Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ জামাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনায় যা থাকছে

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৯ জানুয়ারি, ২০২০, ৫:২৮ পিএম

বহুল প্রতীক্ষিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যেখানে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের অবিচ্ছেদ্য রাজধানী রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে হোয়াইট হাউসে মিস্টার ট্রাম্প বলেন, তার প্রস্তাব ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘শেষ সুযোগ হতে পারে।’

ট্রাম্প একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরও প্রস্তাব করেছেন এবং পশ্চিম তীরের ইহুদী বসতির উপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। এই প্রস্তাবকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে নাকচ করেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস।

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের সমাধান করার লক্ষ্যে এই পরিকপনা তৈরির দায়িত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এর আগে মঙ্গলবার গাজা উপত্যকায় বিক্ষোভ করে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি, সেসময় পশ্চিম তীরে সেনা মোতায়েন জোরদার করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এই যৌথ ঘোষণা এমন এক সময় আসলো যখন ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু উভয়ই নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। মার্কিন সিনেটে অভিশংসনের বিচারের মুখে রয়েছেন মিস্টার ট্রাম্প এবং অন্যদিকে মঙ্গলবার নেতানিয়াহুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি চেয়ে করা প্রস্তাব বাতিল হয়েছে। দুজনই কোন ধরণের অপরাধ করার কথা অস্বীকার করেছেন।

ইসরায়েলে থাকা মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান বলেন, এই ঘোষণার সময়টা কোন রাজনৈতিক ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট করে নির্ধারণ করা হয়নি, এটা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তৈরি করাই ছিল। এরমধ্যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয় যে নেতানিয়াহু দখলকৃত পশ্চিম তীরের ৩০% ইসরায়েলের সাথে যুক্ত করার কথা ভাবছেন, এ বিষয়ে রোববার মন্ত্রীসভার ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। পশ্চিম তীরের বসতিতে চার লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বাস করছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ, যদিও ইসরায়েলের এনিয়ে দ্বিমত রয়েছে। ফ্রিডম্যান বলেন, পশ্চিম তীরের অংশ যুক্ত করা নিয়ে ইসরায়েলকে মোটেই অপেক্ষা করতে হবে না।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ ইসরায়েল শান্তির পক্ষে বড় ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। আমার দূরদৃষ্টি বলছে, এটা উভয় পক্ষের জন্যই একটি জয়ের সুযোগ। এটি একটি বাস্তবসম্মত দ্বি-রাষ্ট্রের সমাধান।’ তার প্রস্তাবগুলো হলো-

যুক্তরাষ্ট্র সেই সেসব এলাকার উপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেবে যা ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরায়েলের অংশ। এই পরিকল্পনায় একটি আনুমানিক মানচিত্রের কথা বলা হয়েছে যাতে ট্রাম্পের মতে, ইসরায়েল স্বেচ্ছায় কিছু ভূমি ছেড়ে দিতে চাইছে সীমানা নির্ধারণের সুবিধার জন্য।

এই মানচিত্রটি ‘ফিলিস্তিনি ভূমির আয়তন দ্বিগুন করবে এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি রাজধানী করার সুযোগ তৈরি করবে,’ যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটি দূতাবাস গড়বে বলে জানান ট্রাম্প। ফিলিস্তিনের দ্য প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন-পিএলও বলে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের তাদের উল্লেখিত ‘ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের’ ১৫% এর উপর নিয়ন্ত্রণ দেবে মাত্র।

জেরুজালেম ‘ইসরায়েলের অবিচ্ছেদ্য রাজধানী থাকবে’। পবিত্র এই শহরকে নিজেদের বলে দাবি করে থাকে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনি উভয়ই। ফিলিস্তিনিদের দাবি অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুসালেমের যে অংশ দখল করে নিয়েছে তা তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী।

ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের সুযোগ’ বলেছেন- কিন্তু তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। ‘কোন ফিলিস্তিনি বা ইসরায়েলিকেই তাদের বাড়ি থেকে উৎখাত করা হবে না’- এটা থেকে বোঝা যায় যে, ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি থাকবে।

ইসরায়েল জর্ডানের বাদশাহর সাথে কাজ করবে এটা নিশ্চিত করতে যে, জেরুজালেমে ইহুদীদের পবিত্র অঞ্চল টেম্পল মাউন্ট এবং মুসলিমদের আল-হারাম আল শরিফ যাতে সংরক্ষিত থাকে। এই অঞ্চলটি পরিচালনায় গঠিত ট্রাস্টটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে জর্ডান।

মিস্টার ট্রাম্পের প্রস্তাবিত মানচিত্রে ফিলিস্তিনের জন্য যে ভূমি বরাদ্দ করা হয়েছে তা ‘চার বছরের জন্য উন্মুক্ত’ থাকবে এবং এতে কোন ধরণের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে না। এই সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনিরা চুক্তি সম্পর্কে পড়াশোনা করে, ইসরায়েলের সাথে সমঝোতা করবে এবং ‘রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মানদণ্ড অর্জন করবে।’

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুধবার এই পরিকল্পনা নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আলোচনা করতে মস্কোতে যাবেন নেতানিয়াহু।

জাতিসংঘ বলেছে যে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগে যখন ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও গাজা দখল করে নেয় সে অঞ্চলে সীমান্ত রেখা স্থাপনের মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রের সমাধানে অটল থাকবে তারা। মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র বলেন, জাতিসংঘ এমন একটি শান্তি চুক্তি চায় যা জাতিসংঘের প্রস্তাবনা, আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্মতির ভিত্তিতে হবে।

ইসরায়েলের মানবাধিকার গোষ্ঠী বি’সালেম বলে, এই প্রস্তাবটি এক ধরণের জাতি-বিদ্বেষ তৈরি করবে। তারা জানায়, ফিলিস্তিনিদের পরিণত করা হবে ‘ক্ষুদ্র, বেষ্টিত, বিচ্ছিন্ন ছিটমহলে, যাদের নিজেদের জীবনের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।’ ইসরায়েলের পিস নাউ সংস্থা বলে, এই পরিকল্পনা ‘বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন এবং আকর্ষণীয়।’

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব ফিলিস্তিনিদের আহ্বান জানিয়েছেন এই পরিকল্পনাটি নিয়ে ‘আসল এবং ন্যায্যভাবে বিবেচনা করতে এবং এর মাধ্যমে সমঝোতা আলোচনায় ফিরে যাওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে কিনা তা বিবেচনা করতে।’ এ বিষয়ে আগামী শনিবার একটি জরুরী বৈঠক ডেকেছে আরব লীগ।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যেকোনো সংঘাতের চেয়ে ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বন্দ্ব সবচেয়ে একগুঁয়ে। যদিও ১৯৯৩ সালে দুই পক্ষ একটি শান্তি চুক্তিতে সই করেছিল, তারপরেও ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে দুই পক্ষ একে অপর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। সূত্র: বিবিসি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: যুক্তরাষ্ট্র


আরও
আরও পড়ুন