Inqilab Logo

ঢাকা, রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৮ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

তিস্তা এখন আধমরা

বাড়তি ব্যয় ৬৫ কোটি টাকা ৪৬ হাজার হেক্টর জমি সেচ-সুবিধা বঞ্চিত

লালমনিরহাট থেকে মো. আইয়ুব আলী বসুনীয়া : | প্রকাশের সময় : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

চলতি বোরো মৌসুমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে পর্যাপ্ত পানি নেই তিস্তা নদীতে। তিস্তা নদী এখন আধমরা। নদীর পানি কমতে শুরু করার সাথে সাথে দেশি প্রজাতির মাছ, জেলে, নৌকা, নদীপারের চাষাবাদসহ মানুষের উপর প্রভাব পড়েছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প এলাকার ৪৬ হাজার হেক্টর জমি সেচ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব জমিতে বোরো ধান চাষ করতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিতে বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার বেশি।

ডালিয়া সেচ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পানি সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ হাজার হেক্টরে। এরপরও ৪৩ হাজার হেক্টর জমি সেচ-সুবিধার বাইরে ছিল। ২০১৪ সালে বোরো মৌসুমে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু সেচ দেয়া হয় মাত্র ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সেচ দেয়া হয় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০১৭ সালে মাত্র ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিলে কৃষকদের হেক্টর প্রতি বাড়তি খরচ হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে ৪৩ হাজার হেক্টরে কৃষকদের বাড়তি খরচ পড়বে ৬৫ কোটি টাকার বেশি।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী জানান, চলতি রবি মৌসুমে ২৫ জানুয়ারি থেকে সেচ দেয়া শুরু হয়। শুরুতে সেচ দেয়া হয় জলঢাকা উপজেলায়। পরবর্তীতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সেচ দেয়ার চেষ্টা করা হবে। উজানে পানি প্রবাহ দিন দিন কমায় তিস্তা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজের কমান্ড এলাকায় সম্পূরক সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এবার এসব এলাকায় কৃষকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিতে হবে।

জানা গেছে, তিস্তা অববাহিকার ৫ হাজার ৪২৭টি গ্রামের মানুষ জীবিকার জন্য এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। তাই তিস্তায় পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এখানকার মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। তিস্তা অববাহিকার ৮ হাজার ৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল। সমতল ভূমিতে তিস্তা অববাহিকা ৪ হাজার ১০৮ বর্গকিলোমিটার। তার প্রায় অর্ধেক অংশ পড়েছে বাংলাদেশের সীমানায়। দুই দেশই তিস্তার পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে নদীর ওপর ও আশপাশে ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করেছে। ভারত জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচ কার্যক্রমের জন্য তিস্তার পানি ব্যবহার করছে।

সূত্র জানায়, ভারত ৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমির সেচের চাহিদা মিটিয়ে যে পরিমাণ পানি ছাড়ে, তা দিয়ে বোরো মৌসুমে আমাদের সেচ চাহিদার অর্ধেকও পূরণ হয় না। ১৯৯৭ সালে বাংলদেশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি প্রবাহ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কিউসেক। তা ২০০৬ সালে নেমে আসে ১ হাজার ৩৪৮ কিউসেকে। ২০১৯ সালে পানি প্রবাহ ছিল মাত্র ৭০০ কিউসেক। আমন মৌসুমে মোট সেচযোগ্য ৭৯ হাজার ৩৭৯ হেক্টর এলাকার প্রায় পুরোটাই সেচের আওতায় আনা সম্ভব হলেও বোরোর ক্ষেত্রে পানির দু®প্রাপ্যতায় সেচ-সাফল্যের চিত্র একেবারেই হতাশাজনক। শুকনো মৌসুমে ভারতের পানি প্রত্যাহারের পর তিস্তা নদীতে যে সামান্য পানি পাওয়া যায়, তার সবটুকুই সেচ চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের সেচ খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজের পর থেকে ৯৭ কিলোমিটার বিস্তৃত তিস্তা নদীতে পানিও থাকছে না। এ কারণে তিস্তা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশের এই বিশাল পরিমাণ নদীগর্ভ পরিণত হচ্ছে বালুচরে। তিস্তা ব্যারাজ এলাকার পর শুকনো মৌসুমে এভাবেই নদী আধমরা হয়ে যাচ্ছে।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী জানান, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সেচ প্রকল্পের জন্য ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। কিন্তু সেচের জন্য পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ কিউসেক। গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে সেচ দেয়া হয়েছিল।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: তিস্তা

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
৮ জানুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ