Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬, ১০ শাবান ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

অমিত গোস্বামীর মহানির্মাণ

আ লী এ র শা দ | প্রকাশের সময় : ২০ মার্চ, ২০২০, ১২:০৩ এএম

যুগে যুগে বিভিন্ন সাহিত্য রচিত হয়, তার মধ্যে কিছু লেখা ঠাঁই করে নেয় মানুষের মনে, ইতিহাসের পাতায় । সাহিত্য গুণে কিছু কিছু গ‘ন্থ অমরতা লাভ করে। কিছু কিছু বইয়ের আবেদন থেকে যায় যুগ থেকে যুগান্তরে। এসব বই পাঠ করে পাঠক হৃদয় তৃপ্ত হয়। জানতে পারে অনেক অজানা অধ্যায়; ‘মহানির্মাণ’ তেমনি একটি বই। বইটি লেখা হয়েছে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কলকাতার ছাত্রজীবনের সময়টুকু নিয়ে।
পেলখক অমিত গোস্বামী ইতিহাস লেখেননি; ইতিহাসকে আশ্রয় করে লিখেছেন উপন্যাস। উপন্যাসে এসেছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বংলা এ কে ফজলুল হক, আবুল হাশিম, খাজা নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুর মতো মহামানবদের চরিত্র। লেখক সবগুলো চরিত্রকে নিপুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপন দক্ষতায়।
বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ; বাংলাদেশই বঙ্গবন্ধু। আর এই বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূলভিত্তি নির্মিত হয়েছে কলকাতায়।
বঙ্গবন্ধু প্রথম কলকাতায় যান অসুস্থতার জন্য ডাক্তার দেখাতে, লেখক সে সময় থেকে কাহিনী শুরু করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ে শেষ করেছেন। ‘মহানির্মাণ’ বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র শেখ মুজিব। লেখক বইটিতে এমনভাবে সংলাপ তৈরি করেছেন যেন লেখক সে সময়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। সহজ সাবলীল ভাষায় সংলাপগুলো হয়ে উঠেছে জীবন্ত। লেখক যেন কল্পনায় প্রবেশ করেছিলেন মুজিবের ছাত্র জীবনের সময়টুকুতে।
অমিত গোস্বামী ইতিহাস ঘেটে সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচন করছেন ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায়। সাধারণ পাঠক সহজেই জানতে পারবে বঙ্গবন্ধুর নেতা হয়ে উঠার কাহিনী। জানতে পারবে কি টান টান উত্তজনার ভেতর দিয়ে জিন্নাহর ভুল থিওরির ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে গেলো। পাঠক জানতে পারবে ভাষা এবং সংস্কৃতি এক হওয়া সত্ত্বেও কেন অখন্ড বাংলা টিকিয়ে রাখা গেলো না।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন আত্মসচেতন মানুষ। সমাজের চারপাশের ঘটনাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন তিনি। সব বিষয়েই তিনি ছিলেন কৌতুহলী, এই কৌতুহলই তাকে টেনে নিয়ে যায় রাজনীতিতে। হয়ে উঠেন মহানেতা।
বইটি তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত নয়, তবে তথ্যকে এড়িয়েও যাননি লেখক। সংলাপে সংলাপে এগিয়ে নিয়ে গেছেন সামনের দিকে। পড়া শুরু করার পর শেষ না করে উঠতেই মন চাইবে। বলার ঢঙে এক ধরণের আকর্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে অমিত গোস্বামীর। একজন সৃজনশীল লেখকের দ্বারাই এমন নির্মোহ ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস লেখা সম্ভব।
বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমানের সাথে কলকাতা এসে উঠেন বোনের বাসায়। ডাক্তার সব দেখে বলেন, ‘আজ থেকে ও ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত খাবে....
আরও বলেন, ‘কমপ্লিট বেড রেস্ট।” সাথে উপদেশ দেন, ‘ বাড়িতে শুয়ে শুয়ে পড়বি। অনেক পড়বি। দেশের কথা পড়বি। গল্প পড়বি। রবীন্দ্রনাথ পড়বি।নজরুল পড়বি। তুই ‹পথের দাবী› পড়েছিস?’
পথের দাবী শরৎচন্দ্রের লেখা একটি বিখ্যাত উপন্যাস। ইংরেজ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করেছিল।
মুজিবের একবছর স্কুল কামাই হয়, সে সময় তিনি প্রচুর বই পড়েন। ‘পথের দাবী’ বইটি মুজিবের মনের ভেতর বেশ প্রভাব ফেলেছিলো। উপন্যাসের নায়ক সব্যসাচীর সেই উক্তি, ‘ আমি বিপ্লবী। আমার মায়া নেই, দয়া নেই। পাপপুণ্য আমার কাছে মিথ্যা পরিহাস। ওইসব ভালো কাজ আমার কাছে ছেলেখেলা। ভরতের স্বাধীনতা, ওই আমার ভালো, ওই আমার মন্দ। এছাড়া এ জীবনে আমার কোথাও কিছু নেই’ মুজিবকে বেশ উদ্দীপিত করেছিল। যা পরবর্তীতে আমরা তাঁর জীবনে দেখতে পাই; অধিকার আদায়ে কতটা দৃঢ়চেতা ছিলেন তিনি। জীবনে প্রচুর সাহিত্যের বই পড়েছিলেন তিনি, তাই দেখতে পাই সাহিত্যের প্রতি বঙ্গবন্ধুর একটা আলাদা টান ছিলো। অতিরিক্ত বই পড়ার কারণে চোখে সমস্যা দেখা দেয় তাঁর। আবার কলকাতা যেতে হয় এবং চোখে অপারেশন করতে হয়।
মুজিব হাইস্কুলে পড়ার সময় গোপালগঞ্জে আসেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব।
তাঁদের স্কুল পরিদর্শনে যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব, ছাত্রদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে অভ্যর্থনা জানান। যাবার সময় সোহরাওয়ার্দী সাহেব শেখ মুজিবকে বলেন, ‘ আচ্ছা তুমি তো খুব করিৎকর্মা ছেলে। তোমার নাম কি? বাড়ি কোথায়? পিতা কে?
আমার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাড়ি টুঙ্গিপাড়া। পিতা শেখ লুৎফর রহমান। এখানকার সেরেস্তাদার। আমি এখানেই থাকি আব্বার সাথে।
ওহ, তুমি লুৎফর সাহেবের ছেলে। বাহ, তবে তো, আমাদের ঘরের ছেলে তুমি।’
লেখকের কল্পনা শক্তি প্রবল না হলে এমন কথোপকথন সৃষ্টি করা সত্যিই দূরুহ কাজ।
তারপর বছর ঘুরতেই শেখ মুজিব আবার সোহরাওয়ার্দী সাহবের সাথে দেখা করেন। গোপালগঞ্জে ছাত্রলীগ এবং মুসলিম লীগ গঠন করা নিয়ে মুজিব আগ‘হ প্রকাশ করেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব মুজিবের ভেতর নেতৃত্ব গুণ দেখতে পেয়েছিলেন, তাই তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসার জন্যই পিতার মতো করে বলেন, ‘শোন মুজিব। এইসব করতে গিয়ে তুমি যদি এন্ট্রান্সের ফল খারাপ কর তাহলে কলকাতায় পড়তে পাড়বে কিভাবে? আমি চাই তুমি ভালোভাবে পাস করে কলকাতায় পড়তে আসো। গোপালগঞ্জে আটকে থাকলে চলবে না। কলকাতা দিল্লি সব মূল জায়গায় তোমার পায়ের চিহ্ন থাকতে হবে।’
ছাত্র হিসেবে মুজিব যথেষ্ট ভালো ছিলেন, ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় মুজিবের খুব জ্বর হলো, জ্বর নিয়েই পরীক্ষা দিলেন এবং দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে পাস করলেন।
আইএ-তে ভর্তি হলেন ইসলামিয়া কলেজে। তারপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হলো মুজিবের। সোহরাওয়ার্দীর কাছে নিলেন রাজনৈতিক দীক্ষা। বাংলার রাজনীতিবিদদের মাঝে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মতো এতো তীক্ষ্ণ বোধ সম্পন্ন রাজনীতিবিদ নেই বললেই চলে। আজীবন সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করেছেন, সেই শিক্ষায় পেয়েছিলেন শেখ মুজিব। সোহরাওয়ার্দীর পথ ধরে ধীরে ধীরে ঠাঁই করে নেন মানুষের মনের মনিকোঠায়।
লেখক বইটিতে শেখ মুজিবের ফুলশয্যার রাতে স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছার সাথে কথোকথনের যে চিত্রটি অংকিত করেছেন তা এক কথায় অসাধারণ। একজন আপাদমস্ত।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন