the public and the public are the police.. আধুনিক পুলিশ কেমন হওয়া বাঞ্চনীয় এ সম্পর্কে তিনি নয়টি নীতিমালা প্রদান করেছেন, যা Peelian Principle নামে পরিচিত, নিম্নে উল্লেখ করা হলো: 

1. The basic mission for which the police exist is to prevent crime and disorder.
2. The ability of the police to perform their duties is dependent upon the public approval of police actions.
3. Police must secure the willing co-operation of the public in voluntary observation of the law to be able to secure and maintain the respect of the public.
4. The degree of co-operation of the public that can be secured diminishes proportionately to the necessity of the use of physical force.
5. Police seek and preserve public favor not by catering to public opinion, but by constantly demonstrating absolute impartial service to the law.
6. Police use physical force to the extent necessary to secure observance of the law or to restore order only when the exercise of persuasion, advice, and warning is found to be insufficient.
7. Police, at all times, should maintain a relationship with the public that gives reality to the historic tradition that the police are the public and the public are the police & the police being only members of the public who are paid to give full-time attention to duties which are incumbent upon every citizen in the interests of community welfare and existence.
8. Police should always direct their action strictly towards their functions, and never appear to usurp the powers of the judiciary.
9. The test of police efficiency is the absence of crime and disorder, not the visible evidence of police action in dealing with it.
পুলিশ, সরকার তথা রাষ্ট্রের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকার প্রায়ই কঠিন থেকে কঠিন আইন প্রণয়ন করে। বস্তুত ধারণা করা হয় যে, পার্লামেন্ট কঠিন আইন তৈরির যেন একটি ফ্যাক্টরি। সে আইন বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের উপরই সরকারকে নির্ভর করতে হয়। কিন্তু পুলিশ প্রকৃতপক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে সরকারকে রক্ষা তথা সরকারের অনৈতিক কাজকে পাহারা দেওয়ার জন্য। তবে ক্ষেত্র বিশেষে কোনো কোনো পুলিশের ভালো উদ্যেগ রয়েছে, যা সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য নয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা ছিল। রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনেক পুলিশ শহিদ হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্রে পুলিশের ভ‚মিকা কতটুকু গৌরবোজ্জ¦ল? সম্প্রতিকালে একজন পুলিশ সুপারের ন্যাক্কারজনক ঘটনা সিরিজ আকারে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হচ্ছে। সেখানে দেখা যায়, পুলিশ সুপার তার অধিনস্থ বড় বড় কর্মকর্তা সম্মিলিতভাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। যখন পারটেক্সের মালিক এম.এ. হাশেমের পুত্রবধু ও নাবালক নাতিকে গুলশানের বাড়ি থেকে (সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজের দৃশ্য মতে) ধরে আনা হয়েছে। ফলে গাড়ি থেকে মদ, বিয়ার, গুলি উদ্ধারের পুলিশ সুপারের সাজানো নাটক মিথ্যা প্রমাণিত হলো। আর প্রমাণিত হলো যে, জজ মিয়া নাটকের মতই এটাও ছিল একটি অতিরঞ্জিত সাজানো নাটক। পিছনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্যাপক পরিমাণ অর্থের চাঁদাবাজি। পর্যাক্রমে এখন থলের বিড়াল বেরিয়ে আসছে। চাঁদাবাজিসহ ছাত্র অবস্থায় শিশু অপহরণের কথাও সামাজিক মিডিয়াতে আসছে, তবে বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ সাপেক্ষ। প্রমাণিত হলো এটাই যে, পুলিশের অভিনব চাঁদাবাজি, এটা কোনো নতুন বিষয় নয়, বরং পুলিশই এখন শ্রেষ্ঠতম চাঁদাবাজ বলে জনগণ মনে করছে। অন্যদিকে ইয়াবা বা অস্ত্র দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুলিশের চাঁদাবাজির ঘটনা প্রতিনিয়তই পত্রিকায় আসছে। পরিবহণে চাঁদাবাজি এখন ওপেন সিক্রেট, তবে এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বও জড়িত রয়েছে। পরিবহণ মালিক নেতৃত্ব কোনোদিনই বিরোধী দলীয় স্বাদ গ্রহণ করে না, বরং তারা সকল সময়ই সরকারি দল। ফলে তারা পুলিশের মতই বেপোরোয়া এবং নিয়ন্ত্রণহীন।
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইউব খান তার শাসন আমলে ‘প্রভূ নয় বন্ধু’ শিরোনামে একটি বই লিখেছিলেন, যা বাংলায় অনুবাদ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সকল বি.ডি মেম্বারসহ অনেককেই বিনামূল্যে কপি বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু আইউব খানের মর্ম কথা তথা পুস্তকে লিখিত বক্তব্য তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ বিশ্বাস করে নাই। বাঙালিদের প্রতি পশ্চিমাদের আচরণ বন্ধুসুলভ ছিল না, বরং ছিল প্রভূত্বসুলভ। যদি পশ্চিমাদের আচরণ বন্ধুসুলভ হতো, তবে স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রয়োজন হতো না। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ এ কথাটি পুলিশ বিভাগের গাল ভরা বুলিতেই জনগণ মেনে নেবে না, বরং পুলিশের আচরণেই বন্ধুত্বের গভীরতা কতটুকু তা প্রকাশ পাবে। সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, আচরণের উপরেই বন্ধুত্ব নির্ভরশীল।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার জেহাদ ঘোষণা করেছে। অথচ সরকারের সকল বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। প্রতিনিয়তই পত্রিকায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অপচয়সহ নানাবিধ কেলেঙ্কারির কথা প্রকাশ পাচ্ছে। জাতি যেখানে দুর্নীতির কষাঘাতে জর্জরিত সেখানে শুধুমাত্র পুলিশ বিভাগ নিয়ে কথা বলা লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়। আমি বলতে চাই যে, পুলিশের একটি অংশ আইনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত অর্থাৎ ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেরা প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছে এবং জনগণকে করছে আইনের শাসনের প্রতি আস্থাহীন। ফলে পুলিশ জনগণের বন্ধু কথাটি শত প্রচারের পরেও জনগণকে বিশ্বাস করতে পারছে না, যেমনটি বিশ্বাস করে নাই আইউব খানের বন্ধুত্বের বাণী। ইয়াবা বিক্রির মামলায় আসামী হিসাবে যখন পুলিশের সম্পৃক্ততার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তখন জাতি তাদের উপর কতটুকু আস্থাশীল থাকতে পারে? ক্ষমতা অপব্যবহারের জন্য সরকারই পুলিশকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, যার গতি এখন ক্রমবর্দ্ধমান। ৬ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, জয়নাল আবেদীন ফারুককে চিপহুইপ থাকাবস্থায় দলীয় কর্মসূচি পালনরত অবস্থায় রাজপথে প্রকাশ্যে পিটিয়ে গুরুত্বর জখম করার পর ঐ পুলিশ অফিসারকে সরকারের সুনজরে থাকার জন্য আর পিছনে তাকাতে হয় নাই। নির্বাচন কমিশন গাজীপুর থেকে তাকে বদলি করার ১৩ দিনের মাথায় পুনরায় গাজীপুরে যোগদান করে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে সরকার ঠুঁঠোজগন্নাথ বানিয়েছে। জমিদারদের লাঠিয়ালদের মতো সরকার পুলিশ বাহিনীকে পেটোয়া বাহিনী হিসাবে ব্যবহার করায় পুলিশের সুবিধাবাদী চক্রের জিব্বা অনেক বড় হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার নিজেই বেকায়দায় পড়ে যায়। স্ট্যান্ড রিলিজ ছাড়া অন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়া বা পানিশমেন্ট দেওয়া সরকারের জন্য দুরুহ হয়ে পড়ে। কারণ পুলিশ বিভাগের কিছু কিছু কর্মকর্তা রয়েছে, যারা সরকারের অনেক অপকর্মের সাক্ষী। কেউ তার সাক্ষীকে Hostile করতে চায় না, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। অন্যদিকে কারো পিছনে যদি মহামান্য কোনো ব্যক্তির রেফারেন্স থাকে তবে তো দেশ ও জাতির ভাগ্য তার পকেটে চলে যায়। চলমান দৃশ্যপটে ব্যতিক্রম কিছু হচ্ছে কি?
জাতীয় পত্রিকার ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের সাংবাদিক সম্মেলন এবং ভিডিও ফুটেজে ভাইরাল হওয়া দৃশ্যে প্রতিয়মান হয় যে, পারটেক্সের মালিক হাশেমের পুত্রবধু ও নাতিকে গুলশান থেকে অপহরণ করে মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনী বানিয়ে পুলিশসুপার শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং জাতির সাথে প্রতারণা করেছে। এ অপহরণের ঘটনার সাথে জড়িত সকল পুলিশ কর্মকর্তাকে বিচারের সম্মুখীন করা আইনী শাসন ব্যবস্থার দাবি হওয়া উচিৎ। কিন্তু এ দাবির বাস্তবায়ন কি সরকারের পক্ষে করা সম্ভব হবে?
উল্লেখ করা যেতে পারে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা ধামা চাপা পড়ে যেতো যদি সেখানে হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ না করতো। সাত খুনের মামলার তদন্ত করার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে অ্যাপিলেট ডিভিশনে লিভ টু আপিল না করায় সরকার একজন অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেলকে অব্যাহতি প্রদান করেছিলে। জনগণ পুলিশের বন্ধু হওয়ার পূর্বে পুলিশকে মনে করতে হবে যে, জনগণ তাদের নিম্নস্তরের নয়, বরং সমান্তরালের চেয়েও ঊর্র্ধ্বে। ‘পুলিশ কোনো নাগরিককে হত্যা করলে হবে এনকাউন্টার, পক্ষান্তরে কোনো নাগরিক পুলিশ হত্যা করলে হবে মার্ডার’ সিনেমার এ ডাইলগের মানসিকতার পরিবর্তে আইন লঙ্ঘন, অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য জনগণকে সহযোদ্ধা মনে করতে হবে। পুলিশকে মনে করতে হবে যে, তারা আইনের ঊর্র্ধ্বে নয়, বরং আইনের প্রতি তারা আরো বেশি দায়বদ্ধ। এ কথাটি পুলিশকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের একটি স্বচ্ছ ও কঠিন ভ‚মিকা থাকা প্রয়োজন, যা বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশের হাত এখন অনেক লম্বা, বিভিন্ন কারণে যা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে কি? হালে পুলিশী কার্যক্রমে জনগণের চেয়ে সরকারই বেশি লাভবান, তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। কারণ ভোটারবিহীন নির্বাচনে ভোটবাক্স ভর্তি ও গায়েবী মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে এলাকা ছাড়া করার জন্য সরকারের পক্ষে পুলিশই সবচেয়ে বেশি সহায়ক ভ‚মিকা পালন করেছে। ফলে যাদের থেকে সরকার অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে তাদের যন্ত্রণা সরকারকে ভোগ করতেই হবে, যদি সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় না হয়।

লেখক: কলামিস্ট ও আইনজীবী



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন