Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

সুন্দরবন বাঁচলে দেশ বাঁচবে

আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা | প্রকাশের সময় : ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এটি ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি নথি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০০০০ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশে রয়েছে ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার ও ভারতীয় অংশে ৩৯৮৩ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের মোট বনাঞ্চলের ৪৭ ভাগই হলো সুন্দরবন এবং বন বিভাগের রাজস্ব আয়ের অর্ধেকেরও বেশি আসে সুন্দরবন হতে। এ বন থেকে আমরা প্রচুর পরিমাণে কাঠ, জ্বালানি, মাছ, মধু ও মোম সংগ্রহ করে থাকি। প্রতি বছর সুন্দরবন থেকে প্রায় ৯৭০০০ টন গোলপাতা, ২২০ টন মধু এবং ৫০ টন মোম আহরণ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ বন আমাদের রক্ষা করে।
সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। সুন্দরবনে রয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনকে ইউনেস্কো ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। দুঃখের বিষয় আমরা আমাদের এ সম্পদকে যথাযথভাবে ব্যবহার বা রক্ষা কোনটিই করতে পারছি না। ফলস্বরূপ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ছোট হয়ে আসছে বনের আয়তন। বিগত ২০০ বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে প্রায় অর্ধেক। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে সুন্দরবন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সার্ভিস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ সুন্দরবনের ভূমি ও উদ্ভিদের পরিবর্তনের ধরন নিয়ে দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সুন্দরবনের ভূখ- কমছে আর জলাভূমি বাড়ছে। মূলত সুন্দরবনের নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ফলে আয়তন কমছে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।
সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জাতিসংঘের সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির এক নম্বর কারণ হিসেবে ফারাক্কা বাঁধকে চিহ্নিত করেছে। গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে সুন্দরবনের নদীতে মিষ্টি পানি প্রাবাহের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। কিন্তু বনের জীব বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য মিষ্টি পানি প্রবাহের প্রয়োজন। ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে খরার সময় বিপুল পরিমাণ পানি উজানে আটকে রাখা হয়। এ সময় সমুদ্র থেকে ব্যাপক হারে লোনা পানি বনের ভিতর প্রবেশ করে। এতে সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বনের নদীর বুকে পলি জমে যাওয়ার পরিমাণও বেড়ে গেছে। যা সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে নষ্ট করছে। ফলে সুন্দরবনের গাছ ও প্রাণির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ইউনেস্কোর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, সুন্দরবনের মিষ্টি পানি প্রবাহের পরিমান যত কমছে, লবণাক্ত পানির প্রবাহ ততই বাড়ছে এবং জীব বৈচিত্র্যের পরিমাণ কমছে। এভাবে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকলে সুন্দরবনের অনেক বৃক্ষ ও প্রাণী আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এছাড়া অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, ব্যাপক হারে বৃক্ষ নিধন, অবৈধভাবে বনের পশু পাখি শিকার এবং বনের নদীতে বিভিন্ন সময়ে নৌযান ডুবির ঘটনায় বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। দেশের অর্থনীতিতে অবদানের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্গের মত কাজ করে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বায়ুপ্রবাহ প্রতিহত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে সুন্দরবন। বনের ঘন সবুজ বেষ্টনী বাতাসকে কয়েকশ মিটার উপরে ঠেলে দেয়।
সুন্দরবন আমাদের জাতীয় বন। আমাদের সচেতনতার অভাবে এ বন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ বন রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। প্রথমত, সুন্দবনকে কেন্দ্র করে যত অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বনের বৃক্ষ নিধনকারী ও পশু শিকারীদের শক্ত হাতে দমন করতে হবে। বনের নদীগুলো দিয়ে চলাচলকারী নৌযানগুলোর দিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সেখানে মিঠা পানি প্রবাহের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে মনযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে যাতে গঙ্গা চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয় এবং সুন্দরবনের মিষ্টি পানি প্রবাহের পরিমাণ বাড়ানো যায়। শুধু মিষ্টি পানি প্রবাহের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না নিয়মিত ভাবে সুন্দরবনের পানির গুণগত মান, লবণাক্ততা এবং সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং কোনো সমস্যা হলে তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দরবনকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুন্দরবন বাঁচলে দেশ বাঁচবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সুন্দরবন বাঁচলে দেশ বাঁচবে
আরও পড়ুন