Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, ১২ শাবান ১৪৪১ হিজরী

উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বিএসএফ মূর্তিমান আতঙ্ক

কৃষক-জেলে যেতে পারছেন না নিজ কাজে

রেজাউল করিম রাজু | প্রকাশের সময় : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ৫:০৯ পিএম

রাজশাহীতে পদ্মা নদী হতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে পাঁচ জেলে অপহরণের প্রতিবাদে কেউ দাঁড়িয়েছিলেন ছেলের মুক্তির দাবিতে, কেউ শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে হাজির হন স্বামীকে ফিরে পেতে। তাদের অভিযোগ, বিএসএফ অবৈধভাবে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে পদ্মা নদী হতে ধরে নিয়ে গেছে পাঁচ জেলেকে। এরপর তাদের ভারতীয় পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে অনুপ্রবেশের মিথ্যে অভিযোগে। অপহৃতের পরিবার পরিজনরা স্বজনদের মুক্তির দাবিতে রাস্তায় মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিএসএফ’র হাতে অপহরণের শিকার রাজন আলীর মা ফাইমা বেগম, শাহিন আলীর স্ত্রী ও মানববন্ধন চলাকালে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এসময় শাহিনের স্ত্রী বীথি খাতুন তাদের ৮ মাসের শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই মানববন্ধনে। স্বামীর কথা জানতে চাইলে অঝরো কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, তার বাবা মারা যাওয়ায় পরিবারের একমাত্র আয়-রোজগার করতেন শাহিন। প্রতিদিনের মতো শাহিন বাড়ির পাশেই পদ্মা নদীতে মাছ ধরছিলেন। এসময় স্পীড বোটে করে কয়েকজন বিএসএফ সদস্য বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে ধরে নিয়ে যায়। শাহিন এখন কী অবস্থায় আছেন-তাও জানা নেই। এক কাপড়েই ছিল। প্রচÐ শীতে তারা কেমন আছে তা জানিনা। বীথির মতোই আড়াই বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে মানববন্ধনে হাজির ছিলেন বিএসএফের হাতে অপহৃত কাবিল হোসেনের স্ত্রী সমিরা খাতুন। তিনি স্বামীকে ফেরত চেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলে বাবা বাবা কই, বাবা কবে আসবে-এমন মিনতি করে সারাক্ষণ কান্না করে। আমার স্বামী সংসার চালাতে ঋণ করে রেখেছে। মাছ ধরার পর তা বিক্রি করে সেই ঋণের টাকার কিস্তি পরিশোধ করি। কিন্তু পদ্মা নদীতে মাছ ধরার সময় বিএসএফ তাকেও ধরে গেছে ভারতে। এখন আমি অসহায় হয়ে দিন পার করছি। দ্রুত আমার স্বামীর মুক্তি চাই।

বিএসএফের হাতে আটক শফিকুল ইসলামের মা আরজেমা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে মাছ মারতে গেছিল পদ্মায়। কিন্তু বাংলাদেশের ভেতর থেকেই ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। বিএসএফ ধরে নিয়ে গিয়ে আমার ছেলে নির্যাতন করেছে। তাকে মারধর করা হয়েছে। বিনাদোষে কেন আমার ছেলেকে বিএসএফ ধরে নিয়ে গেল তার বিচার চাই’।

এমন আর্তনাদ শুধু রাজশাহী সীমান্তে নয়। এ আর্তনাদ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত জুড়ে। বাংলাদেশের সীমানায় অবৈধভাবে হুটহাট ঢুকে পরছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ। যখন তখন ধরে নিয়ে যাচ্ছে ক্ষেতে কর্মরত বাংলাদেশী কৃষক, গবাদি পশু, চড়ানো রাখাল, আর নদীতে মাছ ধরা জেলেদের। গুলি করে মারছে লাশ নিয়ে গিয়ে ফেলে রাখছে, আহতদের উপর চালাচ্ছে নির্যাতন। এরপর অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে। বিনা দোষে সাজা ভোগের পর ঠেলে দেয়া হচ্ছে ্এপারে। আর বাংলাদেশী স্বজনরা উৎকন্ঠা নিয়ে প্রহর গুনছে।

ঘটনা ঘটার পরপর বাংলাদেশের বডার গার্ড (বিজিবি) এর পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকে বসার আহবান জানিয়ে বিষয়গুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হলেও বিএসএফ এর পক্ষে থেকে আন্তরিক সাড়া মেলে না। পতাকা বৈঠকে সময় নিয়ে চলে টালবাহানা। আবার বৈঠক হলেও বিজিবিকে ফিরতে হচ্ছে শুন্য হাতে। বিজিবি এর কম্পানী পর্যায় থেকে ব্যাটালিয়ন পর্যরÍ বৈঠক হচ্ছে ঘটানার জন্য দুঃখ প্রকাশ, আর বিষয়গুলোর পুনরাবৃত্তি না হওয়ার আশ্বাস দিলেও তা মানা হচ্ছে না। খুব কম দিনেই আছে যেখানে সীমান্তে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে না।

অবস্থা এমন দাড়িয়েছে রাজশাহীর পদ্মা নদীতে জেলেরা মাছ ধরতে ভয় পাচ্ছে। কৃষক সীমান্তবর্তী জমীতে চাষবাস করতে যাচ্ছে ভয়ে ভয়ে। সবসময় আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে এই বুঝি বিএসএফ এলো। তাদের কাছে বিএসএফ এক মূর্তীমান আতঙ্কের নাম।

সীমান্তের এক দেড় কিলোমিটার ভিতরে এসে নদীর চরকে তাদের অংশ বলে দাবি করছে। কোথাও কোথাও ছাপড়া তুলে ক্যাম্প বানাতেও দেখা যায়। বিজিবির কড়া প্রতিবাদেও মুখে পরে তারা সরিয়েও নেয়। বিএসএফ’এর যেন কাজ হয়ে দাড়িয়েছে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাঁনো।

গত ৩১শে জানুয়ারী বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে মাছ ধরার সময় বাংলাদেশের পাঁচ জেলেকে ধরে নিয়ে যায়। প্রত্যাশা ছিল পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাদের ফেরত দেয়া হবে। পতাকা বৈঠকে বিএসএফ দুঃখ প্রকাশ করলেও ধরে নিয়ে য্ওায়া বাংলাদেশী জেলেদের ফেরত না দিয়ে ভারতীয় পুলিশের হাতে দিয়ে কারাগারে পাঠায়। বিষয়টা এখন আদালতের।

এপারের স্বজনরা বুঝে উঠতে পারছেন না এখন তারা কী করবেন। তাদের অবস্থা নূন আনতে পন্তা ফফুরানোর মতো । যেখানে পেটের ভাত জুটে না তারা কিভারেব ভারতে গিয়ে স্বজনদের আইনী সহায়তা দিয়ে ফিরিয়ে আনবে। এখন পর্যন্ত তাদের পাশে দাড়ায়নি কোন আইনী কিংবা মানবাধিকার সংগঠন। অনেক সংগঠন রয়েছে যারা চুন থেকে পান খসলে রাস্তায় নেমে পরেন সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানান। কিন্তু তারা ভারতীয় বিএসএফ এর নির্যাতনের বিরুদ্ধে একেবারেই চুপ। এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা পোষ মানার মতো। ভাসুরের নাম যেন মুখে নিতে মানা।

রাজশাহীর গহমাবনা গ্রামবাসীর পাশে কেউ না দাড়ালেও গ্রামের শতশত নারী পুরুষ রাস্তায় দাড়িয়ে মানববন্ধন করেছে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএসএফ এর জুলুম নির্যাতনের। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দাবি জানিয়েছে তাদের নিরাপত্তা আর ধরে নিয়ে যাওয়াদের মুক্তির।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভয়ে জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে নামছে না। আর মাছ না ধরা মানেই অনাহার অর্ধহার। মৎসজীবী সমিতির নেতা আবু তাহের বলেন, বিএসএফ পদ্মা নদীর বাংলাদেশের সীমানায় যখন তখন ঢুকে গিয়ে আমাদের জেলেদের হেনস্তা করছে। ধরে নিয়ে যাচ্ছে। একারণে আতঙ্কে জেলেরা পদ্মায় নামতে পারছে না। মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা দ্রæত এ সমস্যার সমাধান চাই।

হরিপুর ইউনিয়নের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান, বজলে রেজভী আল হাসান মঞ্জিল বলেন, হুটহাট করেই বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে চলে আসে। মানুষজনকে ধরে নিয়ে যায়। মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকে। এর অবসান হওয়া দরকার। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায় থেকে সমাধান হতে হবে। বিএসএফ এর কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ ছাড়াও বিজিবির সদস্যরা ত্যাক্ত বিরক্ত।

বিজিবির রাজশাহী-১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল জিয়া উদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিএসএফ এর কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আমরা সতর্ক রয়েছি এবং সম্মানজনকভাবেই নিষ্পত্তির প্রচেষ্টা চালাই। বিএসএফ এর অনুপ্রবেশের বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। এ নিয়ে বিজিবি এবং বিএসএফ এর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হবে।

সচেতন মহল বলছেন, ভারত থেকে ব্যাপক হারে অস্ত্র, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দ্রব্য ও মালামাল পাচারের সময় তা বিএসএফ এর চোঁখে পড়ে না। তাদের বিরুদ্ধে গুলি করে মারাতো দুরে থাক তাদের ধরাও হয় না। যে গরু আসে তা বিএসএফ এর সাথে সমোঝোতা করেই। বনি বনা না হলে রাখালকে গুলি করে মারা হয়। যত অত্যাচার বাংলাদেশী কৃষক, জেলেদের উপর। সীমান্তে অত্যাচার বন্ধে সকল দেশ প্রেমীককে সোচ্চার হতে হবে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিএসএফ

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ