Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৭ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

প্রশাসন জাগবে আর কত আবরারকে হারালে

ছাত্র নির্যাতনের বিচার দাবিতে উত্তাল ঢাবি

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:২৫ এএম

বিচারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার এক শিক্ষার্থী টানা ২২ ঘন্টা অবস্থান করে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে শিবির সন্দেহে ৪ শিক্ষাথীকে রাতভর নির্যাতন করে ছাত্রলীগের নেতারা। পরে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। বুধবার বিকেল ৫ টার দিকে শাহবাগ থানা থেকে ছাড়া পেয়ে বিচার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাষ্কর্যের নিচে অবস্থান শুরু করে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মুকিম হোসেন। বৃহস্পতিবার তার অবস্থার অবণতি হলে বিকেল ৪টার দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার সাথে সংহতি জানিয়ে নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা গতকাল কর্মসূচি পালন করেন।

এদিকে ৪ শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের প্রতিবাদে প্রক্টরের পদত্যাগসহ ৪ দফা দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১২টি প্রগতিশীল সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সন্ত্রাস বিরোধী ছাত্র ঐক্য। এসময় ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ছাত্রলীগই সরকারের গদি ছাড়ার কারণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। নুর বলেন, নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়, ডাকসুতে হামলা হয়েছে, বুয়েটে হামলা হয়েছে। এসব করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে ছাত্রলীগ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে গণসচেতনতা তৈরি হয়েছে তা আপনারা দাবায়ে রাখতে পারবেন না। যদি ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন তাহলে ছাত্রলীগ আপনাদের গদি ছাড়ার কারন হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ১২টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সন্ত্রাস বিরোধী ছাত্র ঐক্যের বিক্ষোভ মিছিল পরবর্তী সমাবেশে নূর এসব কথা বলেন। বিক্ষোভ মিছিলটি রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট প্রদক্ষিণ করে অপরাজেয় বাংলায় এসে শেষ হয়। এতে আরও অংশ নেন ডাকসুর সমাজ সেবা সম্পাদক আখতার হোসেন, সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি সভাপতি আবু রায়হান, ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় নেতা সাদ্দাম হোসেন সোহেল, চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি মুকুল চাকমাসহ আর অনেকে। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে চার দফা দাবি জানায় সন্ত্রাস বিরোধী ছাত্র ঐক্য। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে, প্রক্টরের অপসারণ, ডাকসুতে হামলায় জড়িতদের স্থায়ী বহিস্কার, হলে বৈধ সিট প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা।

এর আগে বটতলায় বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ৩৫ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্র সমাবেশে অংশ নিয়ে ছাত্রত্ব শেষ হবার পরেও যারা হলে থাকে তারাই বিভিন্ন অপকর্ম করে বেড়ায় দাবি করেন ডাকসু ভিপি। তিনি বলেন, প্রথম বর্ষ থেকে বৈধ সিট দিতে হবে। হল থেকে অছাত্র, বহিরাগতদের বিতাড়িত করতে হবে। কালকের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের ছাত্রত্ব নেই। তাদের যদি আগেই হল থেকে বের করা যেত তাহলে এ ঘটনা ঘটত না।

হলগুলোতে নির্যাতন ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের মদদ রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, প্রমাণ থাকার পরও বিচার না করার মধ্যদিয়ে তা প্রকাশ পায়। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো অন্যায় করলে প্রশাসন নিরব থাকে, জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ নির্যাতনের পরও প্রশাসন বলে কিছু হয়নি ‘সামান্য হৈচৈ’ হয়েছে। ডাকসু এবং বিভিন্ন হলগুলোতে যে হামলা সংগঠিত হচ্ছে সেটি ভিন্নমত দমনের জন্য পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগ ঘটাচ্ছে। আমরা প্রশাসনের কাছে বলতে চাই অনেক হয়েছে এবার আপনাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করুন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। না হলে ছাত্রসমাজ আপনাদের ছাড়বে না।

ছাত্র ফেডারেশনের সমাবেশে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর সামিনা লুৎফা, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি রাহাত আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল আলম, সাবেক সদস্য জাহিদ রায়হান, তাহরাত লিওন, সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হাসান ও শ্রমিক নেতা বাচ্চু মিয়াসহ আরো অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

মুকিমের বন্ধুদের ৪ দাবি: শিবির সন্দেহে নির্যাতনের শিকার মুকিমের পাশে দাঁড়িয়ে ৪ দফা জানিয়েছে তার বিভাগ ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার সাড়ে ১১টায় সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাষ্কর্যে বিচারের দাবিতে অবস্থান করা মুকিমের সাথে সংহতি জানিয়ে মানববন্ধন করেন তারা। এসময় বিভাগটির প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ৪ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এসব দাবিতে রোববার ভিসির কাছে স্মারকলিপি দেবেন তারা।

দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কবিতা প্রশাসনের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, আবরারের মত আর কত শিক্ষার্থীকে আমরা হারালে প্রশাসনের বিবেক জাগ্রত হবে। কেন প্রশাসন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। প্রশাসনের কাছে এ নির্যাতনের বিচার চাই। নাহলে আমরা ধরে নেব প্রশাসনের হস্তক্ষেপেই এ ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, মুকিম শিবির করে নাকি অন্য কোনো দল করে সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। তাকে মারার অধিকার কারো নেই। সে যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে সেটার বিচারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আছে।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে, নির্যাতনকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, মত প্রকাশ স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও রাজনৈতিক মতের প্রতিফলন ঘটানো যাবে এমন নিরাপদ ক্যাম্পাস, হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সিট বাণিজ্য বন্ধ করে প্রথম বর্ষ থেকেই সিট বরাদ্দ দেয়।
অবস্থানরত নির্যতিত শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি: বিচারের দাবিতে অবস্থানরত নির্যাতিত শিক্ষার্থীর অবস্থার অবণতি হলে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। বিকেল তিনটার দিকে তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় সেখানে তার ভাই মুহসীন, ডাকসু ভিপি নূরসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এরআগে বুধবার বিকেল ৫টা থেকে নির্যাতনের বিচার দাবিতে রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান শুরু করেন ওই শিক্ষার্থী। টানা ২২ ঘন্টা অবস্থানে শারীরিক দুর্বলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সিএনজিতে উঠানোর সময় মুকিমকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে দেখা যায়।
৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি: এদিকে ছাত্র নির্যাতনের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হল প্রশাসন। হল প্রভোস্ট আবু মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, মঙ্গলবার রাতের ছাত্রলীগের হাতে চার ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে হলের আবাসিক শিক্ষক ড. মো. জাহিদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ঢাবি

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ