Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

নিত্যপণ্যের মূল্য কারসাজি রুখতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৭ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। গত মওসুমে দেশে যে পরিমান পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে তা বছরের সামগ্রিক চাহিদার প্রায় কাছাকাছি। তদুপরি সারাবছর ধরেই ভারত, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছে আমদানিকারকরা। অতএব পেঁয়াজের বড় ধরনের সংকট বা ঘাটতির কোনো কারণ নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও এমনটা দাবী করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, গত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই দেশে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এটি শুরু হয়েছিল সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করেই বাংলাদেশে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণার পর থেকে। এখনো দেশের প্রায় সব বাজারে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগই দেশি পেঁয়াজ। আর মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের মূল্য ৪৫টাকা কেজির বেশি নয়। কিন্তু আমদানিকারক, মজুদদার ও পাইকারি বিক্রেতাদের মূল্য কারসাজির জালে বন্দি খুচরা বিক্রেতা এবং ভোক্তারা এখন দুইশ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধুমাত্র পেঁয়াজের মূল্য কারসাজির মধ্য দিয়ে গত দুই মাসে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে বাড়তি অন্তত ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন। পেঁয়াজের মূল্য ২৫০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর মূল্য কমাতে পেঁয়াজ আমদানিসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও এসব পদক্ষেপে বাজারে তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যাচ্ছে না। মাত্র কয়েকদিন কেজিতে ৩০-৫০ টাকা কমার পর গত কয়েকদিনে মূল্য বেড়ে আবারো ২০০ টাকার উপরে উঠে গেছে।

পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে দেশে সরগরম আলোচনার মাঝখানে হঠাৎ করেই সারাদেশে লবনের মূল্যবৃদ্ধির সিন্ডিকেটেড গুজব ছড়িয়ে হঠাৎ করেই কয়েকগুন বেশি মূল্যে লবন বিক্রি করতে শুরু করে অসাধু চক্র। তবে তাৎক্ষনিক পুলিশি অভিযানসহ লবনের চাহিদা ও মজুদের তথ্য তুলে ধরার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে। দেশে চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি উদ্বৃত্ত লবণের মজুদ থাকার পরও গুজব ছড়িয়ে মূল্য বাড়িয়ে মুনাফা করার এই ঘটনা থেকেই পেঁয়াজের কারসাজির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিবছর দেশে বাম্পার ধান উৎপাদনের মধ্য দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্ন হয়েছে দেশ। কিন্তু প্রতিবছরই ধানের ভরা মওসুমে ভারত থেকে চাল আমদানির মধ্য দিয়ে ধানের মূল্যে ধস নামিয়ে কৃষকদেরকে লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে বাধ্য করে একটি অসাধুচক্র। লবনচাষিরা ন্যায্য মূল্য না পেয়ে রাজপথে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করলেও এক শ্রেণীর আমদানিকারক বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে সিন্ডিকেটেড মজুদ ও মূল্য কারসাজি চালিয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যে সিন্ডিকেটেড মূল্য কারসাজি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে অন্যতম অন্তরায়। এ ধরনের কারসাজি বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ খুবই অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত।

পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারসাজি ঠেকাতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা অস্বীকার করা যায় না। দেশি পেয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত আছে এবং গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য তালিকা জানাও খুব সহজ। সমুদ্র বন্দরে এবং কার্গো বিমানে হাজার হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির পরও যখন মূল্য সহনীয় রাখা যাচ্ছে না, তখন বুঝতে হবে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ের গতানুগতিক প্রক্রিয়াগুলো কোনো কাজে আসছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের(এনবিআর) পক্ষ থেকে পেঁয়াজ আমদানিকারকদের উপর খবরদারি ও জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেয়ার পরও পেঁয়াজের বাজার ঊর্ধ্বমুখী ও অস্থিতিশীল রয়েছে। এ থেকে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পেঁয়াজ আমদানিকারক ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গত সোমবার ১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এনবিআর। আমদানিকারকদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, এর ফলে আমদানিকারকদের মধ্যে অহেতুক ভীতির সঞ্চার এবং বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কিনা তা নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ডেকে এনে তথ্য সংগ্রহের চেয়ে শুল্ক গোয়েন্দাদের দিয়ে প্রকৃত অপরাধিদের শনাক্ত করা সম্ভবত বেশি কার্যকর। গরিবদের জন্য ভতুর্কি মূল্যে পেয়াঁজ আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করার কথা থাকলেও সে সব পেঁয়াজ কালো বাজারে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দুর্নীতি-কালোবাজারি রোধ করতে যারা ব্যর্থ তারা কিভাবে আমদানিকারক ও পাইকারি বাজারের সিন্ডিকেটকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবেন! চাল-ডাল, তেল-লবন, পেঁয়াজ-রসুন, চিনিসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের চাহিদা, উৎপাদন, আমদানি, মজুদ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। মূল্য সন্ত্রাসি সিন্ডিকেটকে অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তবে ভুল সিদ্ধান্ত বা প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে যেন বাজার অস্থিতিশীল হয়ে না পড়ে সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নিত্যপণ্য

১৭ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন