Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

তামাক ছেড়ে তরমুজে ঝুঁকছেন কৃষক

এস এম আলী আহসান পান্না, কুষ্টিয়া থেকে | প্রকাশের সময় : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম

কুষ্টিয়ায় তামাক ছেড়ে তরমুজসহ বিভিন্ন সবজীর আবাদের দিকে ঝুঁকেছেন কৃষকরা। কুষ্টিয়ায় যেসব জমিতে তামাকের আবাদ দেখা গেছে, সেসব জমিতে আজ নেই তামাকের অস্তিত্ব। তামাকের পরিবর্তে মাটির বুক চিরে উঁকি দিচ্ছে রসালো তরমুজের চারা। এক সময় আখের দখলে থাকা জমির দখল নেয় তামাক। আজ সেই জমিতে তরমুজসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ।
তবে এ বছর তামাক চাষ থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন কৃষক। বিগত দিনে তামাক চাষের কারণ হিসেবে কোম্পানির প্রলোভন ও কৃষকদের অসচেতনতাকে দায়ী করছেন। এলাকায় একেবারেই নতুন হলেও তরজুম চাষে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছেন কৃষকরা। কৃষকরা বলছেন যেকোনো আবাদ করেই তামাককে নীল চাষের মতো বিতাড়িত করার পরিকল্পনা করছেন তারা।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ ইউনিয়নের স্বরূপদহ এলাকার কৃষক জমির আলী জানান, কয়েক বছর ধরে তামাক চাষ করে আসছিলেন তিনি। গত বছর চাষ করেছিলেন কয়েক বিঘা জমিতে তামাক। তবে এবছর কোনো তামাক চাষ করেননি।
তাদের অভিযোগ তামাকে মূলত লাভ হয় না। নিজে কাজ করতে পারলে এক সঙ্গে কিছু টাকা পাওয়া যায়। তবে শ্রমিক নিলে কিছুই পাওয়া যায় না। পরিবারের সবাই মিলে পরিশ্রম করা লাগে। বাড়িতে রোগ-জীবাণুর উপদ্রব বেশি হয়। তামাক কোম্পানি আমাদের সার, বীজ, কীটনাশক ও পরামর্শ দিয়ে তামাক চাষে উৎসাহী করেছিলো। কিন্তু কোম্পানি সেই তামাক আর কিনেনি। তাই এ বছর রাগ করে আর তামাক লাগাইনি।
তামাকের পরিবর্তে মিরপুরের মাঠে আবাদ হচ্ছে তরমুজের। এখন তরমুজের চারার যতœ নিচ্ছেন কৃষকরা। এছাড়াও জমিতে বেগুন ও ফুলকপির চাষ হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের পুরাতন আজমপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, যেসব জমিতে গতবছর তামাক চাষ হয়েছিলো, সেসব জমিতে এখন তরমুজের চারা।
কৃষক বাবলু বলেন, আমি তামাকের একজন পাক্কা চাষি। গত বছরও আমার ৫ বিঘা জমিতে তামাক ছিলো। শিলা বৃষ্টির কারণে আমার সব শেষ। প্রায় প্রতিবছরই শিলা বৃষ্টিতে ক্ষতি হয় আমাদের। কিন্তু তামাকের চাষ করি বলে কেউ কোনো সহায়তা করে না। তামাকের ক্ষতি হলে তামাক কোম্পানিরাও মুখ ফিরিয়ে নেই। তাই এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি তামাক করবো না। তামাকের পরিবর্তে এবছর তরমুজ চাষ করেছি। দেখি শুনেছি ভালো লাভ হয় তরমুজে। দেখি কি হয়। শিল পড়ে তো আর তামাকের মতো নষ্ট হওয়ার নেই। আরেকজন কৃষক হোসেন আলী বলেন, গতবছর শিলে আমার অনেক ক্ষতি হয়েছি। ঋণ নিয়ে তামাক করি, কিন্তু কোম্পানিও আর পাশে থাকে না। তাই এ বছর তরমুজ চাষ করছি। আর তরমুজের জমিতে আমরা অনান্য সবজিও করতে পারছি।
সরেজমিনে মাঠের মাঝেই দেখা যায় আলেয়া নামে এক কৃষাণী প্লাস্টিকের ঘটি/বদনা হাতে নিয়ে তরমুজের গাছের গোড়ায় গোড়ায় পানি দিচ্ছেন।
তারা বলেন, গত বছর দুই বিঘা জমিতে তামাক করেছিলাম। সেখান থেকেই ঘটি সেচ দেয়ার অভ্যাস রয়েছে। তবে শিলে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবছর আর তামাক করিনি। এবছর নিজের ১০ কাঠায় পাশের জমির মালিকের দেখা দেখি তরমুজ লাগিয়েছি। তবে তরমুজে ঘটি দিয়ে সেচ দিলে ভালো হয়। তাই ঘটি দিয়ে সেচ দিচ্ছি।
এবছর ওই এলাকার সবচেয়ে বড় তরমুজ চাষি নিয়ামত আলী লালু। বিগত বছর তিনি ছিলেন তামাক চাষি এবং তামাক ব্যবসায়ী। এলাকার কৃষকদের মাঝেও রয়েছে তার প্রভাব। তারা তামাক ছেড়ে সবজীর আবাদ করছে।
এবছর মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের সদরপুর, আজমপুর, কাকিলাদহ, মল্লিকপাড়াসহ বেশ কিছু এলাকায় তামাকের পরিবর্তে তারা তরমুজ চাষ করেছেন।
চাষি নিয়াত আলী লালু বলেন, আমরা মূলত এই অঞ্চলে আখের চাষ করতাম। আখ নিয়ে সুগারমিলের অনিয়ম আর হয়রানি কারণে আমরা আখ চাষ বন্ধ করে দিয়েছি। সেই সুযোগটা কাজে লাগায় তামাক কোম্পানিগুলো। তারা আমাদের বীজ, সার, কীটনাশক, পরামর্শ, চাষের জন্য লোনসহ নানা প্রলোভন দেখায়। আর কৃষকরা তামাকে ঝুঁকে পড়ে।
তিনি বলেন, আমরা কোম্পানির প্রলোভনে পড়ে তামাক চাষ শুরু করি। কিন্তু আমাদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে কোম্পানিগুলো। তামাক কেনার ক্ষেত্রে কার্ড চালু রয়েছে। আমরা কোম্পানির বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই কার্ড কেটে যাবে এই ভয় থাকতাম আমরা।
এলাকার চাষীদের ক্ষেতে বেড়ে উঠছে তরমুজের চারা। তিনি বলেন, আমরা তরমুজের জমিতে সাথী ফসল হিসেবে ফুলকপি, পেঁয়াজ, টমেটো করেছি। এবছর আমি এক দাগেই ১৫ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে তরমুজের চাষ করেছি। আমার দেখা দেখি আমাদের এলাকার কৃষকরা প্রায় ৫০-৬০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। যেগুলো বিগত দিনে তামাক চাষ হতো।
তিনি বলেন, বিঘা প্রতি তরমুজে প্রায় ১৮-২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বিঘাতে প্রায় আশা করছি, আমরা তরমুজ চাষ করে বেশ লাভবান হবো। কারণ বাজারে তরমুজের দাম অনেক ভালো গেছে এবার। তবে তরমুজের বীজের সহজপ্রাপ্যতা হলে কৃষকরা আরো আগ্রহী হবে।
মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, উপজেলার কৃষকরা এক সময় তামাক চাষের দিকে বেশি ঝুঁকতো। কিন্তু বর্তমানে কৃষি অফিসের পরামর্শে এবং তামাক চাষের কুফল সম্পকে সচেতনতা বাড়ানোর কারণে অনেকটাই তামাক চাষ থেকে বেরিয়ে আসছে। তামাকের বিকল্প ফসল চাষাবাদে ঝুঁকছেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কৃষক

২৬ নভেম্বর, ২০২০
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন