Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট হলে নৌকা ডুবিয়ে দেবে মুক্তিকামী জনগণ -রিজভী

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১:০২ পিএম
গণতন্ত্রকে বারবার মর্গে পাঠানোই আওয়ামী লীগের রীতি বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, এই বিনাভোটের সরকার জানে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট হলে তাদের নৌকা ডুবিয়ে দেবে মুক্তিকামী জনগণ। রোববার (২৯ ডিসেম্বর) দুপুরে নয়াপল্টনেদলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনেতিনি এসব কথা বলেন।    
২৯ ডিসেম্বর রাতকে ২৫ মার্চ কালো রাতের সাথে তুলনা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ এক কলংকিত ভোটাধিকার হরন ও ভোট ডাকাতির ভয়াল রাত। পৃথিবীর ইতিহাসে অভাবনীয় রেকর্ড সৃষ্টিকারী রাতের ভোটে ক্ষমতা দখলের এক বছর পূর্ণ হবে আজ ২৯ ডিসেম্বর রাতে। আজ রাত তাই দেশবাসীর কাছে তাদের ভোটাধিকার হরণের কালোরাত হিসাবে কলংকিত হয়ে থাকবে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে যেমন নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল হানাদার বাহিনী ঠিক একইভাবে ২০১৮ সালের এই ২৯ ডিসেম্বর কালো রাতে মানুষের ভোটাধিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আওয়ামী হানাদার ও তাদের দোসররা। হত্যা করা হয় গণতন্ত্রকে। ৩০ ডিসেম্বর কোন ভোট হয়নি বাংলাদেশে। তাই এই আওয়ামী লীগকে অনন্তকাল রাতের ভোট ডাকাতির কলংক তিলক বহন করে যেতে হবে, যেমন এখন পর্যন্ত প্রতিটি সচেতন মানুষ তাদেরকে গণতন্ত্র হত্যাকারী ও বাকশালী বলে অভিহিত করে। এরা একদলীয় মুঢ় বিশ্বাসের দ্বারা আচ্ছন্ন। বিএনপির এই নেতা  অতি দ্রুত মিডনাইটের সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে যেন একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করার দাবি জানান।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যখন নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা জনম্যান্ডেটহীন সরকারের তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা যখন একটা চাকুরী রক্ষা করার জন্য নীতি নৈতিকতা এমনকি নিজেদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিসর্জন দেন তখন মানুষের আর হতাশার সীমা থাকেনা। শুরু হয় সামগ্রিক অধ:পতন। শুরু হয় সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।  
তিনি বলেন,  এখন আমরা ঠিক এমনি একটি অধ:পতিত পরিবেশে বসবাস করছি। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে ভোট ডাকাতির নির্বাচন ও মানুষের কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে। এইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরাও এখন দুর্নীতি আর অবৈধ সুযোগ সুবিধা ভোগের লোভে ভোট ডাকাতিতে সহায়তা করে নিজেদের বিবেককে অন্যায়-অনৈতিক আদেশের কাছে বিক্রি করে গণতন্ত্রকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে।  
বিচারের নামে অবিচার চলছে মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সাহেবের পরিণতিতে ভয় পেয়ে এখন সরকারকে খুশি করতেই হচ্ছে বিচার বিভাগকে। আর এ কারণেই জামিন পাচ্ছেন না দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী, গণতন্ত্রের আপোষহীন কন্ঠস্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছের প্রতিফলন-ই ঘটছে এখন আইন-আদালতের সিদ্ধান্তে। ন্যায্যত: তাঁর জামিন পাওয়ার সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। বিনা চিকিৎসায় কারারুদ্ধ রেখে তাঁকে প্রাণে মারার সব রমরমা আয়োজন করছেন অবৈধ প্রধানমন্ত্রী নিজেই। তিনি কি অবস্থায় কেমন আছেন আমাদের জানতে দেয়া হচ্ছে না। যে ভোট ডাকাতি নিশ্চিত করার জন্যই দেশনেত্রীকে বিনা অপরাধে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, সেই মধ্যরাতের ভোট ডাকাতির ষোলকলা পূর্ণ করে ক্ষমতা জবরদখলের এক বছর পূর্ণ হবে আজকের রাতে। আমি সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-দেশনেত্রীর জীবন সংহারের ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের পথ থেকে ফিরে আসুন।
রিজভী বলেন, রাষ্ট্রের আরেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন। গত এক দশকে এই প্রতিষ্ঠানটিকে নির্বাচনী সন্ত্রাসের সিলমোহরে পরিণত করা হয়েছে। পরিণত করা হয়েছে একটি পাপেট, অথর্ব এবং দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠানে। এই প্রতিষ্ঠানটি এখন আর জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার জন্য নয় বরং এটি ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনী হিংসা ও ভোটলুটের বৈধতা দানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা ভোটাধিকার হরণের জন্য শুধুমাত্র দিনের আলোই নয়, রাতের অন্ধকারকেও বেছে নিয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার হরণের জন্য নির্বাচন কমিশন আরেকটি প্রধান অস্ত্র নিয়ে দহরম মহররম শুরু করেছে, সেটি হলো ইভিএম। কারণ এই যন্ত্রটি দ্রুতচারী, দ্রুতই এর মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দেয়া সম্ভব।          
তিনি বলেন, শুধু বিএনপিই নয়, দেশের প্রায় সবগুলো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন, সবাই বলেছে-ইভিএম হচ্ছে ভোট কারচুপির অন্যতম হাতিয়ার। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কানে কথা ঢুকছেনা। গত বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেব বললেন, ‘ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হবে ইভিএম মেশিনে’। ওবায়দুল কাদের সাহেবের বক্তব্যের পরপরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরো তারস্বরে বলে উঠলেন, ইভিএম ব্যবহার করেই তিনি নির্বাচন করবেন। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন কেলেঙ্কারির পর এবার ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও সরকারের ইচ্ছে পূরণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশন। ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে কারসাজি করে সরকারের পক্ষে রায় নেয়ার জন্য জনগণের ইচ্ছের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।  
ইভিএম পরিত্যাক্ত প্রযুক্তি মন্তব্য করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘ইভিএম ২৮ বছরের পুরনো একটি প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে কোনো কোনো দেশে ভোট গ্রহণের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তিবিদদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ইভিএম একটি অস্বচ্ছ ভোটগ্রহণ পদ্ধতি, যা গণতন্ত্র চর্চায় সহায়ক নয়। যেসব দেশে বিভিন্ন সময় পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করে আংশিক ভোট গ্রহণ হয়েছিল পরবর্তীতে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখেও একমাত্র ভারত ছাড়া নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রসহ  সবদেশে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, ইভিএম সহজেই টেম্পার করা যায়। তাই ইভিএম ব্যবহার করে নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য ফলাফল পাওয়া অসম্ভব। কারণ ইভিএম একটি ইলেকট্রনিক ভোটিং পদ্ধতি এবং ইলেকট্রনিক ও ইনফরমেশন টেকনোলজির সব মডিউল বাজারে সহজলভ্য। এইসব মডিউল ব্যবহারের মাধ্যমে ইভিএম টেম্পার করে ভোটার’রা যাকেই ভোট দেবেন সব ভোট নৌকা প্রতীকে নিয়ে আসার মতো অপকৌশল প্রয়োগ অসম্ভব নয়। তাই জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং জনগণের ভোট রক্ষায় ইভিএম কখনোই গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারেনা। যেসব দেশে গণবিরোধী কর্তৃত্ববাদী গণবিমুখ সরকার ক্ষমতাসীন, সেই সরকারগুলিই ইভিএম এর প্রতি আগ্রহী। সুতরাং ইভিএম ব্যবহারে সরকারের মোটিভ সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা সে শঙ্কা প্রকাশ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠ হবে কি না তা নিয়ে ভোটাররা শংকিত। কারণ এখনও পর্যন্ত তাদের কোন ঐকান্তিক উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারা শুধু আপ্তবাক্যের জাবর কেটে যাচ্ছেন। জনগণের ঘাড়ের ওপর দৈত্যের মতো চেপে বসা এই সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনকে যাদুকরের মতো অদৃশ্য করে দিয়েছে। তিনি  নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে বলেন, ইভিএম বাতিল করে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ঢাকা মহানগরী বিএনপি’র নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের ও গ্রেফতার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে ভোটাররা মনে করছেন আরেকটি মিডনাইট ভোটের আয়োজন চলছে। কারণ এই বিনাভোটের সরকার জানে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট হলে তাদের নৌকা ডুবিয়ে দেবে মুক্তিকামী জনগণ।
কর্মসূচিঃ আগামীকাল ৩০ ডিসেম্বর সোমবার এই দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষনা করেছে বিএনপি। ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে দেশব্যাপী বিএনপি সভা-সমাবেশ-মিছিল-কালো ব্যাজ ধারণ এবং দলীয় কার্যালয়গুলোতে কালো পতাকা উত্তোলন করবে। ঢাকায় দিবসটি উপলক্ষে আগামীকাল নয়া পল্টনস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনে অথবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেলা ২টায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।


 

Show all comments
  • সাইফ ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২:০৩ পিএম says : 0
    এক কথায় বলতে পারেন "বিছার যাই হোক তাল গাছ কিন্তু আপনাদের" নৌকার দলও বলবে অনুরূপ কথা তবে আসল কথা হল কার কথা সত্য সেটাই, সেটাই বড় কথা।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রিজভী


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ