Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৩ শাবান ১৪৪১ হিজরী

প্রশ্ন : মহাগ্রন্থ আল কোরআন কি মুক্তির দিশারী?

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম | প্রকাশের সময় : ১৯ মার্চ, ২০২০, ১২:০৩ এএম

উত্তর : (পূর্ব প্রকাশিতের পর) কোরআনুল করীম তেলাওয়াতের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়।( সহিহ বুখারী) হজরত আয়শা ছিদ্দীকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি কোরআনের জ্ঞানী হবে, কিয়ামতের দিন সে সম্মানিত ফেরেস্তাদের সঙ্গে থাকবে। আর যে কোরআন শিখার চেষ্টা করবে, শিখতে শিখতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অর্থাৎ শিখার জন্য সে চেষ্টা করে, তার জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। (সহিহ বুখারী) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পড়বে বিনিময়ে তাকে একটি সওয়াব দেওয়া হবে। আর প্রতিটি সওয়াব ১০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। (জামে তিরমিযী)
কিয়ামতের ভয়াবহ দিন যখন আপনজন ও ধনস¤পদ কোনো কাজে আসবে না, তখন কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। হজরত আবু উমামা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা কোরআন তেলাওয়াত কর। কারণ কিয়ামতের দিন কোরআন তার তেলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে। (সহিহ মুসলিম) অন্য হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন কোরআন তার তেলাওয়াতকারী ও আদেশ-নিষেধ মান্যকারীকে বলবে, আমাকে চিনতে পারছো? আমি সেই কোরআন যে তোমাকে রোজার আদেশ দিয়ে দিনে পিপাসার্ত আর রাতে নামাযে রত রেখেছিল। প্রত্যেক ব্যবসায়ীই তার ব্যবসার মাধ্যমে লাভবান হতে চায়। আজ তুমি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছ। তারপর ওই বান্দার ডান হাতে বাদশাহি, বাম হাতে জান্নাতে বসবাসের পরোয়ানা দেওয়া হবে। মাথায় নূরের তাজ পরানো হবে এবং বলা হবে, কোরআন পড়তে থাকো আর উচ্চ মাকামে উঠতে থাকো। (মুসনাদে আহমদ)
যখন এই ঐশী বাণীর জ্যোতি সমাজে পড়ে তখন অন্ধকার আলোতে পরিনত হয়ে যায়, চারিদিকে হিদায়তের নূর ছড়িয়ে পড়ে, গুনাহে লিপ্ত লোকেরা যখন হিদায়তে ভরা আয়াত শুনে তখন কুরআনের নূরে তার অন্তর আলোকিত হয়ে যায়, তাদের অন্তরে খোদাভীতি সৃষ্টি হয় এবং সে শুধুমাত্র নিজেই গুনাহ থেকে তাওবা করে নামায ও সন্নাতের পথে পরিচালিত হয় না বরং মুসলমানদের নেতা এবং পথহারা লোকদেরও পথনির্দেশক হয়ে যায়। যার তিলাওয়াত শ্রবণ করে মানুষের মন কেঁপে উঠে, শরীরের লোম খাঁড়া হয়ে যায়, মানুষের আখিরাতের চিন্তা নসীব হয়ে যায় এবং বড় বড় গুনাহগারদের সত্যিকার তাওবার তৌফিক অর্জিত হয়। হযরত সায়্যিদুনা সালিহ মুররি বলেন: একদা সেতারা (এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র) বাদিকা এক মহিলা কুরআন তিলাওয়াতকারীর পাশ দিয়ে অতিμম করছিলো, তখন তিনি (তিলাওয়াতকারী) ২১ পারার সূরা আনকাবুতের ৫৪ নং আয়াত ( অর্থাৎ-এবং নিশ্চয় জাহান্নাম পরিবেষ্টন করে আছে কাফিরদেরকে;) তিলাওয়াত করছিলেন, এই আয়াতে করীমা শুনতেই মহিলাটি সেতারা ফেলে দিয়ে একটি উচ্চস্বরে চিৎকার দিলো এবং বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো, যখন হুঁশ ফিরলো তখন সেতারা ভেঙ্গে ইবাদত ও রিয়াযতে এমনভাবে লিপ্ত হয়ে গেলো যে, আবিদা ও যাহিদা রূপে প্রসিদ্ধ হয়ে গেলো। একদিন আমি তাকে বললাম যে, নিজের সাথে একটু নম্রতা প্রদর্শন করুন! একথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে বললো: আহ! আমি যদি জানতে পারতাম যে, জাহান্নামীরা তাদের কবর থেকে কিভাবে বের হবে! পুলসিরাত কিভাবে অতিক্রম করবে? কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে কিভাবে মুক্তি পাবে? ফুটন্ত গরম পানির ঢোক কিভাবে পান করবে? আল্লাহ্ তাআলার গযবকে কিভাবে সহ্য করবে? এতটুকু বলার পর আবারো বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলো, যখন হুঁশ ফিরলো তখন আল্লাহ্ তাআলার দরবারে এভাবে আরয করলো: হে আমার প্রতিপালক! আমি যৌবনে তোমার অবাধ্যতা করেছি এবং দূর্বল (বৃদ্ধ) অবস্থায় তোমার আনুগত্য করছি, তুমি কি আমার ইবাদত কবুল করবে? অতঃপর সে এক হৃদয়বিদারক শব্দ করলো এবং বললো: আহ! কিয়ামতের দিন কতইনা লোকের গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাবে, অতঃপর সে একটি চিৎকার দিলো এবং এমন হৃদয় বিদারক ভঙ্গিতে কাঁদলো যে, উপস্থিত সকলেই বেহুঁশ হয়ে গেলো। (আর রওযুল ফায়িক, ১৪৮ পৃ:)
হযরত সায়্যিদুনা ফুযাইল বিন আয়ায একজন ভয়ঙ্কর ডাকাত ছিলেন যে, পুরো পুরো কাফেলাকে একাই লুট করে নিতেন। একবার একটি কাফেলা তার এলাকার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলো, তাদের সেখানেই রাত হয়ে গিয়েছিলো। তিনি লুটতরাজ করার জন্য যখন কাফেলার নিকটে পৌঁছলেন তখন কতিপয় কাফেলার সদস্যদের এরূপ বলতে শুনলেন: তোমরা ঐ লোকালয়ের দিকে যেও না বরং অন্য কোন পথে গমন করো, এখানে ফুযাইল
নামক এক ভয়ঙ্কর ডাকাত থাকে। যখন তিনি কাফেলার সদস্যদের এই কথা শুনলেন তখন তার মাঝে কম্পন শুরু হয়ে গেলো এবং উচ্চ স্বরে বললেন: হে লোকেরা! আমি ফুযাইল বিন আয়ায তোমাদের সামনেই বিদ্যমান, যাও! নির্ভয়ে চলে যাও, তোমরা আমার থেকে নিরাপদ। আল্লাহ্র শপথ! আজকের পর আমি আর কখনো আল্লাহ্ তাআলার অবাধ্যতা করবো না। এতটুকু বলেই তিনি সেখন থেকে চলে গেলেন এবং নিজের পূর্ববর্তী সকল গুনাহ থেকে তাওবা করে সত্য পথের মুসাফিরদের সাথে অন্তভর্‚ক্ত হয়ে গেলেন। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি সেই রাতে কাফেলার সদস্যদের দাওয়াত দিলেন এবং বললেন: তোমরা ফুযাইল বিন আয়ায থেকে নিজেকে নিরাপদ ভাবো, অতঃপর তিনি তাদের পশুদের জন্য খাবার আনতে চলে গেলেন, যখন ফিরে এলেন তখন কাউকে কুরআনে পাকের সূরা হাদীদের ১৬ নং আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলেন:(অর্থাৎ ঈমানদারদের জন্য কি এখনো ঐ সময় আসেনি যে, তাদের অন্তর ঝুঁকে পড়বে আল্লাহ্র স্মরণে।) কুরআনে করীমের এই আয়াত প্রভাবময় তীর হয়ে তাঁর বুকে বিদ্ধ হয়ে গেলো। তিনি কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন এবং নিজের কাপড়ে মাটি ঢালতে ঢালতে বললেন: হ্যাঁ! কেন নয়! আল্লাহ্র শপথ! এখন সময় এসে গেছে, এখন সময় এসে গেছে, তিনি এভাবে কাঁদতে লাগলেন অতঃপর নিজের পূর্ববর্তী সকল গুনাহ থেকে তাওবা করে নিলেন। (উয়ুনুল হিকায়াত, ২/১৭)
উত্তর দিচ্ছেন : মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন