Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

তাঁর চোখে দেখেছি বাংলাদেশ

অয়েজুল হক | প্রকাশের সময় : ১৭ মার্চ, ২০২০, ১২:০২ এএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়। একটি ইতিহাস। এই বাংলাদেশে দল মত নির্বিশেষে তিনি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক প্রস্ফুটিত গোলাপ। প্রজ্জ্বলিত এক নক্ষত্র। কবিতার মতো বললে এমন বলা যায়,
তাঁর বুকে ছিল এক সাগর ভালোবাসা
অশ্রু ঝরছিল স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে
যে মানচিত্র ছিল বুকের গভীরে আঁকা।
স্বাধীনতার পর পাক-হানাদার বাহিনীর বন্দিশালা থেকে ফিরে তিনি প্রথম যে দিন স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলা, মাটি ও মানুষ, রক্ত ও লাশের স্তূপ দেখে নিজেকে সংবরণ করতে পারেননি। কেঁদেছিলেন। দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। ১টা ৪১ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আসা বিমান তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রিয় নেতাকে বরণ করতে আসা মানুষের মুখে মুখে প্রতিধ্বনিত হয় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান। আকাশ বাতাসে সে শব্দ সুরের সাথে যেন বলে, আমৃত্যু বাংলার মানুষেকে প্রাণ ভরে ভালোবাসা মানুষটি যে এসে গেছে। বঙ্গবন্ধু বিমান থেকে নামলে তাকে ফুল আর অশ্রু দিয়ে বরণ করেন তাজউদ্দীন আহমেদ। বঙ্গবন্ধু তাকে বুকে চেপে ধরেন। উভয় নেতাই কাঁদতে থাকেন শিশুর মতো। আপন সন্তানের জন্য ছুটে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান। শেখ লুৎফর রহমান এমন একজন পিতা, যিনি তার সন্তানকে আদর্শিক শিক্ষায় শিক্ষিত খাঁটি দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি এমন একজন আদর্শ পিতা, ন্যায়ের পক্ষে থেকে অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়াতে সব সময় আপন সন্তানকে সমর্থন দিয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন। ছেলে বার বার নির্যাতিত হয়েছে, জেলে গিয়েছে কিন্তু পিতা বড় মুখ করে বলেছেন, আমার ছেলে ন্যায়ের জন্য লড়াই করে জেলে গেছে। পিতা এমন না হলে কী সন্তান গণমানুষের মহানায়ক হতে পারেন? না, পারেন না।
উপস্থিত জনতার ঢলে ভেসে যাচ্ছিল বিমানবন্দর। সেখান থেকে মানুষ আর মানুষ পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু আসলেন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। দু’হাতে বাঙালি জাতির এই মাহনায়ককে বারবার চোখ মুছতে দেখা যায়। শুধু কী তিনি কেঁদেছেন? বঙ্গবন্ধুর কান্নায় কেঁদেছে উপস্থিত লাখ লাখ মানুষ। তারপর দরদ ভরা দরাজ গলায় বললেন,
‘আমি আপনাদের কাছে দু-একটি কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারবো না।’
এসময় বঙ্গবন্ধুর গলা বারবার আড়ষ্ট হয়ে আসছিল। ধানমন্ডির একটা বাসায় তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব রেডিওতে সরাসরি স¤প্রচার শুনছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামে নিবেদিত প্রাণ বেগম মুজিব শতকষ্ট বুকে চেপে দুঃখী বাংলার মানুষের জন্য স্বামীর ত্যাগ ও ভালোবাসার পথটা ক্ষণিকের জন্যও আটকে দেননি। প্রেরণা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সে আত্মত্যাগের কথা বারবার এসেছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যেভাবে সংগ্রাম করেছে আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম, ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালিকে দাবায় রাখতে পারবে না।’ ফাঁসির জন্য কী ভয় পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু? স্বজনের জন্য কেঁদেছিল প্রাণ? খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ২৫ মার্চের নির্মম কালো রাতের কথা। পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে তার গ্রেফতার, নির্যাতন থেকে শুরু করে জেলের অভিজ্ঞতা। বঙ্গবন্ধু ডেভিড ফ্রস্ট কে বলেন, ‘৪ঠা ডিসেম্বর (১৯৭১) ওরা আদালতের কাজ শেষ করে। সাথে সাথে ইয়াহিয়া খান সব বিচারককে রাওয়ালপিন্ডিতে ডেকে পাঠান রায় তৈরি করার জন্য। বিচারক মানে ঐ সকল কর্নেল ও ব্রিগেডিয়ার। তিনি তাদের বিচারের রায় জানিয়ে দেন। এবং সেখানেই তারা আমাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর সিদ্ধান্ত নেয়।’
এরপর কারা কক্ষের পাশেই কবর খনন করা হয়। নিজেই দেখলেন নিজের কবর খোঁড়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, ভয় নেই, আমি তৈরি আছি। পাক হানাদারদের বঙ্গবন্ধু শুধু একটা অনুরোধ করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর তার লাশটি যেন তার বাঙালির কাছে দিয়ে দেওয়া হয়।
ডেভিড ফ্রস্ট প্রশ্ন জানতে চাইলেন, আপনি যখন দেখলেন, ‘ওরা কবর খনন করেছে, তখন আপনার মনে কার কথা আগে জাগল? আপনার দেশের কথা? না আপনার স্ত্রী-পুত্র পরিজনের কথা?’
উত্তরে বঙ্গবন্ধু নিঃসংকুচে বলে দিলেন, ‘আমার প্রথম চিন্তা ছিল আমার দেশ, তারপর আমার পরিবার। আমি আমার জনগণকেই বেশি ভালোবাসি।’
সারাজীবন তাঁর এই এক স্বপ্ন, বাংলার দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। একটাই সাধ, বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা।
এজন্যই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে বুক চিরে বেরিয়ে আসা কথাগুলো এভাবে বললেন, ‘আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই-আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।’
বঙ্গবন্ধুর চোখে তখন ভেসেছিল সাড়ে সাত কোটি বাংলার মানুষ। একটি বাংলাদেশ। এজন্যই জন্মের শতবছর পরেও তিনি তাঁর আদর্শে আজও ভাস্বর হয়ে আছেন এই বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মুজিব শতবর্ষ

১৮ মার্চ, ২০২০
১৭ মার্চ, ২০২০
১৭ মার্চ, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন