Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ২৩ জানুয়ারী ২০২০, ০৯ মাঘ ১৪২৬, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

দুর্নীতি গিলে খাচ্ছে দেশের উন্নয়ন

ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল | প্রকাশের সময় : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বাংলাদেশের সব উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। হাওরে বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাঁধের নামে যা করা হয়, আগাম বর্ষার এক ধাক্কায় তা উবে যায়। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা মেরামত, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। কয়েক মাস না যেতেই সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সরকারি ভবন নির্মাণে রডের বদলে বাঁশও ব্যবহৃত হয়। এতে উন্নয়নের পুরো টাকাটাই গচ্চা যায়। সরকারি অফিসগুলোতে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, এটা ওপেন সিক্রেট। ফিটনেসহীন গাড়ি ঘুষ দিয়ে ফিটনেস পায়, অদক্ষ চালক ড্রাইভিং লাইসেন্স পায়। এরপর রাস্তায় নেমে মানুষ মারে। সরকারি কেনাকাটায়ও চলে দুর্নীতি। সবচেয়ে বেশি দামে সবচেয়ে খারাপ গম আমদানির পর কেউ নিতে চায় না। এভাবে আর কত দিন চলবে?

কেনাকাটায় দুর্নীতি এখন দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বালিশ কেনায় অস্বাভাবিক মূল্য গণমাধ্যমে আসে প্রথম। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে, টেন্ডার আহ্বানের আট মাস আগেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎপ্রকল্পের অন্তত তিনটি ভবনের জন্য ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস আইটেম, ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক্যাল আয়রন, বালিশ, তোশক ও আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎপ্রকল্পের বিছানা, বালিশ ও আসবাবপত্র কেনার অনিয়মের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

কেনাকাটায় দুর্নীতির আরেকটি উদাহরণ ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে আইসিইউর রোগীকে আড়াল করে রাখার এক সেট পর্দার দাম পড়েছে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা! শুধু এ পর্দা নয়, কলেজের বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রায় ৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে। গত মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির দামে অস্বাভাবিক প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। একটি সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্কের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা। যার সম্ভাব্য বাজার মূল্য ১০০ থেকে ২০০ টাকা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ভবন নির্মাণের আগেই যন্ত্রপাতি কেনার ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে। এই ডিপিপিতে একই ধরনের যন্ত্রপাতির দামের ব্যবধান প্রায় ৫০০ গুণ। কিন্তু এসব উদাহরণ পেছনে ফেলে দিয়েছে হবিগঞ্জে শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের কেনাকাটার প্রস্তাব। একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, কলেজে ৪২ হাজার টাকার ল্যাপটপ কেনা হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা দরে। মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কালার প্রিন্ট প্রতিটি ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও কেনা হয়েছে সাত হাজার ৮০০ টাকা করে। কলেজ সূত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর বছরেও বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। ভাগ-বাটোয়ারা হয় ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১০৯ টাকার টেন্ডার।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও সরকারি কেনাকাটায়ই বড় ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে। বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। অন্যথায় দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে সরকারের অঙ্গীকার বাধার মুখে পড়বে।

দুর্নীতি প্রত্যাশিত নয়, এটি দেশ ও জাতির জন্য মহাক্ষতিকর। দুর্নীতি থাকলে উন্নয়ন যে ব্যাহত হয় এবং দেশের সত্যিকার উন্নয়ন হয় না, সেকথা বলাই বাহুল্য। গণতন্ত্র বহাল থাকলে উন্নয়ন হয় দেশের, পক্ষান্তরে গণতন্ত্রবিরোধীরা ব্যাহত করে উন্নয়ন।

বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের সঙ্গে জড়িতদের বিচার হতেই হবে। যারা দুর্নীতি, সন্ত্রাস করবে এবং জঙ্গীবাদে জড়াবে তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। দেশের শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এটা প্রয়োজন। দুর্নীতি রোধ করতে হলে প্রতিটি সরকারি বিভাগ ও অধিদপ্তরকে নিজেদের বিভাগীয় তদন্ত ও প্রতিকারের ব্যবস্থাকে সচল করতে হবে। আইনি রক্ষাকবচ ও স্বশাসিত বাজেট নিয়েও দুদকের নখদন্তহীন থাকা মূলত উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকারই নির্দেশক।

শাসনব্যবস্থার সর্বস্তরে, বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের দ্বারা সরাসরি পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোয় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে তা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেপরোয়া করে তোলে। এই চক্র থেকে বেরোতে হবে।

দুদক সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমনে বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। কিছু রাঘব বোয়াল দুর্নীতিবাজকেও আইনের আওতায় আনতে পেরেছে। দুদককে আরো গা ঝাড়া দিয়ে নামতে হবে। প্রয়োজনে দুদকের লোকবল ও রসদ বাড়াতে হবে। মুদ্রাপাচার, আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। দুদককর্মীদের আন্তরিকতা ও সংকল্প নিয়ে কাজ করতে হবে। দেশ থেকে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ নিধনে দুদক সফল হবে, এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবীদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি।



 

Show all comments
  • ash ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ৫:০২ এএম says : 0
    CHORRRR LIGGGGGG ER SHASHON
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুর্নীতি

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৯
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন