Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭, ১০ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা সিএএ’র উদ্দেশ্য দাঙ্গা বাধানো

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০৪ এএম

দিল্লীতে যে সহিংসতা হচ্ছে, সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের (সিএএ) উদ্দেশ্য ছিল সেটাই – ভারতজুড়ে নাগরিকদের ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করে ফেলা। তবে এটা মাত্র শুরু। রাজনৈতিক জুয়াড়ি নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটি তাদের চ‚ড়ান্ত চাল চালছে এবং নাগরিকদের মধ্যে স্থায়ীভাবে মেরুকরণ করে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সৃষ্টি করা ছাড়াও আরও উদ্দেশ্য রয়েছে সিএএ’র। সা¤প্রদায়িক সহিংসতার পর্দার আড়ালে অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি এজেন্ডা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভোটারদের তালিকা পর্যালোচনা করে নির্বাচনী এলাকা ভিত্তিক তথ্য সাজানো, যাতে তিন শতাধিক আসনে ৩০% ভোট পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়।
তাছাড়া, সিএএ’র আরেকটি উদ্দেশ্য হলো সমাজ কল্যাণ কর্মসূচি থেকে কারা উপকার পাবে, সেটি চিহ্নিত করা। এটা শুধু মুসলিমদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা নয়, যদিও পরিকল্পনার সেটিও একটা অংশ। বরং এখানে সেই সব হিন্দুদেরও মুছে দেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে যারা বিজেপিকে ভোট দেয়নি।

মনে হচ্ছে বিজেপি বিকল্প সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরিতে আগ্রহী, যেটার মাধ্যমে ভোটার আর কল্যাণ কর্মসূচিকে একত্র করা হবে। এমনকি এখনই সরকারের জনকল্যাণ নীতির সাথে দল যুক্ত হয়ে গেছে। উত্তরের বহু জায়গায় যারাই বিজেপির জনকল্যাণ নীতির কোন সুবিধা পেয়েছে – সেটা স্বচ্ছ ভারত অভিযানের অধীনে টয়লেট সামগ্রী হোক বা উজালা কর্মসূচির অধীনে গ্যাস সিলিন্ডার হোক - তাদের কাছে আশা করা হচ্ছে যে, তারা গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে গ্রামের আরও অন্তন্তত দশজনকে বিষয়টা জানাবে, যাতে আরও বেশি মানুষকে দলে ভেড়ানো যায়।

অমিত শাহ দলের দায়িত্ব নেয়ার পর প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেউ যদি হিসেব কষে চিন্তাভাবনা করে দেখেন, তাহলে মনে হবে যে, সিএএ’র উদ্দেশ্য হলো যারা বিজেপির ভোট ব্যাংক নয়, তাদেরকে বা তাদের একটা অংশকে এর মাধ্যমে বাদ দিয়ে দেয়া। তেলেঙ্গানার সা¤প্রতিক অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে ৮ লাখের বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয় এবং সেখানে কোন কারণ দেখানো হয়নি। সেখানে কোন বিশ্লেষণও নেই যে এটা নির্বাচনের ফলাফলের উপর কতটা প্রভাব ফেলেছে – তা সেটা যদি সামান্য কিছু নির্বাচনী এলাকাতেও হয়।

দিল্লীতে যে সহিংসতা হচ্ছে, সেটা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বিজেপির নির্বাচনী পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। অবশ্য মনে হচ্ছে এই সহিংসতার বিষয়টি আগে থেকেই পরিকল্পনায় ছিল এবং দিল্লী অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে বিজেপি জিতলেও এটা করা হতো।

দিল্লী রাজ্য হিসেবে ছোট এবং জাতীয় রাজধানী হওয়ায় জাতীয় সংবাদে বড় জায়গা জুড়ে থাকে। মনে হচ্ছে, সামাজিক নিরীক্ষা চালানোর জন্য এটাকে আদর্শ জায়গা মনে করেছে বিজেপি।

তাছাড়া, এই সহিংসতায় অপপ্রচার আর আতঙ্কের মধ্যে বিকল্প পন্থার একটা পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে। দিল্লী নির্যাতনে যেহেতু অপপ্রচার করে কোন ফল পাওয়া যায়নি, সেখানে সহিংসতার বিষয়টিকে বিকল্প হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে।

বেশ কিছুকাল ধরেই আমি বলে আসছি যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে শুধুমাত্র ধর্মীয় বয়ান বা সেক্যুলারিজম বনাম সাম্প্রদায়িকতার বয়ান দিয়ে লড়াই করা যাবে না। জনকল্যাণের ধারণাটি অনেক বেশি সম্ভাবনাময় অস্ত্র। সমাজ কল্যাণের রাজনীতি নাগরিকদের নিরাপত্তার অনুঊতি দিতে, তাদের উদ্বেগ কমাতে অনেক বেশি কার্যকরী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের রাজনীতি প্রতিহত করতেও বেশি সক্ষম।

দিল্লীর নাগরিকরা তাদের ভোটের মাধ্যমে অপপ্রচারের জবাব দিয়েছে। সঙ্ঘবদ্ধ সহিংসতার মাধ্যমে আতঙ্ক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে উপায়গুলো কি? বর্তমান অস্থিরতা সম্পর্ক বেশির ভাগ হিন্দুরা কি ভাবছে, সেটা জানার উপায় কি? এর অন্তসারশ‚ণ্যতাটা কি তারা দেখতে পাচ্ছে? শুধু মুসলিমদের দুর্দশা নয়, তারা কি নিজেদের দুর্ভোগটা দেখতে পাচ্ছে এর মধ্যে? মুসলিমদের কিভাবে টার্গেট করা হচ্ছে? যারা সহিংসতায় জড়াচ্ছে তাদের থেকে নিজেদেরকে কি তারা আলাদা ভাবছে? অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে এগুলোরও উত্তর খুঁজছে বিজেপি।

হিন্দুদের বেশির ভাগ মানুষ এই সহিংসতার পেছনের পরিকল্পনাটা ধরতে পারছে কি না – সেটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো এই পরিকল্পনা বুঝতে পারার পরও মুসলিমদেরকে টার্গেট করার বিষয়ে তাদের সম্মতি রয়েছে কি না। আগুন দেয়া, লুটপাট আর মুসলিমদের হত্যার মাধ্যমে গুজরাটের ‘পুরনো কৌশলকে’ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দিল্লীর জনসংখ্যার বড় অংশ হলো অভিবাসী এবং এখানে কোন বিশেষ গোষ্ঠির প্রভাবাধীন এলাকা নেই। সম্পদ ধ্বংস করা হলে সেটা সেই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না, যেটা গুজরাটে হয়েছিল। মুসলিমরা যদি এখানে ‘বহিরাগত’ হয়ে থাকে, তাহলে এক অর্থে বহু হিন্দুও এখানে বহিরাগত।

বহিরাগতের যুক্তিটা অন্যভাবে প্রকাশিত হতে পারে এখানে। সে কারণেই শাহিন বাগের বিরুদ্ধে যখন সহিংসতার ডাক দেয়া হয়, তখন বেশির ভাগ হিন্দুই এতে সাড়া দেয়নি। সিএএ’র উদ্দেশ্যই হলো ২০২৪ সাল পর্যন্ত অস্থিরতা তৈরি করে যাওয়া। এটা একটা অন্য ধরনের সামাজিক প্রকৌশলবিদ্যা, যেটা আগে আমরা দেখিনি। কিন্তু এটা একই সাথে আরও বহু বিষয় থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখার কৌশল, যেগুলো হয়তো সবার অগোচরে বাস্তবায়িত হয়ে যাবে। সূত্র : দি ওয়্যার।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সিএএ


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ