Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

রাজধানীকে সচল ও বাসযোগ্য করে তুলতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

ঢাকা বসবাসের অনুপযোগী, যানজটের নগরী, দূষিত নগরীর শীর্ষে-এসব খবর নতুন নয়। বহু বছর ধরে বিশ্বব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা এগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। তাতে যে ঢাকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না, তা বাস্তবেই দেখা যাচ্ছে। উন্নতি দূরে থাক, দিন দিন এর কেবল অবনমন ঘটছে। বলা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ শহরগুলোর শীর্ষ তালিকায় এর অবস্থান। গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংক ‘মেট্রো ঢাকা ট্রান্সফরমেশন প্ল্যাটফর্ম: ট্রান্সফরমিং মেট্রো ঢাকা ইনটু এ লিভঅ্যাবল প্রসপারুয়াস অ্যান্ড রিজিলিয়েন্ট মেগাসিটি’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেছে, রাজধানীতে যানজটের কারণে অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে তার পরিমাণ বছরে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। টাকার অংকে ২৫ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা। যানজটে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের ৯ হাজার কর্মঘন্টা নষ্ট হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকায় গাড়ি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬ গুণ। চলাচলরত যানবাহন ঘন্টায় যেতে পারে মাত্র ৬.৪ কিলোমিটার। অথচ হেঁটেই মানুষ যেতে পারে ৫ কিলোমিটার। এছাড়া রাজধানীতে প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদিত হয় ৬ হাজার টন। এর মধ্যে সংগ্রহ করা হয় ৪ হাজার টন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির ৩৬ শতাংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। জিডিপির ২০ শতাংশ আসে এ শহর থেকে। যানজটের কারণে তা ক্রমেই স্থবির হয়ে যাচ্ছে। এ শহরে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ বসবাস করে। প্রতি বছর স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ৩৫৮ হেক্টর জলাভূমি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ঢাকা বিশ্বের চতুর্থ দূষিত নগরী। বাসযোগ্যতার বিচারে দামেস্ক ও লাগোসের পরে ঢাকার অবস্থান।

একটি দেশের রাজধানী কতটা খারাপ হতে পারে তা ঢাকাকে না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না। এটা এমন এক নগরী যেখানে সহজে চলাচল, জীবনযাপন, বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায় না। প্রতি পদে পদে বিপত্তিতে পড়তে হয়। এই সময়ে রাজধানীর চিত্র দেখলে মনে হবে, এটা এক ভয়াবহ নগরী। সড়ক কাটাকুটি করা থেকে শুরু করে উন্নয়ন কাজের কারণে সড়কের অস্তিত্ব বলতে কিছু নেই। অথচ সরকার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলছে, অর্থনীতিতে আমরা আকশচুম্বি সাফল্য লাভ করছি। অচিরেই ধনী দেশে পরিণত হবো। বাস্তবতা হচ্ছে, রাজধানীর যে চিত্র তা কোনোভাবেই এসব সূচককে সমর্থন করছে, তা একজন সাধারণ মানুষও স্বীকার করবে না। একটি রাজধানীর চিত্র এবং জীবনমান, সুযোগ-সুবিধা, পরিবহন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শব্দ ও বায়ু দূষণের সূচক কতটা মানসম্মত ও স্বস্তিকর অবস্থায় থাকে, বোধকরি এর কোনোটাই ঢাকায় নেই। এ কারণে ঢাকা অর্থনৈতিক ও বসবাসের ক্ষেত্রে অনিরাপদ শহরে পরিণত হয়েছে। একে অসভ্য নগরী হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। অথচ এসব বিষয় সরকারের তরফ থেকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। সরকারের তরফে দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে জিডিপিসহ অন্যান্য সূচকের যে উর্ধ্বগতি দেখানো হয়, তা দেশের মানুষের কাছে বাস্তবতার চেয়ে এখন শুধু ধারণায় পরিণত হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, দেশের রাজধানীর যে করুণ অবস্থা তাতে উন্নতিটা কোথায় হচ্ছে? একটি উন্নয়নশীল দেশের রাজধানীর চেহারা কি এরকম হতে পারে? সাধারণত উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে রাজধানীর সৌন্দর্য, সুযোগ-সুবিধা, গতিশীলতা এবং বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশকেই সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। চেহারা দেখলে যেমন মানুষের মনের প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়, তেমনি রাজধানীর সার্বিক পরিস্থিতি দেখলে উন্নয়নের চিত্রটাও বোঝা যায়। রাজধানীই হচ্ছে, দেশের অর্থনীতির প্রতিটি সূচকের উন্নয়নের প্রতীক। দুঃখের বিষয়, ঢাকার চিত্র দেখলে যে কেউ মনে করবে, সরকার যে উন্নয়নের কথা বলছে, তা কেবল খাতা-কলমে।
রাজধানী যে একটি অকার্যকর শহরে পরিণত হয়েছে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। এই অকার্যকর শহর নিয়েই সরকার উন্নয়নের সূচকের উর্ধ্বগতি দেখিয়ে যাচ্ছে। যে শহরে দেশের অর্থনীতির ৩৬ ভাগই সম্পন্ন হয়, সেই শহর বছরের পর বছর অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। শহরের ভেতরেই যদি যানজটের কারণে চলাচল করা না যায়, তবে অর্থনীতি গতিশীল হবে কী করে? আমরা মনে করি, সরকারকে অর্থনীতির প্রকৃত উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরতে হলে সবার আগে রাজধানীর উন্নয়ন এবং একে পরিপাটি ও গোছালো করতে হবে। এর জীবনমানের পরিবেশ, যানজট সহনীয় করে যাতায়াত সহজগম্য এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানীকে যেমন খুশি তেমনভাবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ রোধ করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন