Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই

| প্রকাশের সময় : ৩১ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম

আগামীকাল ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। বিগত প্রায় পক্ষকালব্যাপী মেয়র প্রার্থী ও কাউন্সিলরদের প্রচার-প্রচারণায় রাজধানী ছিল মুখর। মিছিল-মিটিং, জনসংযোগ, ব্যানার-ফ্যাস্টুন, প্রার্থীদের ভোট চেয়ে লাউড স্পিকার ও মাইকে গান-বাজনা থেকে শুরু করে প্রতিশ্রæতির বন্যা বয়ে গেছে। এখন ভোটের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষা। নির্বাচনে দেশের প্রধান দুই প্রতিদ্ব›দ্বী দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতা যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে হবে, তা সকলেরই জানা। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রেও এই দুই দলের তৎপরতা বেশি চোখে পড়েছে। প্রচারণাকালে দুই দলের মাঝে বাগযুদ্ধ থেকে শুরু করে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, হামলা-মামলা, গ্রেফতার থেকে শুরু করে কিছু সহিংস ঘটনাও ঘটেছে। নির্বাচন নিয়ে দুই দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দও বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। বিএনপির তরফ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ এবং নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। দলটির নেতারা বলেছেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। প্রচারণাকালে ব্যাপক হারে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা পরিলক্ষিত হয়নি। অভিযোগ দেয়া হলেও দেখব-দেখছি বলে বক্তব্য দিয়ে দায় সেরেছে। নির্বাচনী মাঠে নির্বাচন কমিশন আছে কিনা, তা টেরই পাওয়া যায়নি। উপরন্তু কমিশন থেকে বলা হয়েছে, দুই সিটি করপোরেশনের শতকরা ৬৫ ভাগ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই যদি সিংহভাগ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়, তবে সুষ্ঠু ভোট হওয়া নিয়ে ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা থাকা স্বাভাবিক।

নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ নিয়ে প্রধান বিরোধী দল থেকে শুরু করে বিশ্লেষকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা ও প্রবল আপত্তি থাকলেও নির্বাচন কমিশন এ প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণে বদ্ধপরিকর। বিরোধী দলের কোনো আপত্তি ও অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি। ফলে প্রথমবারের মতো দেশের কোনো নির্বাচনে ব্যালটের পরিবর্তে পুরোপুরি মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ হতে যাচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে আংশিকভাবে ইভিএমে ভোট গ্রহণ হলেও তার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ার সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে খুব একটা ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে এ প্রক্রিয়ার বিষয়টি পুরোপুরিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এর মাধ্যমে কীভাবে ভোট কারচুপি করা হয়েছে, তার চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এ আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। ইভিএমে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কমিশনের অনড় অবস্থানের পেছনে এই মেশিন কেনার ক্ষেত্রে তার বাণিজ্যের বিষয়টিকে পর্যবেক্ষকরা বড় করে দেখছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব মেশিন কেনাকাটার ক্ষেত্রে বেশুমার বাণিজ্য হয়েছে। ফলে ভোটে ইভিএমকে জায়েজ করার জন্য সব অভিযোগ-আপত্তি উপেক্ষা করে কমিশন অনড় অবস্থান নিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ-আপত্তি তখনই অসারে পরিণত হবে, যখন বাস্তবিকই এর মাধ্যমে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। যদি চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনের মতোই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে, তাহলে ইভিএমের বিষয়টি বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য হয়েই থাকবে এবং জনগণের অর্থে এসব মেশিন কেনার বিষয়টি অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে। এর জবাব নির্বাচন কমিশনকেই দিতে হবে। এখন দেখার বিষয়, ইভিএমের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে কমিশন কেমন নির্বাচন করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনগণের মধ্যে এক ধরনের অনাস্থা ও অনীহা রয়েছে। জবরদস্তিমূলকভাবে ভোট কেন্দ্র দখল, আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে না পারাসহ প্রশাসনের অনৈতিক সহযোগিতায় ভোট হয়ে যাওয়ার ঘটনা জনগণের মধ্যে সার্বিক ভোটব্যবস্থার প্রতি চরম অনাগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তাদের এ অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন, তৎপরবর্তী বছরগুলোতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে। এসব নির্বাচন এতটাই অস্বচ্ছ ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে হয়েছে যে, ভোটারদের মধ্যে ভোট দেয়ার আগ্রহই হারিয়ে গেছে। এখন ভোট এলেই সবার মনে এ কথার উদ্ভব হয়, ‘ভোট দিয়ে কী হবে। ভোট আগেই হয়ে যায়।’ এবারের সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও ভোটারদের মধ্যে এমন ধারণা বিরাজমান। দেখা যাচ্ছে, প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা যতই সরব, ভোটাররা ততই নীরব। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে আগ্রহ-উৎসাহ তেমন নেই। ভোটারদের এই অনীহা সৃষ্টির মূল দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তালেও এ নিয়ে তার কোনো বিচলন নেই। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানের মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশন যে এ দায়িত্ব পালন করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, তা সকলেরই জানা। তার দায়িত্ব হয়ে পড়েছে নির্বাচন এলে শুধু সিডিউল ঘোষণা করা। নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার তার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।

সিটি নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে তা নির্বাচনের দিনের সার্বিক পরিবেশ ও ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা যদি সামাল না দেয়া যায়, তবে ভোটের ফলাফলে তার প্রভাব পড়ার পাশাপাশি সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে। ইতোমধ্যে অস্ত্রবাজ ও সন্ত্রাসীদের নির্বাচনে সরব হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও সতর্ক থাকা এবং নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। এটা তাদের স্বার্থেই করা প্রয়োজন। কারণ, তার সম্পর্কেও মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। এ ধারণার পরিবর্তন করতে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের স্বচ্ছতার সাথে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তুলে ধরা আবশ্যক। ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ ভোট দিতে যেতে পারে এবং ভোট শেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। যে নির্বাচন কমিশন মানুষের আস্থা হারিয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে তাকেই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে হবে। অতীতের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনও যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তার দায় তাদেরই নিতে হবে। আমরা আশা করব, ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সিটি করপোরেশন নির্বাচন

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন