Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬, ১৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও ঈদ উৎসব

প্রকাশের সময় : ২ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ড. এম এ সবুর
ঈদ মুবারক! বছর শেষে আনন্দ-খুশির বার্তা নিয়ে আবারো ঈদ এসেছে। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানরা ঈদের আনন্দ-উৎসব করেন। এ আনন্দ ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয় বরং সামাজিক। আর ঈদের উৎসবও সার্বজনীন। তাই ঈদের আনন্দ-উৎসবে সব মুসলিমের অধিকার আছে। ধর্মীয় বিধানে মুসলিম সমাজের সবাইকে এ আনন্দে অংশীদার করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এ জন্যই ইসলামে ‘সাদকাতুল ফিতর’ অপরিহার্য করা হয়েছে। যাতে ঈদ উৎসবে ধনীদের পাশাপাশি গরিব-অভাবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। এমনিভাবে দেশ জাতি পেরিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এক সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করেন। তবে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ফিলিস্তিনে ইহুদীদের বর্বরোচিত হত্যাকা-, মিয়ানমারের মুসলিম হত্যাকা-, স্বাধীনতাকামী কাশ্মীর-ঝিনজিয়াং-মিন্দানাওয়ার মুসলিম নির্যাতন মুসলিম বিশ্বের ঈদ আনন্দকে বেদনাবিধুর করেছে।
‘ঈদ’ উৎসবের সূচনা হয়েছে হিজরি দ্বিতীয় সন অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে। জাহেলিয়া যুগে আরবের মক্কায় ‘উকায মেলা’ এবং মদিনায় ‘নীরোজ’ ও ‘মিহিরগান’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অশ্লীল আনন্দ-উল্লাস করা হতো। মদিনায় আগমনের পর মহানবী সা. মুসলমানদের জন্য এসব ক্ষতিকর ও অশ্লীলতামুক্ত স্বতন্ত্র আনন্দ-উৎসবের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এ জন্য তিনি মুসলমানদের নির্মল আনন্দ উৎসব করতে বছরে দুটি ঈদ উৎসবের প্রবর্তন করেন। একটি ‘ঈদুল ফিতর’ বা রোজার ঈদ অন্যটি ‘ঈদুল আযহা’ বা কুরবানির ঈদ। রমজান মাসের দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর সাওয়াল মাসের পয়লা তারিখে উদযাপন করা হয় ঈদুল ফিতর এবং যিলহাজ্ব মাসের দশ তারিখে পালন করা হয় ঈদুল আযহা। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমানদের ধৈর্য-ত্যাগ ও নৈতিক-আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধিত হয়। এতে তাদের মনে এক স্বর্গীয় সুখ-আনন্দ বিরাজ করে। এ মহান সুখানভূতি উৎসবে রূপ লাভ করে পবিত্র ঈদুল ফিতরে।
ঈদ মানে উৎসব, ঈদ মানেই আনন্দ। এ আনন্দ-উৎসব উপভোগের জন্য প্রিয়জনের সান্নিধ্য সবারই কাম্য। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের অনেক মানুষ শহরে বাস করেন জীবিকার সন্ধানে। আর তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের বেশিরভাগ বসবাস করেন গ্রামে। তাই ঈদ-পূজা ও অন্যান্য উৎসবের সময় তারা গ্রামে ফিরে যান নাড়ির টানে। বাড়ি না ফিরলে তাদের অধিকাংশ পরিবারের ঈদ উদযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে তারা গ্রামে ফিরেন। এছাড়া অপেক্ষাকৃত বেশি দিনের ছুটি থাকায় অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন ঈদের সময়। এ কারণে স্বভাবতই ঈদের সময় লোকজনের যাতায়াত বেশি হয়। ফলে প্রতি বছর ট্রেন-লঞ্চে আসন না পাওয়া, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, সড়ক-মহাসড়কে যানজট-দুুর্ঘটনা ও পরিবহনগুলোতে বেশি ভাড়া আদায় ও সিডিউল বিপর্যয়সহ বিভিন্ন সমস্যায় ঘরমুখো যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তবে প্রতি বছরই অবস্থার উন্নতির আশ্বাস দেয়া হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি নয় বরং দুর্ভোগের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যায়। এসব দুর্ভোগ সত্ত্বেও অসংখ্য মানুষ ঈদের আনন্দ উৎসব উদযাপন করতে প্রিয়জনের সান্নিধ্যের জন্য গ্রামে যান।
দুর্ভোগ আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের বেশিরভাগ মানুষ যখন গ্রামে ছুটে যান নাড়ির টানে। তখন বিত্তবান কিছুসংখ্যক মানুষ ঈদের আনন্দ করতে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে। ধনী-দরিদ্রের এ বৈষম্য ঈদ উৎসবের ঐক্য-ভাতৃত্ববোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঈদের উৎসব উদযাপনের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উৎসব ভাতা পেলেও দিনমুজুর, কৃষক, রিকশাচালকসহ নি¤œ আয়ের অনেক মানুষ এসব ভাতা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অধিকন্তু অন্যান্য পেশার লোকজন কয়েক দিন ঈদের ছুটি ভোগ করতে পারলেও কৃষক-দিনমুজুরদের কাজ করতে হয় উৎসবের দিনেও। এদিকে ঈদের আগে বেতন-বোনাস না পাওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক শ্রমিক-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের ঈদ উৎসবকে ম্লান করে। এছাড়া বেতন-ভাতা না পাওয়া (নন-এমপিও) শিক্ষক এবং বেকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের ঈদ উৎসবের আনন্দ উপভোগ অপূর্ণ থাকে। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার কারাগারে বন্দি এবং নিপীড়িত নেতাকর্মীদের পরিবারের ঈদ কাটে নিরানন্দে। এছাড়া হত্যা-খুন-গুম হওয়া পরিবারে ঈদ আনন্দের পরিবর্তে বেদনা নিয়ে আসে। প্রিয়জনদের অনুপস্থিতিতে ঈদের আনন্দ-উল্লাসে তাদের কষ্টের মাত্রা আরো বাড়ে। অধিকন্তু ঈদ পূর্বাপর দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় নিহত-আহতদের পরিবারে ঈদের আনন্দের পরিবর্তে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। আর ঈদকেন্দ্রিক চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানি, প্রতারণা-জালিয়াতির ভুক্তভোগীদের ঈদ কাটে চরম দুঃখে।
ঈদের খুশির দিনেও অনেক অসহায়-দরিদ্র মানুষের দিন কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। এছাড়া অনেক পথশিশু কাগজ কুড়িয়ে আর বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করে ঈদের দিন পার করে। ঈদের আনন্দ-খুশি তাদের নাগালের বাইরে থাকে। নতুন জামা-কাপড় পরা, বিনোদন কিংবা আনন্দে মেতে ওঠা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারা চিড়িয়াখানা-শিশুপার্কসহ বিভিন্ন শিশুবিনোদন কেন্দ্রে যায় আনন্দ উপভোগের জন্য নয় বরং নিজেদের বাঁচার তাগিদে, জীবিকার সন্ধানে। অবশ্য বিত্তশালীদের দয়া-অনুগ্রহে কিছুসংখ্যক দরিদ্র মানুষ নতুন পোশাক পরে ও উন্নতমানের খাবার খেয়ে ঈদের উৎসব পালন করে। এতে ধনীর পাশাপাশি কিছুসংখ্যক দরিদ্রের ঘরেও ঈদের আনন্দ প্রবাহিত হয়ে থাকে।
ভাতৃত্ববোধ ও জাতীয় ঐক্য গড়া ঈদের প্রধান শিক্ষা। পুরনো দিনের হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সাম্যের উৎসবে মুসলমানরা পরস্পরে আবদ্ধ হয় ভালোবাসার বন্ধনে। জাতীয় ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভাতৃত্ববোধ সুসংহত হয় ঈদের পবিত্র উৎসবে। কিন্তু এর ভিন্নতা লক্ষ করা যায় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও আচরণে। সৌহার্দ্যরে এ পবিত্র উৎসবের দিনেও তারা রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক আচরণ করেন। জাতীয় ঐক্যের বদলে তাদের কণ্ঠে অনৈক্যের সুর ধ্বনিত হয়ে থাকে! সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা জাতিকে আরো হতাশ করছে। রাজনৈতিক এ দুরাবস্থার কারণে পবিত্র ঈদের জাতীয় ঐক্য চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধŸগতি, সর্বস্তরের দুর্নীতি, রাস্তাঘাটের বেহালদশা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের কারণে এমনিতেই সাধারণ মানুষের ঈদের আনন্দ সীমিত হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক অনৈক্যের কর্মসূচি ঈদের আনন্দকে আরো ম্লান করে দিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে ঈদ মুসলিম সমাজের প্রধান আনন্দ-উৎসব। এতে নিহিত আছে পুণ্য। আর এ উৎসবের মূলে রয়েছে সামাজিক ঐক্য। তবে নানা অব্যবস্থাপনার কারণে ঈদ পূর্বাপর জনদুর্ভোগের কারণে বেশিরভাগ মানুষ উৎকণ্ঠিত। তবু দেশবাসী ঈদের আনন্দ-উৎসবে ধর্মীয় পুণ্য ও জাতীয় ঐক্য অর্জনে আশান্বিত এবং সামাজিক সাম্য-সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
লেখক : শিক্ষক ও আহ্বায়ক, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব নন-গভর্নমেন্ট টিচার্স (ড্যাঙ্গট)
ফসধংড়নঁৎ০৯@মসধরষ.পড়স



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন