Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬, ০৮ শাবান ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

‘ব্যক্তি-গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি দেশের ব্যাংক খাত’

সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম

কিছু ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীর হাতে দেশের ব্যাংক খাত জিম্মি বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। একটা আতঙ্ক, ভয়ংকর, ভঙ্গুর পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছি। খেলাপি ঋণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। আর লুকিয়ে আছে মূলধন ঘাটতি, নিরাপত্তা সঞ্চিতির মতো আরও অনেক সূচক। এর ফলে মানুষের ব্যাংকে টাকা রাখার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সুদহার নিয়েও সমস্যা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা দিচ্ছে, তার বরখেলাপ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইনে ব্যাংক কমিশন গঠন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, আমরা দেখছি গুটিকয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে এখন পুরো ব্যাংক খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি যখন ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করছিল, সে রকম একটি পরিস্থিতিতে ২০১২ সালে হল-মার্কের কেলেঙ্কারি উদঘাটিত হয়, তখন থেকে আমরা ব্যাংকিং কমিশনের বিষয়ে বলে আসছি। এখন যেহেতু এটা কিছুটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে আমরা অত্যন্ত প্রিত, খুশি এবং সম্পূর্ণ সাফল্য কামনা করছি। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ব্যাংক খাত নিয়ে একটি কমিশন গঠিত হচ্ছে। ‘প্রস্তাবিত ব্যাংকিং কমিশন’ এর চেয়ারম্যান দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে করায় সরকারের ব্যাংক কমিশন গঠনের উদ্যোগকে সমর্থন ও সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি।

‘প্রস্তাবিত ব্যাংকিং কমিশন, সিপিডি’র প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে এই রূপরেখা তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি কমিশন গঠনের বিষয়ে রূপরেখা দেয় সিপিডি। এতে ব্যাংকিং কমিশনের কার্যপিরিধি এবং সম্ভাব্য সুপারিশ ও তার বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে গবেষণা সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করছে না। ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বস্থতার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণে ব্যাংক কমিশন করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ কমিশনের সফলতার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের আলোকিত সমর্থন থাকতে হবে। তা না হলে ব্যাংক খাতের কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ ব্যাংক কমিশন গঠন করতে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে আশীর্বাদ ও সম্মতি এসেছে। এ জন্য আমরা খুবই উচ্ছ্বসিত। আমরা মনে করি, এটা অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। এ কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে, তথ্যনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে কাজ করতে পারে; তার জন্য তাদের পরিবেশ, ক্ষমতা ও সুযোগ দিতে হবে। কমিশনকে জরুরি বিষয়ে দ্রুত সমাধানের জন্য অন্তর্বতীকালীন প্রতিবেদন দিতে হবে। এগুলো আগামী বাজেটের আগেই দিতে হবে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সমস্যা এক সময় রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যায় উপনীত হয়েছিল। রাজনৈতিক অর্থনীতি সমস্যা এখন রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে রাজনৈতিক সমর্থন বাদ দিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ যে সীমিত তা প্রমাণ পায় নতুন ব্যাংক দেয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন ব্যাংক হবে না, তারপরও নতুন তিনটি ব্যাংক হয়েছে।
ব্যাংকিং কমিশন নিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকিং কমিশন গঠন বিষয়ে যে আলাপ আলোচনা হচ্ছে তার বিস্তারিত আমরা এখনো জানি না। গত আট বছর ধরে আমরা ব্যাংকিং কমিশন নিয়ে কথা বলে আসছি। কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য, কার্যপরিধি, কার্যপ্রণালী এবং সুপারিশ কি হতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের কিছু ধারণা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রথমত কমিশনের কার্যপরিধি সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত ব্যাংকিং খাতের সঠিক তথ্য পাওয়া এবং পরিসংখ্যানের প্রাপ্ততা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান মূল সমস্যাগুলোর কারণ কি এবং সামনের দিনে চ্যালেঞ্জগুলো কি হতে পারে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার জন্য কারা এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী দায়ী তা চিহ্নিত করতে হবে। পঞ্চমত, স্বল্প এবং মধ্যমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট থেকে প্রশাসনিক ও আইনগত কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তার সুপারিশ তৈরি করা। তিনি বলেন, একটি সাময়িক কমিশন হিসেবে এর সময় নির্ধারিত থাকতে হবে। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কাজগুলো শেষ করতে হবে।’

ব্যাংকিং কমিশনের কার্যপরিধির তথ্য তুলে ধরে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘আগামী জুনে বাজেট আসছে। বাজেটের পর পরই যাতে কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কী পদ্ধতিতে কমিশন কাজ করবে, তার একটি অন্তবর্তীমূলক পদক্ষেপ দরকার। সে জন্য ব্যক্তিখাতের কয়েকজন বড় বড় ব্যবসায়ী বা নীতি নির্ধারকের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করে সবার সঙ্গে বসে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোক্তা, সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ছোট বড় সঞ্চয়কারী, বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নারী, যুবক এবং ঢাকার বাইরের জনগণ। অর্থাৎ যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল তাদের সবাইকে আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসা উচিত।’ তিনি বলেন, ব্যাংকিং কমিশনের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। বিভিন্ন সময়েই কমিটি, কমিশন ও তদন্ত কমিশন গঠন হয়ে থাকে। সেগুলোর সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকে না। এ কারণে এই কমিশন গঠন হলে তাকে পূর্ণ স্বচ্ছ হতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, কমিশনের সদস্যদের দক্ষতা, যোগ্যতা এবং সততাই হবে একমাত্র যোগ্যতা। যাতে তারা নির্মোহভাবে প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে পারেন। কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। এ ছাড়া, সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন, অর্থ্যাৎ কমিশন যে সুপারিশ দেবে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। কমিশন গঠনের সময়ই স্পষ্টভাবে দিক নির্দেশনা দিয়ে একটি রোডম্যাপ দিতে হবে। একই সঙ্গে সুপারিশগুলো কবে থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে তারও একটা ঘোষণা থাকতে হবে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কমিশনকে সমস্যার গভীরে যেতে হবে। আমরা দেখতে চাই কমিশনে কাদের ডাকা হবে, তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ক্ষমতা দেয়া হবে। ব্যাংক খাতের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের সমস্যা আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দিচ্ছি। এই যে গভীরতর যেসব সমস্যা তার সমাধান যদি করতে না পারে তাহলে তা কাজে আসবে না। এ জন্য সরকারের আলোকিত সমর্থনের পাশাপাশি আলোকিত স্বার্থপরতাও থাকতে হবে, তা না হলে অর্জনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।#



 

Show all comments
  • Kismat Hashar ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১:১০ এএম says : 0
    .......... যা হবার হয়ে গেছে। ব‍্যাঙ্ক কমিশন গঠন হচ্ছে " সুসংবাদ কিন্তু যেন ঐ ঠুঁটো জনন্মাথ না হয়। আমাদের তো আবার ঐ সিঁদুরে মেঘে ভয় বেশী।
    Total Reply(0) Reply
  • Jamil Hosen Jon ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১:১০ এএম says : 0
    শুধু ব্যাংক নয়...পুরো দেশ আজ কিছু মানুষের হাতে জিম্মি...এ জন্য এ জাতিকে চরম মুল্য দিতে হবে।।
    Total Reply(0) Reply
  • সত্য বলবো ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১:১১ এএম says : 0
    শুধু জিম্মি নয় তারা লুটেপুটে খাচ্ছে। আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করুক।
    Total Reply(0) Reply
  • কে এম শাকীর ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১:১২ এএম says : 0
    ওই ব্যক্তি গোষ্ঠীর নাম বললে ভালো হতো।
    Total Reply(0) Reply
  • রিদওয়ান বিবেক ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১:১২ এএম says : 0
    দেশের ব্যাংক খাতকে মুক্ত করা হোক
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সিপিডি

২২ জানুয়ারি, ২০২০
১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন