Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

অপ্রদর্শিত আয় এবং সম্পদ প্রসঙ্গে

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ২২ নভেম্বর, ২০১৯, ৫:২৭ এএম

॥ সাত ॥

লিসানুল আরব গ্রন্থে বলা হয়েছে- গোপনভাবে অপরের সম্পদ হরণ করাকে চুরি বলে। তাহ্যীবুল লুগাত গ্রন্থে বলা হয়েছে: শরীয়তের বিধান অনুযায়ী বালেগ ও বিবেকবান ব্যক্তি কর্তৃক দশ দিরহাম পরিমাণ সম্পদ হরণ করাকে চুরি বলে। মোট কথা, কোন জ্ঞানবান বালেগ ব্যক্তি কর্তৃক অপরের মালিকানাধীন সংরক্ষিত নিসাব (এক দিনার বা দশ দিরহাম) পরিমাণ সম্পদের মূল্য, যার মাঝে চোরের কোন অধিকার কিংবা অধিকারের কোন অবকাশ নেই। গোপনে ও ধরা পড়ার ভয়ে সবার অলক্ষ্যে স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে হস্তগত করাকে চুরি বলে। সে ব্যক্তি মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক অথবা মুরতাদ হোক অথবা পুরুষ হোক কিংবা মহিলা হোক, স্বাধীন হোক কিংবা দাস হোক এতে কোন পার্থক্য হবে না। সবার বেলায় একই বিধান প্রযোজ্য।
জাস্টিনিয়ানের বিধিবদ্ধ আইন এ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী কাউকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে তার সম্পত্তি ব্যবহার বা দখল করা অথবা অন্যের সম্পত্তি অবৈধভাবে আত্মসাৎ করার নাম চুরি। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, অপহরণ করার উদ্দেশ্যে অন্যের অস্থাবর সম্পত্তি আত্মসাত বা ব্যবহার করলে তা চুরি বলে বিবেচিত হয়। আর চুরির দায়ে শুধু চোর নয়, চোরের সহায়তাকারী এবং পরামর্শদানকারীও অভিযুক্ত হতো।
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে নবী! মুমিন নারীগণ যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এ মর্মে যে, তাারা আল্লাহর সহিত কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, যেনা করবে না তখন তাদের বায়আত গ্রহণ করিও।’’ আল-কুরআনের চুরির শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও এতো তাদের কৃতকর্মের ফল এবং প্রদত্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ উল্লেখ্য যে, ইমাম চতুষ্ঠয়ের মতে, হাত কব্জি থেকে কেটে দিতে হবে।
প্রকাশ থাকে যে, প্রথমবার চুরির দায়ে ডান হাত, দ্বিতীয়বার চুরির দায়ে বাম পা কেটে দিতে হবে। এ ব্যাপারে সকল ইমাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। মুহাম্মদ জামালুদ্দীন কাসেমী, মুহাসিনুত তা’বীল, তৃতীয়বার চুরি করলে তার শাস্তি কী হবে এ বিষয়ে অনেক মতভেদ পরিলক্ষিত হয় যা এ স্বল্প পরিসরে আলোচনার সুযোগ নেই। তাই উক্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য উল্লেখিত গ্রন্থগুলো দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশ দ-বিধির ৩৭৯নং ধারা অনুযায়ী সাধারণ চুরির শাস্তি হলো তিন বছর কারাদ- অথবা অর্থ দ- অথবা উভয় দ-ে দন্ডিত হবে। আর বাসাবাড়ি থেকে চুরি করলে শাস্তি হলো সাত বছর কারাদন্ড অথবা অর্থ দন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। রোমান আইনে আগে চুরিকে একটি দেওয়ানী ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো; কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটিকে ফৌজদারি ও দন্ডণীয় অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। কাজেই চুরির বিরুদ্ধে দ্বিবিধ প্রতিকার ছিল নিম্নরূপ: ১. চুরির ধরণ যাই হোক চোরাই মাল ফেরৎ দেয়া হচ্ছে চুরির প্রতিকারে প্রাথমিক ব্যবস্থা। ২. চুরির ক্ষেত্রে শান্তি জরিমানা। ক. হাতে নাতে ধরা পড়া চুরির ক্ষেত্রে চোরাই মালের মূল্যের চারগুণ এবং পরে ধরা পড়া চুরির ক্ষতিপূরণ চোরাই মালের মূল্যের দ্বিগুণ।
ডাকাতি বড় ধরণের অপরাধ। ডাকাতি চুরির চেয়ে অধিকতর ভয়াবহ। পরকালীন শাস্তি ছাড়াও এ অপরাধের জন্য ইসলাম পার্থিব দন্ডবিধি দিয়েছে। মানব জীবনে অর্থ-সম্পদ থাকা অপরিহার্য। ইসলাম এ ধন-সম্পদ অর্জন ও ব্যয় ভোগের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিধান পেশ করেছে। হলাল পথে উপার্জিত ধন-সম্পদকে হালাল ঘোষণা করেছে আর হারাম পথে অন্যায় ও জুলুমের মাধ্যমে আহরিত ধন-সম্পদকে হারাম করে দিয়েছে এবং পরকালে কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তিকে নিপতিত হওয়ার ভয় দেখিয়েছে। ডাকাত শব্দের অর্থ দস্যু, লুণ্ঠনকারী, বলপূর্বক অপহরণকারী, অসম সাহসী ও নির্ভীক এবং ডাকাতি শব্দের অর্থ হল: দস্যুবৃত্তি, দস্যু দ্বারা লুণ্ঠন, অসম সাহসিক ও বিস্ময়কর দুষ্কর্ম ইত্যাদি। যেসব লোক সশস্ত্র হয়ে পথে-ঘাটে, ঘরে-বাড়িতে, নদীতে-মরুভূমিতে নিরন্ত্র মানুষের উপর হামলা চালায় এবং প্রকাশ্যভাবে জনগণের সম্মুখে জনগণের ধন-মাল হরণ করে নিয়ে যায়, তাদেরকেই বলা হয়েছে ডাকাত, লুণ্ঠনকারী বা মুহারিবুন।
বাংলাদেশ দ-বিধির ভাষ্যে বলা হয়েছে, ‘‘যদি চুরি করিবার উদ্দেশ্যে বা চুরি করিতে কিংবা চুরিতে লব্দ সম্পত্তি বহন বা বহনের উদ্যোগকালে অপরাধকারী তদুদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায় বা আঘাত করে কিংবা আটক করে ভীতি প্রদর্শন করে তাহলে উক্ত চুরিকে দস্যুতা বলে।’’আর সেই ক্ষেত্রে ৫ বা ততোধিক ব্যক্তি মিলিত হইয়া কোন দস্যুতা অনুষ্ঠান করে বা করিবার উদ্যোগ করে তাহা হইলে তাকে ডাকাতি বলে।
যারা ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ ছিনিয়ে নেয় এবং ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষের জীবন ও সম্ভ্রমহানী ঘটায় তাদের ক্ষেত্রে আল-কুরআনের সরাসরি শাস্তির ঘোষনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আযাব কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন