Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৩ শাবান ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

চট্টগ্রাম বন্দরে অচলদশা

রফিকুল ইসলাম সেলিম ও আইয়ুব আলী | প্রকাশের সময় : ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:০৪ এএম, ২১ নভেম্বর, ২০১৯

ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে রফতানি বাণিজ্য। শিল্পের কাঁচামাল সঙ্কটের পাশাপাশি রফতানি পণ্য যথাসময়ে জাহাজিকরণ না হওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আছদগঞ্জ থেকে পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। এর ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে মালামাল ও কন্টেইনার খালাস হচ্ছে। তবে পরিবহন বন্ধ থাকায় বন্দরে কন্টেইনার ও আমদানি পণ্যের পাহাড় জমছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে কন্টেইনার ও জাহাজ জটের আশঙ্কা করছেন বন্দরের কর্মকর্তারা।

নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে সারা দেশের মতো বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল বুধবার ভোর ৬টা থেকে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বন্ধ করে চালক ও শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসে। নগরীর নিমতলা বিশ্বরোড ও পাহাড়তলী এলাকায় পিকেটিংকালে বেশকিছু যানবাহনও ভাঙচুর করে শ্রমিকেরা।

তাদের বাধার মুখে চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাসহ দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ থাকে। এতে করে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। পরিবহন ধর্মঘটে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক গতকাল দিনভর ছিল যানবাহনশূন্য। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নৌপথে এবং রেলপথে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক ছিল।

জটের শঙ্কা বন্দরে
ধর্মঘটের শুরুতেই দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় হরতালের আবহ দেখা যায়। প্রতিদিন বন্দরকে ঘিরে হাজার হাজার ট্রাক, কার্ভাড ভ্যান ও কন্টেইনারবাহী ভারী যানবাহনের ভিড় থাকে। বন্দর এলাকা ঘুরে সকাল থেকে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বন্দরে ভেতরেও পণ্যবাহী কোন যানবাহন প্রবেশ করেনি। বন্দর থেকে আমদানি পণ্য ও কন্টেইনার পরিবহন হয়নি।

বন্দরে যায়নি রফতানিমুখী পণ্যবাহী কোন ভারী যানবাহন। পতেঙ্গা এলাকায় গড়ে উঠা বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলোতেও কন্টেইনার ও মালামাল পরিবহন বন্ধ ছিল। ধর্মঘটের কারণে কর্ণফুলীর ১৬টি ঘাটে মালামাল খালাস ও পরিবহন বন্ধ থাকে। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দরে ছয় থেকে সাত হাজার ভারী যানবাহন চলাচল করে। অন্তত চার হাজার কন্টেইনার বন্দর থেকে পরিবহন করা হয়।

ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার এবং জাহাজ জটের আশঙ্কা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বন্দরের ধারণক্ষমতা ৩৯ হাজার হলেও ৩৫ হাজারের বেশি কন্টেইনার জমা হয়েছে। জেটিতে ১৭টি এবং বহির্নোঙরে ৯৭টি জাহাজ অবস্থান করছে জানিয়ে তিনি বলেন, তার মধ্যে ৩৯টি জাহাজে আমদানি-রফতানি পণ্য রয়েছে। বন্দর সচিব জানান, সড়কে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকলেও নৌপথে চার শতাধিক কার্গো জাহাজে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক আছে।

চিটাগাং চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম ইনকিলাবকে বলেন, দেশের অর্থনীতিকে জিম্মি করে এ ধরনের ধর্মঘট গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে ৩০ ঘণ্টার বেশি অচল ছিল দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর। এ ধকল সামলে উঠে আসার আগেই পরিবহন ধর্মঘটে অচলাবস্থার মুখে পড়েছে বন্দর।

স্থবির চাক্তাই খাতুনগঞ্জ
পণ্যবাহী পরিবহন ধর্মঘটে দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা চট্টগ্রামের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আছদগঞ্জে অচলাবস্থা নেমে আসে। চাক্তাই খাল হয়ে নৌপথে কিছু পণ্য পরিবহন হলেও দিনভর সড়কে পণ্য পরিবহন বন্ধ ছিল। এলাকা ঘুরে ধর্মঘটের কারণে আড়তদার, ব্যবসায়ীদের অলস বসে থাকতে দেখা যায়। মালামাল উঠানামায় নিয়োজিত শ্রমিকরাও ছিল কর্মহীন। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ আ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক সৈয়দ ছগির আহমদ ইনকিলাবকে বলেন, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ থেকে মালামাল নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ ট্রাক দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করে। ধর্মঘটের কারণে কোন পণ্য পরিবহন হয়নি।

যানবাহনশূন্য মহাসড়ক
ধর্মঘটের কারণে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় চট্টগ্রামের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম থেকে আমদানি-রফতানি পণ্য নিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ ভারী যানবাহন চলাচল করে। পরিবহন বন্ধ থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছিল অনেকটাই ফাঁকা। শত শত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি ও কন্টেইনার ম্যুভার নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অলস পড়ে থাকতে দেখা যায়। চট্টগ্রাম নগরীর কদমতলী, মাঝিরঘাট ও সদরঘাটের পণ্য পরিবহন সংস্থার অফিসগুলোতেও ছিল না কোন কর্মব্যস্ততা। আমদানি-রফতানির পাশাপাশি সার ও ভোগ্যপণ্যের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনও বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেডসহ চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকে দিনভর। ধর্মঘটের কারণে বাজারে শাকসবজির সঙ্কটেরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রেল, নৌপথে বাড়ছে পণ্য পরিবহন
সড়কপথে ধর্মঘটের কারণে রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল ম্যানেজার নাসির উদ্দিন আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, রেলপথে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রয়েছে। ধর্মঘটের কারণে সড়কে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় রেলপথে পণ্যবাহী ওয়াগনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানী তেল এবং কন্টেইনার পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি মালামাল নিয়ে নৌপথে চার শতাধিক কোস্টার জাহাজ চলাচল করে। এসব জাহাজে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে। আমদানিকারকেরা দ্রুতসময়ে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে নৌপথকে বেছে নিচ্ছেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: চট্টগ্রাম বন্দর

২৬ জুলাই, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন