Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ০৫ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭, ১৩ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্যবিমোচন

সরদার সিরাজ | প্রকাশের সময় : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্ক রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ক্ষুদ্রঋণে দারিদ্র বিমোচন হয় না-দারিদ্র লালিত-পালিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা রিপোর্টেও তাই বলা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের এক প্রতিবেদন মতে, ‘দৃশ্যত ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে এর ইতিবাচক প্রভাবের পক্ষে এখনো স্পষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি।’ সাবেক অর্থমন্ত্রী আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘যে দেশে ২০ হাজার প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণ দেয়, সে দেশে ছয় কোটি লোক কীভাবে দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে? এর মধ্যে আবার দুই কোটি লোক হতদরিদ্র। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের ৭০% আজও দারিদ্রসীমার নিচে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স¤প্রতি বলেছেন, ‘ক্ষুদ্রঋণে দারিদ্র লালিত-পালিত হয়।’ ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার সর্বাধিক, ঋণ আদায়ে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়, ইত্যাদি নানা অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ সঠিক। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণে দারিদ্রবিমোচন হয় কি-না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেক পন্ডিত ব্যক্তি বলেছেন, ‘ক্ষুদ্রঋণে দারিদ্রবিমোচন হয়।’ এরপরও ক্ষুদ্রঋণ ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে সারা বিশ্বেই। কোটি কোটি মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছে ক্ষুদ্রঋণে। এমনকি ধনী দেশগুলোতেও। এর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নামও। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নোবেল পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কার পেয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ যদি গরিব মানুষের জন্য কল্যাণকর না হয়ে মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকে; তাহলে তো এসব হওয়ার কথা নয়। কারণ, কিছু লোককে সাময়িক ধোঁকা দেওয়া যায় কিন্তু বেশি লোককে বেশিদিন ধোঁকা দেওয়া যায় না। ঠকবাজি ধরা পড়ে যায়-ই। এসব কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই নিবন্ধের প্রয়াস ক্ষুদ্রঋণের এবং এই ঋণ প্রদানকারী এনজিওদের পক্ষে। বরং এ নিবন্ধের মুখ্য প্রয়াস হচ্ছে, দেশের গরিব মানুষদের দারিদ্রের নিষ্ঠুর কষাঘাত থেকে রক্ষা করে তাদের আর্থিক উন্নতি ঘটিয়ে জীবনমান উন্নতর করার পথ খুঁজে বের করা। এখন দেখা যাক, দেশে দরিদ্র মানুষের ঋণ গ্রহণের মাধ্যম কী এবং সেই ঋণ নিয়ে কী করে তারা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদন মতে, ‘বাংলাদেশের হতদরিদ্র ব্যক্তিদের ৫০-৭৫% ঋণগ্রস্ত। তার মধ্যে ৫০-৬০% দেনাগ্রস্ত স্থানীয় মুদি দোকানগুলোর কাছে। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ২৯% হতদরিদ্র চিকিৎসা বাবদ খরচ করে, ১৭% দৈনন্দিন খাবার কেনে ও ১৩% অর্থ ব্যয় হয় মৃতের সৎকার, বিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠান ও জরুরি সঙ্কট মোকাবেলায়। হত দরিদ্রের ৬০% মানুষই আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ঋণ নেয়। দাদনের ঋণ নেয় ১০%। এ ছাড়া ১৪% গ্রামীণ ব্যাংক থেকে, ৭% ব্র্যাক থেকে, ১২% বিভিন্ন এনজিও থেকে এবং মাত্র ১% সাধারণ ব্যাংক থেকে। বিগত ২৫ বছরে ঋণ বা সাহায্যের নামে এ দেশে এসেছে ৫০ হাজার কোটি টাকা, তার ৭৫ ভাগ অর্থাৎ ৩৭.৫০ কোটি টাকা ‘তারাই নিয়ে গেছে’, বাকি ১২.৫০ হাজার কোটি টাকা এ দেশে একটি ধনিক শ্রেণি গঠনে খরচ হয়েছে। সরকারি তালিকাভুক্ত এনজিওর সংখ্যা ২,০৩৭টি। উক্ত প্রতিবেদন মতে, ‘গরিব মানুষ ঋণ নিয়ে মুদি দোকানের দেনা পরিশোধ, চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ, দৈনিন্দন খাবার ক্রয়, মৃতের সৎকার, বিবাহ ব্যয় নির্বাহ, দেনা শোধ ও জরুরি সংকট মোকাবেলা করে।’ এর পর টাকা অবশিষ্ট থাকলে হাঁস-মুরগী পালন, শাক-সবজী চাষ, সন্তানকে শিক্ষাদান ও ছোট খাট ব্যবসা করে। একেক জন একেক কাজ করে এবং তাতে অসংখ্য নারী সম্পৃক্ত হয়েছে। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া বেড়েছে। কিন্তু কোনো গরিব মানুষই ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কতিপয় ব্যবসায়ীর মতো ব্যাংকের ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে তা দিয়ে দেশ-বিদেশে ক্যাসিনো খেলেনি, বিদেশে সেকেন্ড হোম গড়ে তোলেনি, বিলাসী জীবনযাপন করেনি, অর্থ পাচার করেনি। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কেউই দেশের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করেনি। শতভাগ ঋণ পরিশোধ করেছে। উপরন্তু তারা দারিদ্র দূর করতে না পারলেও সাংসারিক অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহ করেছে। এই ঋণ না পেলে তারা এসব করতে পারতো না। এসব করতে সর্বশেষ লোটা-বাটি ও বাস্তুভিটা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হতো। সকলেই শহরে ঠাঁই নিত। তবে এ কথা ঠিক, এনজিওদের ক্ষুদ্রঋণের সুদ সর্বাধিক এবং তা আদায়ে কঠোরতা ব্যাপক। কিন্তু ঋণ আদায়ে সাধারণ ব্যাংকও তো ব্যাপক কড়াকড়ি করে আইনগতভাবেই, যার অন্যতম হচ্ছে মামলা, সম্পদ ক্রোক ইত্যাদি। এছাড়া, সুদও অনেক। সুদ ছাড়া একটি ব্যাংকও ঋণ দেয় না এ দেশে। সর্বোপরি এনজিওদের ঋণ গ্রহণ করতে কোনো জামানত লাগে না। জামানত লাগলে গরিব মানুষরা ঋণ গ্রহণ করতে পারতো না। জামানত রাখার মতো তেমন সম্পদ নেই তাদের। তাই তারা এনজিও ছাড়া সাধারণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ করতে পারে না। গরিব মানুষ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ তো দূরে থাক, অভ্যাস বশত অফিসারদের ‘তুমি’ সম্বোধন করলে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় গরিব মানুষদের বিনা জামানতে ব্যাংকের ঋণ পাওয়া স্বপ্নাতীত ব্যাপার!

গত ২৩ নভেম্বর এক দৈনিকে প্রকাশ, ‘তিন বছর আগে বোরো মৌসুমে আগাম বন্যায় কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার ফসল বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরের দুই বছর ফলন ভালো হলেও ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি কৃষক। তাঁরা এলাকার মহাজন, বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে একের পর এক ঋণ নিয়েছেন। সেই ঋণের জাল থেকে বের হতে পারেননি হাওরের কৃষক। ঋণগ্রস্ত কেউ নিজে, কেউ সন্তানকে ঋণদাতা মহাজনের কাছে বন্ধক রেখেছেন।’ এরূপ চিত্র কম-বেশি সারাদেশের কৃষকের। এছাড়া, এ দেশে প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ফসল, বাড়ি ও স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষত থেকে যায় অনেক বছর। যেমন: সিডর ও আইলার আঘাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে ৮-১০ বছর আগে। তার ক্ষত এখনো বহন করে চলেছে সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজন।
যা’হোক, উক্ত প্রতিবেদন মতে, ক্ষুদ্রঋণের মাত্র ১% ঋণ প্রদান করেছে সাধারণ ব্যাংকগুলো। কেন দেশের বিরাট জনগোষ্ঠিকে তাদের মোট ঋণের মাত্র ১% ঋণ প্রদান করা হলো? অধিক হারে ঋণ দেওয়ার মতো কি অর্থ ব্যাংকগুলোর নেই? নিশ্চয় আছে এবং বিপুল পরিমাণে ঋণ তারা দিয়েছেও। সে ঋণ দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের, যার পরিমাণ ৯ লাখ কোটি টাকার অধিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ‘২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। তন্মধ্যে খেলাপি হয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১.৯৯%।’ এর পর গত ৩ মাসে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা খেলাপী হয়েছে। উপরন্তু এর বাইরে অবলোপন/স্বজনপ্রীতি করে রিসিডিউল/মামলা হয়েছে অনেক টাকার। সব মিলে খেলাপীঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার মতো বলে আইএমএফ জানিয়েছে। এ খেলাপির সব আদায় হবে কি-না সন্দেহ রয়েছে। সর্বোপরি এই ঋণের টাকার বেশিরভাগই উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়নি। কীভাবে ব্যয় হয়েছে তা আগেই বলা হয়েছে। উপরন্তু দেশে খুব দ্রæত অতি ধনী সৃষ্টি হয়ে এ ক্ষেত্রে দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আয় বৈষম্য ডেঞ্জার পয়েন্টে উপনীত হয়েছে। বিবিএস’র ২০১৬ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মতে, ‘দেশে সবচেয়ে গরিব প্রায় পৌনে ২০ লাখ পরিবারের তথা ৫% পরিবারের মাসিক গড় আয় মাত্র ৭৪৬ টাকা। আর দেশের সবচেয়ে ধনী ১৯.৬৫ লাখ পরিবারের তথা ৫% পরিবারের মাসিক গড় আয় ৮৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে হতদরিদ্র পরিবারের চেয়ে সবচেয়ে ধনীরা প্রায় ১১৯ গুণ বেশি আয় করে। দেশের মানুষের মোট আয়ের প্রায় ২৮% যায় এই ধনিক শ্রেণির কাছে। আর সবচেয়ে গরিব ৫% পরিবারের আয়ের অংশ মাত্র ০.২৩%।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে ব্যাংকে আমানতকারী কোটিপতির সংখ্যা পৌনে ২ লাখ। আর ১৯৭২ সালে ছিল মাত্র ৫ জন। অর্থাৎ দেশে আয় বৈষম্য ব্যাপক। ২০১০ সালে গিনি সহগ ছিল ০.৪৫৮। ২০১৬ সালে এসে দাঁড়ায় ০.৪৮৩। কিন্তু কোন দেশের গিনি সহগ ০.৫০-এর বেশি হলে সে দেশকে উচ্চ বৈষম্যের দেশ হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশ এর কাছাকাছি গেছে বলে জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে, দৈনিক ১.৯০ মার্কিন ডলারের নিচে আয় হলে দরিদ্র আর ১.২৫ মার্কিন ডলারের নীচে আয় হলে অতি দরিদ্র। ১৯৭৩-৭৪ সালে খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮২.৫%, আর হত দরিদ্রের হার ছিল ৪৮%। অন্য এক তথ্য মতে, ১৯৯১ সালে দারিদ্রের হার ছিল ৪২%। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক-২০১৯ মতে, ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘প্রভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অতি গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি, এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশে ২.৪১ কোটি হত দরিদ্র মানুষ আছে।’ বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক গত অক্টোবরে আরেকটি প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষই দারিদ্র্য ঝুঁকির মধ্যে থাকে।’ বিশ্ব ব্যাংকের অন্য এক তথ্য মতে, ‘বাংলাদেশে ২০০৫-২০১০ সময়ে প্রতিবছর ১.৭% হারে দারিদ্র্য কমেছে, আর ২০১০-২০১৬ সময়ে দারিদ্র বিমোচন হয়েছে বছরে ১.২% হারে।’ কৃষি শুমারি-২০১৯ মতে, দেশে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ৪০.২৪ লাখ। অপরদিকে, সর্বশেষ সরকারি তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩.৮৫ কোটি। এর মধ্যে ১.৫৭ কোটি ‘অতি দরিদ্র’। অপরদিকে, বিবিএস’র হিসাব ধরে প্রতিবছর পরিকল্পনা কমিশন দারিদ্র্যের হারের একটি অনুমিত হিসাব করে থাকে তাতে বলা হয়েছে, ‘২০১৯ সালের জুন মাস শেষে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ১৯.৮ শতাংশে, আর অতি দরিদ্রের হার ৯.৭ শতাংশে নেমেছে।’ অবশ্য বিআইডিএস’র সা¤প্রতিক ‘হোয়াই ইজ পভার্টি সো পারভাসিভ অ্যান্ড ইনক্রিজিং ইন সাম ডিস্ট্রিক্টস ইন বাংলাদেশ’, শীর্ষক গবেষণা রিপোর্ট মতে, কুড়িগ্রাম জেলার ৭০.৮% পরিবার এখনো দরিদ্র। গত ছয় বছরে জেলাটিতে দারিদ্র্য বেড়েছে প্রায় ৭.১০%। জেলার সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের আয় এখানকার মোট আয়ের মাত্র ২%। আবার গত ১০ বছরে আয়ের কোনো পরিবর্তন হয়নি প্রায় ৩৫% পরিবারের। অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছেন জেলার স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলার মোট পরিবারের মধ্যে প্রায় ৩০% নিয়মিতভাবে তিন বেলা খেতে পায় না। আবার মাঝেমধ্যে খাদ্য ঘাটতিতে থাকা পরিবারের হার ৩৯.৩% থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৭%। খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকা পরিবারের সংখ্যা ১৫% থেকে নেমে এসেছে ৯.৩% বলে গত ৭ ডিসেম্বর এক দৈনিক প্রকাশ। এছাড়া, বৃহত্তর বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ এর দারিদ্রের হার এরূপ না হলেও এর প্রায় কাছাকাছি। যা’হোক, সরকারিভাবে দারিদ্রের বর্তমান যে হারের কথা বলা হচ্ছে, তা গড় হিসাব। কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক এর আকাশ-পাতাল তারতম্য আছে। এসব অঞ্চলের লোকদের উন্নতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, কোনো পক্ষ থেকেই। তদ্রæপ শহরের দারিদ্র বিমোচনের জন্য তেমন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অথচ গ্রামের চেয়ে শহরে দারিদ্রের হার বেশি। এই দরিদ্র লোকদের দারিদ্রের কষাঘাত থেকে রক্ষা করতে হবে। নতুবা দেশের প্রকৃত উন্নতি হবে না। মধ্যম আয়ের দেশ ও ধনী দেশ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না। ধনীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এই যা। কিন্তু সেটা হবে ভোমরা কামড় দেওয়ার পর শরীর মোটা হলে যেমন স্বাস্থ্যবান দেখায়, সেরূপ।

বিপুল মানুষকে দারিদ্র রেখে কোনো দেশই প্রকৃত ধনী দেশে পরিণত হতে পারে না। তাই দেশকে দারিদ্রমুক্ত করা আবশ্যক। আর সেটা করতে হবে প্রান্তিক মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক বেষ্টনী বৃদ্ধি করে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যা হবে অতি স্বল্প সুদে ও বিনা জামানতে। এনজিও›গুলো যদি বিনা জামানতে গরীব মানুষকে ঋণ দিয়ে তা আদায় করতে পারে, তাহলে সরকারি ব্যাংকগুলোর তা পারতে হবে। আর এটা হলেই গরীব মানুষ মহাজনী ঋণ ও এনজিওদের চড়া সুদের ঋণ থেকে রক্ষা পাবে। তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। স্মরণীয় যে, ব্যাংকগুলোকে গরিব মানুষকে গতানুগতিকভাবে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ঋণ দিয়েই ক্ষান্ত হলে চলবে না, যে খাতে ঋণ দেওয়া হবে, তার সদ্ব্যবহার হচ্ছে কি-না তথা উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে কি-না তার তদারকি করতে হবে সার্বক্ষণিকভাবে। তাহলে ঋণ অন্য খাতে ব্যয় হতে পারবে না (এরূপ ব্যবস্থা সাধারণ ঋণের ক্ষেত্রেও করা আবশ্যক। তাহলে ঋণ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হতে পারবে না। আদায়ও হবে শতভাগ। ফলে কেউই ঋণ খেলাপী হবে না। দেশের কল্যাণ হবে)। ঋণ উৎপাদনশীল খাতেই ব্যয় করতে হবে। তাহলেই গরিব মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তাদের অভাব দূর হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দেশের উন্নতি হবে।

দারিদ্র্য দূর করার জন্য ‘সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি’ গ্রহণ করা দরকার। এটা করে হাওর অঞ্চলে ব্যাপক সুফল পাওয়া গেছে বলে গত ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। প্রমাণ স্বরূপ উক্ত সেমিনারে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। অপরদিকে, উক্ত সেমিনারে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ‘হাওরাঞ্চলের দারিদ্র্য নির্মূল কোনো একক কর্মসূচি দিয়ে সম্ভব নয়। একক কারো পক্ষেও দারিদ্র্য কমানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করে যেতে হবে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তার এই অভিমত যুক্তিযুক্ত বলে পন্ডিত ব্যক্তিরা অভিমত ব্যক্ত করছেন। কারণ, বিরাট জনগোষ্ঠিকে দারিদ্র্যমুক্ত করে উন্নতির পথে ধাবিত করা কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি যৌথভাবে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তবেই দরিদ্র মানুষের সার্বিক কল্যাণ হবে। দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে। উল্লেখ্য যে, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন মতে, ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১.৫ লাখ কোটি টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার ৮০% এনজিও এবং বাকী অন্যদের মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে। মোট গ্রহীতার সংখ্যা ৪ কোটি, যার ৯১% নারী। ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহক প্রতিবছর বাড়ছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ঋণ

১২ জুন, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন