Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ২৩ জানুয়ারী ২০২০, ০৯ মাঘ ১৪২৬, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কাম্য নয়

| প্রকাশের সময় : ১৫ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম | আপডেট : ১২:০৬ এএম, ১৫ জানুয়ারি, ২০২০

আবারো দেশের বিভিন্ন স্থানে চোর সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের মাঝামাঝিতে এ ধরনের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। ছেলেধরা সন্দেহে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরপরাধ মানুষকে নির্মম গণপিটুনির শিকার হতে দেখা গেছে। রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা গুজব তুলে এক স্কুলে শিশু সন্তানের মাকে গণপিটুনিতে হত্যার করার মতো নির্মম ঘটনাও ঘটেছে। ছেলেধরা গুজব ও সন্দেহজনক কারণে গণপিটুনি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা, প্রশাসনের সক্রিয় উদ্যোগ ও জনসচেতনতার কারণে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গতকাল ইনকিলাবে এ ধরনের অন্তত দুইটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে যশোরের অভয় নগরে গরুচোর সন্দেহে গণপিটুনিতে তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। গরু চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামের মানুষ ঘেরাও দিয়ে আটক করার পর তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে না দিয়ে নিজেরাই পিটিয়ে হত্যা করে। আরেক রিপোর্টে গাইবান্ধা সুন্দরগঞ্জে গরু চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বাড়ি থেকে তুলে এনে হাত পা বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতনের তথ্য জানা যায়। নির্যাতনের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তা জনমানসে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং মামলা হয়।

সন্দেহজনক কারণে তো নয়ই, যে কোনো মাত্রার অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে হাতে নাতে ধরা পড়ার পরও কাউকে গণপিটুনিতে হত্যা বা নির্যাতন করা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা বর্বরতা এবং আইনের প্রতি অবমাননা ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের অনাচার চলতে পারে না। সমাজে চোর-ডাকাত, ছেলে ধরা, মানব পাচারকারি, গরুচোর, মোবাইলফোন চোরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে সন্দেহের বশে নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার মতো ঘটনা নিকৃষ্ট অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য। এ ধরনের অপরাধীদের কোনো অবস্থায়ই ছাড় দেওয়া যায় না। একইভাবে ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে হত্যাকাÐও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি অপরাধের আইনসম্মত স্বীকারোক্তি ও উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কার্যকর পদক্ষেপ সাপেক্ষে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা পথচারী জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যেমন আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ, একইভাবে বিচারহীনভাবে কাউকে ক্রসফায়ারে হত্যার ঘটনাও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

গুজব রটনা, সন্দেহজনক কারণে গণপিটুনিসহ সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার পেছনে নানাবিধ সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান। অর্থনৈতিক লুটপাট, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। রাজনৈতিক কারণে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্যের দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতার কারণে গুরুতর অপরাধীরাও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি এক ধরনের অনাস্থা থেকে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়। তবে একটি অপরাধ দিয়ে আরেকটি অপরাধের সমাধান হতে পারে না। কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুরা ব্যাপক হারে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পেছনে যেসব রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রবণতা কাজ করছে সে সম্পর্কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রূপগঞ্জে শিক্ষার্থী ধর্ষণের দায়ে ইতোমধ্যে এক ছাত্রলীগ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হলেই কেবল এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব। গুজবে কান দিয়ে অথবা সন্দেহজনক কারণে গণপিটুনির মতো ঘটনা বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদার সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আইনের শাসন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই কেবল সাধারণ জনগণের আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা ও অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আইন


আরও
আরও পড়ুন