Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৭ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

জরুরি অবস্থাকে জরুরিভাবেই গ্রহণ করতে হবে

মাহমুদুল হক আনসারী | প্রকাশের সময় : ২ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আর শুধুমাত্র উৎকণ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন সমাজের মধ্যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্যোগ পরিস্থিতি ও ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে আজ জরুরি ভিত্তিতে অধিক গবেষণা ও কর্মসূচি নিতে দেখা যাচ্ছে। বিগত ৪০ বছরব্যাপী সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে চালানো এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এখন পৃথিবীর জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘বায়োসাইন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটির স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বের প্রায় ১১ হাজার বিজ্ঞানী। প্রতিবেদনে সংকট মোকাবিলায় আমূল ও টেকসই পরিবর্তন ছাড়া বিশ্ব ‘অবর্ণনীয় দুর্যোগের’ পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটির প্রধান গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ডক্টর থমাস নিউসাস বলেছেন, জরুরি অবস্থা মানে হচ্ছে, আমরা যদি এখনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পদক্ষেপ না নিই, তাহলে ভবিষৎতে পরিবর্তনজনিত প্রভাব বর্তমানের চেয়ে অধিকতর মারাত্মক ও গুরুতর হয়ে উঠবে। এজন্য পৃথিবীর কার্বন নিঃসরণ, গাছ কেটে জমি উজাড় করা ও ফসিল জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভয়াবহতার স্বরূপ অনুধাবন করে জরুরি পদক্ষেপকে কোনো অবস্থায় ছোট করে দেখা উচিত হবে না। এর পেছনে যথেষ্ট যুক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে যাওয়া পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে আশংকার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ নিয়ে দুুনিয়াব্যাপী বিপুলভাবে হতাশা তৈরি হয়েছে।

গবেষকরা এ সাময়িকীতে উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সমাজ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ৪০ বছরে প্রতি দশকে বাতাস ও সোলার শক্তির ব্যবহার বেড়েছে ৩৭৩ শতাংশ হারে। তা সত্তে¡ও ২০১৮ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের তুলনায় নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার ২৮ গুণ কম ছিল। সবদিক বিবেচনায় বিজ্ঞানীরা জানান দিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ নির্দেশিকায় নেতিবাচক দিকে যাচ্ছে। তরান্বিত করছে জলবায়ু পরিবর্তন। তবে এর মধ্যেও প্রতিবেদনে প্রকাশ, এখনো আশা শেষ হয়ে যায় নি যে, কিছু কিছু খাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিলে অনুুমিত ভবিষ্যৎতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন গড়ে তোলা সম্ভব। এটা প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও নদীবিধৌত ব-দ্বীপ বাংলাদেশ আরো প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। আবার উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত আছে। ফলে দুর্যোগ ঝুঁকি আরো বাড়ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, খরা, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদী ভাঙ্গন অব্যাহত আছে। জলাবদ্ধতা ও পানি বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততা এদেশের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

এসব দুর্যোগ কোনো না কোনোভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৯৬০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩টি সাইক্লোন হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু করে ২০১৭ সাল থেকে। এর পূর্বে একটা সময় ছিল ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের নামকরণ করা হতো না। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৬০ সাল থেকে ২০০৭ সালে সিডর পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়গুলোকে ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৭ সালে প্রথম স্পষ্ট সাইক্লোনের নামকরণ করা হয়। ২২৩ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা এবং ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আসা, সেই ঘূর্ণিঝড় ছিল সিডর যাকে, সাইক্লোনিক স্টর্ম উয়থ কোর অব হারিকেন উইন্ডস (সিডর) নাম দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সর্বোচ্চ ২৪০ কিলোমিটার ধেয়ে আঘাত আনে প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি ১০ থেকে ৩৩ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে আঘাত হানে চট্টগ্রামে। যে হিসেব পাওয়া যায় তাতে ১৯৭০ সালের প্রবলতম ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানব সন্তান মারা যায়। এছাড়াও কয়েক লাখ পশু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয়। ঘূর্ণিঝড় সিডর ২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর খুলনা বরিশাল উপকূলে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড় আইলা ২০০৯ সালে ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গ খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত করে।

২০১৫ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূলে ৫ থেকে ৭ ফুট ঘূর্ণিঝড় কোমেন আঘাত করে। ২০১৬ সালের ২১ মে বরিশাল চট্টগ্রাম উপকূলে ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চতায় ঘূূর্ণিঘড় রোয়ানু প্রচন্ড আঘাত করে। ২০১৭ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূলে ঘূর্ণিঝড় মোরা ব্যাপক আঘাত করে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানে খুলনা ভোলাসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে। তবে বুলবুল যেভাবে বাংলাদেশের উপরে ধেয়ে আসছিল তা থেকে অনেকটা এবারের মতো বেঁচে গেল উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ ও পশুপাখি। সংগত কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জরুরি অবস্থাকে আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ