Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার , ২৪ জানুয়ারী ২০২০, ১০ মাঘ ১৪২৬, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

সামাজিক অস্থিরতার নেপথ্যে

মো. আমিনুর রহমান | প্রকাশের সময় : ৪ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম

সামাজের অস্থিরতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার পাশাপাশি মানব মনের অস্থিরতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈষম্য, অসম প্রতিযোগিতা, বস্তুবাদী মনোভাব, নীতিহীনতা অস্থিরতাকে দিন দিন উস্কে দিচ্ছে। মানুষের সহ্য ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ধৈর্য্য ও সহ্যশক্তি রসুনের খোসার মত পাতলা হয়ে যাচ্ছে, সমাজে নানা অসহিষ্ণুতার বিষবৃক্ষ জন্ম হচ্ছে এবং অনিষ্ট জেঁকে বসছে। বিপদে-আপদে মানুষের অস্থির হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অস্থিরতা যখন প্রকট আকারে প্রকাশিত হয় তখন এ রোগ সমাজকেও অস্থির করে তোলে। সমাজ যখন সুযোগ সৃষ্টিতে বৈষম্য তৈরী করে, তখন মানুষের মন অস্থির হয়। এক দল নিষ্পেষিত হয়, অপর পক্ষে কেউ প্রশাসন বা শক্তিধর কারোর আনূকুল্য নিয়ে তরতর করে উপরওয়ালা বনে যায়। সমাজে মামার জোর বলে একটা কথা আছে। খুঁটির জোরে অযোগ্যরা যখন এগিয়ে যায় এবং মানুষের এগিয়ে যাওয়ার স্বভাবিক গতি রুদ্ধ হয়, তখন সমাজে অস্থিরতা তৈরী হয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে এক শ্রেণির মানুষ আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়, অপর পক্ষে নিয়ম নীতির মধ্যে থেকে প্রনান্তকর চেষ্টা করেও অন্যদের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সমাজে নানামুখী অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। বাজারে পণ্যের অতিমাত্রায় অসামঞ্জস্যতা ও বিভাজনও সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। পণ্য কেনাকাটার ক্ষেত্রেও বৈষম্য সৃষ্টি এবং প্রতিযোগিতাও পরিবার ও সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পাশের বাসার ভাবী-আপার ভাল-দামী শাড়ী, স্বর্ণালংকার, তৈজষপত্র কিংবা দামী গাড়ি আছে, আমার নেই কেনÑএমন প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতাও অস্থিরতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়ে ওঠে। এতে যেমন পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়, তেমনি সীমিত আয়ের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও অসহায় করে তোলে। এককভাবে কোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যদি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও শক্তির ধারক হয়, তবে সমাজে অস্থিরতা তৈরী হয়। সে তখন আর অন্যদের পাত্তা দেয়না, ধরাকে সরাজ্ঞান করে। এতে অপর পক্ষ নিজেকে নিতান্ত অপাংতেয় ও অসহায় ভেবে প্রতিরোধহীন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। সে না পারে সইতে, না পারে হজম করতে। এভাবে তার মধ্যে অস্থিরতা তৈরী হয়। সমাজ যখন কোন পক্ষকে উপায়হীনতার দিকে ঠেলে দেয়, তখন সমাজও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।

মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করার আরেকটি কারণ হচ্ছে কর্মহীনতা। এ কারণে নিরাশার অন্ধকারে জীবনের উদ্যম হারিয়ে অস্থির হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অতি দারিদ্র্য যেমন অনেককে অস্থির করে, তেমনি অধিক মাত্রার প্রচুর্যও অস্থিরতা বাড়ায়। দারিদ্র্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, আর অধিক প্রাচুর্য আরো প্রাপ্তির নেশা সৃষ্টি করে অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। এ অস্থিরতার মধ্যে মাত্রাগত পার্থক্য থাকতে পারে। তবে এই দুই অবস্থাই সামাজিক বিপত্তি এবং অনেক সময় সমাজকে ধ্বংস করার জন্য সমান নেতিবাচক ভ‚মিকা রাখে।

সমাজের বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অস্থিরতার জন্য দায়ী। সামান্য বিষয় নিয়ে যাত্রীর সাথে চালকের সহকারী অথবা এক যাত্রীর সাথে অন্য যাত্রীর কথা কাটাকাটি, রাস্তায় রিক্সা ও সিএনজি চালকের সঙ্গে আরোহী, দোকানীর সঙ্গে ক্রেতার সামান্য কারণে প্রায়ই ঝগড়া দেখা যায়। এগুলোও এক ধরনের অস্থিরতা। জীবনের কোন বিরূপ স্মৃতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈপরিত্য এবং অসামঞ্জস্যতা প্রভৃতি নেতিবাচক ঘটনা অনেকের মধ্যে চাঁপা ক্ষোভ, হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরী করে। ফলে মানুষ হয়ে উঠে খিটখিটে, অসহিষ্ণু ও অস্থির।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অনাস্থা ও অসন্তোষ থেকে জনমনে বিশৃংখলা ও বিক্ষোভের জন্ম হয়, অসন্তোষকে উস্কে দেয়। অনেক সময় নজিরবিহীন বৈষম্য জনমনেক সরকার, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তখন সরকারের কোন উদ্যোগেই আর জনগণের আস্থা থাকেনা। ফলে সমাজ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বঞ্চিত সাধারণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশোমন করতে না পারলে বিক্ষোভ, অস্থিরতা থামানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। সমাজের দায়িত্বশীল ও কর্তা ব্যক্তিদের অতিকথন, অপকথন ও অস্থিরতার জন্য কম দায়ী নয়। অতি স¤প্রতি পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি নিয়ে এক কর্তাব্যক্তির অতিকথনে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়ে দাম আরো বেড়ে যায়। এ ধরনের দায়িত্বহীন বক্তব্যও অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ক্ষমতাবানরা ভুল করলে নিরহদের মধ্যে সহিষ্ণুতা লোপ পায়। অস্থিরতা ও সংঘাত ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে রূপ লাভ করে। বিশ্বাস মানুষের মধ্যে উদারতা ও আশার জন্ম দেয়। নৈতিক মানুষ শুধু লোভের তাড়নায় চলে না। বস্তু স্বার্থের ক্ষুদ্র গÐির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনা। বরং তার মধ্যে ত্যাগের মনোভাব ও নিঃস্বার্থবাদিতার জন্ম হয়। ফলে সে শুধু বস্তুগত প্রাপ্তির দিকে নজর না দিয়ে মানুষের ও সমাজের কিসে উপকার হয়, দেশের কি কল্যাণ হয় এ বিষয়গুলোকেই জীবনের লক্ষ্য বানায়। সে অতৃপ্তিতে নুব্জ্য না হয়ে পরার্থপরতার আনন্দে গতিশীল হয়। বিশ্বাসহীনতা দূর করে বিশ্বাসবোধের মাধ্যমে হতাশা ও অস্থিরতামুক্ত সমাজ সৃষ্টি করে। আল-কুরানে আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন, ‘(আসলে) মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্তরূপে। যখনি তার উপর কোন বিপদ-মুসিবত আসে তখন সে হা- হুতাশ করে। আর যখন তার কল্যাণ (স্বচ্ছলতা) ফিরে আসে তখন সে কার্পণ্য করতে আরম্ভ করে, (আল মায়ারেজ ১৯-২১)।’ আল্লাহ এ অবস্থা থেকে বাঁচার উপায় বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘যারা তাদের নামাজ আদায়ে নিষ্ঠাবান, তারা এ অবস্থার ব্যতিক্রম।’ আল-কুরআনে আরো বলা হয়েছে, যারা বিচার দিবসকে সত্য বলে জানে। (তদুপরি) যারা তাদের রবের আযাবকে ভয় করে, তারাও হা-হুতাস, অস্থিরতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে। অস্থিরতার এতসব কারণ কারো একার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। সবার উচিৎ দায়িত্বশীল ভ‚মিকা রাখা। দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে জীবন বদলে যাবে। তাই নিজেকে বদলাতে হবে। মনের শক্তি অনেক বড় শক্তি। নৈতিক শক্তি তার চেয়েও শক্তিশালী। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি জনশুদ্ধির চেষ্টা করলে দেশে স্থিরতা ফিরে আসবে।
লেখক: সিনিয়র ব্যাংকার।
aminurrahman1964@yahoo.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন