Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৮ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

অপরূপা কর্ণফুলী

বিস্ময় নিঝুমদ্বীপ

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ৩০ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

সারি সারি জাহাজ। বর্ণিল আলোর ছটা। অপরূপা কর্ণফুলীতে ছোট বড় ঢেউ। হেলেদুলে চলা নৌকা, সাম্পানের সারি। গোধুলি বেলায় অন্যরকম এক আবহ চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার এ বন্দর দিনে দিনে ভ্রমণ পিপাসুদের নজর কাড়ছে। আমদানি-রফতানিসহ অর্থনৈতিক কর্মকা- ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর ঘুরে দেখতে আসছেন অসংখ্য মানুষ। বন্দরের ধারক কর্ণফুলীকে ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। পতেঙ্গা সৈকত, দৃষ্টিনন্দন কর্ণফুলী ঝুলন্ত সেতু এবং ঢাকার হাতির ঝিলের আদলে গড়ে উঠা ফিরিঙ্গিবাজার মেরিনার্স রোডের পাশে ‘নেভাল-২’ পর্যটন স্পটকে ঘিরে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটকের সমাগম ঘটছে।

লুসাই কন্যা কর্ণফুলী নদীর মোহনায় চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থাপনা। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত আধুনিকায়ন হয়েছে। সৈকতে দাঁড়িয়ে আদিগন্ত বিস্তৃত সাগরের ঢেউয়ের সাথে চোখে পড়ছে বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে থাকা বিদেশি জাহাজের সারি। পনেরো নম্বর জেটি যেখানে চট্টগ্রাম নগরীর স্থলভাগ শেষ সেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় নদীর ওপারে কাফকো আর সিইউএফএলের দৃষ্টিনন্দন ভবন। এ পাড়ে আছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আছে দেশের প্রথম বাটারফ্লাই পার্ক।
পতেঙ্গা সৈকত এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের প্রথম কর্ণফুলী টানেল। সৈকত হয়ে আউটার রিং রোডের নির্মাণ কাজও শেষ পর্যায়ে। কর্ণফুলীর বারো নম্বর ঘাট এলাকায় নৌবাহিনীর বোট ক্লাব। তার পাশে রয়েছে চিটাগাং ডাইডক। গুপ্তখাল এলাকায় রাষ্ট্রায়াত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনার জ্বালানি তেলের ডিপো। সেখান থেকে সড়ক আর রেলপথে পরিবহন হয় জ্বালানি। চট্টগ্রাম বন্দরের আট নম্বর থেকে পনেরো নম্বর জেটি এলাকা গেলে একসাথে চোখে পড়ে বিমান, জাহাজ, রেল ও সড়কে যানবাহন চলাচলের দৃশ্য।

চট্টগ্রাম বন্দরের মূল অংশ সংরক্ষিত এলাকা হওয়ায় সেখানে সাধারণের প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে কর্ণফুলী নদী হয়ে বন্দরের জেটিতে মালামাল উঠানামায় ব্যস্ত দেশি-বিদেশি জাহাজ দেখার সুযোগ রয়েছে। বন্দরের এ কর্মযজ্ঞ দেখতে পর্যটকদের অনেকে কর্ণফুলীর সদরঘাট থেকে পতেঙ্গা সৈকত পর্যন্ত এলাকায় নৌকা ভ্রমণ করেন। তবে এ দৃশ্যটি আরও সহজে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নগরীর সদরঘাট থেকে পনেরো নম্বর ঘাট তথা বিমানবন্দর পর্যন্ত চালু হচ্ছে ওয়াটার বাস।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ। খুব শিগগির নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ওয়াটার বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করবেন। বন্দর সচিব জানান, দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশাধিকার সীমিত। তবে পর্যটকেরা ওয়াটার বাসে চড়ে কাছ থেকে বন্দর দেখার সুযোগ পাবেন।
কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। সন্ধ্যায় সেখানে অগণিত মানুষের ভিড় জমে। সেতুর আলোর ঝলকানির সাথে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে কর্ণফুলীতে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বড় জাহাজের বর্ণিল আলো অন্যরকম এক পরিবেশের সৃষ্টি করে। মহানগরীর কোলাহল থেকে দূরে এমন দৃশ্য দেখতে অনেকে ভিড় জমান কর্ণফুলীর তীরে। সিডিএর উদ্যোগে মেরিনার্স সড়কে নির্মাণাধীন নেভাল-২ পর্যটন কেন্দ্রেও এখন ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্রতে। এর পাশাপাশি পনেরো নম্বর ঘাটে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক আসছেন। নদীর ওপাড়েই রয়েছে রাষ্ট্রায়াত্ত সার কারখানা সিইউএফএল ও বহুজাতিক সার কারখানা কাফকো।

আছে দেশের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেরিন একাডেমী। দেশের প্রথম বেসরকারি ইপিজেড কোরিয়ান ইপিজেডও গড়ে উঠেছে নদীর ওপাড়ে। নদী তীরে আছে বেশ কয়েকটি সিমেন্ট ও জাহাজ নির্মাণ কারখানা। এ পাড় থেকে সাম্পান নৌকা ভাড়া করে সহজেই ওপাড়ে যাওয়া যায়। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক বন্দর এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি নদীর ওপাড়ের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা পরিদর্শন করছেন।

স্থাপনার পাশাপাশি কর্ণফুলীর দুপাড়ে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। ডাইডককে ঘিরে সবুজ বনানীতে বিকেল হলেই বসে হাজারো পাখির মিলনমেলা। দিন শেষে হরেক রকমের পাখি ছুটে আসে ডাইডকের প্রধান ফটক সংলগ্ন বনে। গাছের প্রতিটি শাখায় অগণিত পাখির ভিড়। কিচিরমিচির শব্দে পথচারীদের নজর কাড়ে হরেক পাখ-পাখালি। পাখি দেখতে সন্ধ্যার পর সেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড় জমে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বোট ক্লাবকে ঘিরেও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সে ঘাটে রয়েছে জাহাজে ঘুরে কর্ণফুলী নদীতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ। পনেরো নম্বর ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখা যায় সারি সারি ছোট জাহাজ নোঙর করা আছে নদীর দুই তীরে। জোয়ারের সময় কর্ণফুলীর বুক চিরে বিশাল দেশি-বিদেশি জাহাজের আসা-যাওয়ার দৃশ্যও সকলের নজর কাড়ে। জোয়ারের সময় প্রতিদিন অসংখ্য জাহাজ বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে ভিড়ে। আবার জেটি থেকে মালামাল বোঝাই করে কর্ণফুলীর মোহনা হয়ে বহির্নোঙরের দিকে চলে যায়।
শাহ আমানত বিমানবন্দরের পাশে গড়ে উঠেছে প্রজাপতি পার্ক। ওই পার্কে রয়েছে হাজার রকমের বর্ণিল প্রজাপতি। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি সব বয়সের মানুষ সেখানে ভিড় করেন। পার্কে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আছে। পার্ক থেকে বের হলেই বিমানবন্দর এলাকা। ব্যাপক বনায়নের ফলে পুরো এলাকা সবুজে ঘেরা। পর্যটকদের অনেকে ঘুরে বেড়ান সেখানে।

পথ নির্দেশিকা : মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে রিকশা, অটোরিকশায় কোতোয়ালীর মোড়। সেখান থেকে টেম্পু কিংবা অটোরিকশায় যাওয়া যায় কর্ণফুলী সেতু এলাকায়। টেম্পুতে ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। আবার শহরের যে কোন প্রান্ত থেকে অটোরিকশা কিংবা সিটি সার্ভিসের বাসে যাওয়া যায় পতেঙ্গা পনেরো নম্বর ঘাট এবং সৈকত এলাকায়।

আবাসন ব্যবস্থা : কর্ণফুলীর সৌন্দর্য কাছে থেকে উপভোগ করার জন্য সৈকত এলাকায় আছে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট ও আবাসিক হোটেল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চিটাগাং বোট ক্লাব (ফোন-২৫০২৩৩৪-৫)। উজানে গিয়ে সবুজ পাহাড় প্রকৃতি ঘেরা কর্ণফুলীর অপরূপ শোভা দেখতে যারা যাবেন তাদের জন্যও কাপ্তাই ও চন্দ্রঘোনায় আবাসিক সুবিধা আছে। সেখানে সরকারি-বেসারকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে হোটেল, রেস্টহাউস ও গেস্ট হাউস। আছে নৌ বিহারের ব্যবস্থাও।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নিঝুমদ্বীপ

৩০ নভেম্বর, ২০১৯
আরও পড়ুন