Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

মানুষ

ফ রি দা হো সে ন | প্রকাশের সময় : ২৬ মার্চ, ২০২০, ১২:০১ এএম

নিজের ঘরে চুপচাপ শুয়েছিল-ইয়ার খান।
ঘুম আসছিলনা কিছুতেই।
এপাশ ওপাশ করছিল বারবার।
ঘরের বাতি নেভানো ছিল।
কিন্তু জানলা দিয়ে বাইরের আলো এসে পড়ছে ঘরে।
ইয়ার খানের ছটফট করা ভাবটা অনেকক্ষণ থেকেই লক্ষ্য করছিল বুড়ো কালু শেখ।
একই ঘরে থাকে ওরা।
এক সময় কালু শেখ স্বস্নেহে জিজ্ঞেস করলো-
ঃ কিরে ? ঘুম আসছেনা ? সেই তখন থেকে ছটফট করছিস।
ইয়ার খান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পাশ ফিরলো।
তারপর বলল-
ঃ তুমিও তো ঘুমোওনি চাচা-
কালু শেখ কেমন একটা হতাশার সুরে বলল-
ঃ আমার আবার ঘুম ! বয়স হয়েছে। সংসারের অনেক দায়িত্ব ঘাড়ের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো এখনো চেপে আছে। নানান চিন্তায় ঘুম আমার বড় একটা হয়না। কিন্তু তোর কিসের অতো ছটফটানি ?
ইয়ার খান কোন জবাব দিলনা। কালু শেখ একটু চুপ করে থেকে আবার প্রশ্ন করলো-
ঃ নতুন জায়গায় বুঝি মন টিকছেনা ? তা ক’দিন গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। সাহেব আমাদের বড় ভালো মানুষ।
ইয়ার খান মাথার বালিশটা তাড়াতাড়ি তরে বুকের তলায় চেপে ধরে শুয়ে থাকলো। কোন কথা বলল না-
কালু শেখ এবার উঠে বসে টেবিলে রাখা জগ থেকে পানি ঢেলে খেল। জিজ্ঞেস করলো-
ঃ পানি খাবি ? শরীরটা ঠান্ডা হলে দেখবি ঘুম আসবে।
ইয়ার খান এবারও কোন জবাব দিলনা। কালু শেখ এক সময় জিজ্ঞেস করলো-
ঃ বিয়ে করেছিস? সংসার আছে ?
এবার এপাশ ফিরলো ইয়ার খান। বলল-
ঃ না-
কালু শেখ হেসে উঠে বলল-
ঃ তবে আর ছটফট করছিস কেন? ঘুমো-
কিন্তু তবুও ঘুম এলোনা ইয়ার খানের।
জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখে আসছে রাজমিস্ত্রী সায়গল চাচাকে।
বস্তী পাড়ার আর দশটা এতিম ছেলের মতো করেছে ছাদ পেটার কাজ।
কেটেছে শৈশব আর কৈশোর।
তারপর যৌবনের প্রারম্ভে এসেছে জলিল ড্রাইভারের আস্তানায়।
গাড়ি মেরামতের কাজ শিখতে, শিখেছে গাড়ি চালাতে এবং অল্পদিনের মধ্যেই চাকরীও পেয়েছিল ইয়ার খান।
জলিল ওস্তাদ হেসে বলেছিল-
ঃ তোর কপাল খুলে গেল ইয়ার।
উত্তরে স্বলজ্জ হেসেছে ইয়ার খান।
কাজ করেছে অক্লান্ত।
এবং অল্প দিনেই মধ্যেই পেয়েছে সুখ্যাতি একজন সুদক্ষ সৎ এবং অনুগত ড্র্রাইভার হিসাবে। মূল্যায়ন পেয়েছে সব জায়গায়।
সংসার পাবে সে কোথায় ?
আটাইশ এর ইয়ার খানের বুকের এই ছটফটানির কথা কালু শেখের জানবার কথা নয়।

জজ সাহেবের বাড়িতে জয়েন করেছে ইয়ার খান একমাসও হয়নি।
আরো দু’টো পুরোন ড্রাইভার আছে এ বাড়িতে।
বুড়ো জাভেদ আলী জজসাহেবের ডিউটি করে। বিশ্বস্ত এবং পরিবারের একজনে মতোই।
অন্যজনে বেগম সাহেবার।
কিন্তু ইয়ার খান একেবারেই নতুন এখানকার পরিবারের সাথে।
কিছুদিন হোল জজ সাহেবের মেয়ে সোমা এসেছে দার্জিলিং থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে এবং এসেই ভীষণ ভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ঢাকায়।
সোমার এই ব্যস্ততা সামাল দিতে ইয়ার খানকে এ্যাপয়েন্টমেন্ট দিলেন জজ সাহেবে।
ছফুটের সুদর্শন, সুঠাম ইয়ার খান কখনো ভাবেনি নিজেকে নিয়ে।
শৈশব কৈশোর পেরিয়ে, কবে যে যৌবন এসেছে কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে টেরই পায়নি।
নারী সঙ্গ বিবর্জিত জীবন কেটেছে সব সময়।
কিন্তু এখানে আসার পর থেকে, সব কিছু কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।
ভাবতে পারেনি ইয়ার খান।
শুধু অবাক হওয়া নয়।
চমকে উঠেছিল সে, প্রথম যেদিন সোমা পেছনের সীট ফেলে, ড্রাইভিং সিটের পাশে বসলো।
ইয়ার, একটু ইতস্ততঃ করে বলেছিল-
ঃ ম্যাডাম আপনি এখানে-!
কেমন করে যেন ওর দিকে তাকিয়েছিলে জিন্স আর ¯øীপলেস গেঞ্জি পরা সোমা।
বলেছিল কোন প্রবলেম আছে ?
একটু যেন হোচড় খেল ইয়ার খান।
তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
ঃ জ্বী না-
ঃ থ্যাঙ্কস্।
গাড়িতে উঠেই মিউজিক অব রোমান্স এর ক্যাসেট ছাড়লো সোমা। গাড়ি ছুটে চললো গুলশান বনানী হয়ে এয়ারপোর্ট রোড ধরে।
এক সময় ইয়ার খান জিজ্ঞেস করলো-
ঃ ম্যাডাম কোথায় যেতে হবে তা যদি বলতেন, কিন্তু কে শোনে কার কথা-
সুরের মূরছনায় মাতোয়ারা সোমা।
বাতাসে উড়ছে চুলের উদ্দাম গোছা।
শরীর থেকে ভুরভুর করে সুগন্ধি ছড়াচ্ছে উগ্র পারফিউম।
এরকম প্রায়ই হয়।
আজ ক’দিন ধরে ইয়ার খানের কাছে ড্রাইভিং শিখছে সোমা।
শিখছে অত্যন্ত আগ্রহ ও মনোযোগ নিয়ে শিখতে এবং শেখাতে গিয়ে পরস্পরের হাতে হাত লাগছে।
উষ্ণ নিঃশাসের স্পর্শ পাচ্ছে দু’জনে।
কিন্তু ভীষণ ভাবে স্থির এবং নির্বিকার ইয়ার খান তার চাল চলনে।
কিন্তু সোমার উসৃঙ্খল তারুণ্য আরো চঞ্চল হয়ে উঠে ইয়ার খানের স্বান্যিদ্ধে।
সেদিন আশুলিয়ার ‘ফ্যান্টাসী কিংডমে’ গেল বেশ ক’জন বন্ধু মিলে।
মোট তিনটি গাড়িতে এগার জনের দল।
গুলশান সোমাদের বাড়ি থেকে রওনা দিল সবাই হৈ ছৈ করতে করতে।
ওখানে যখন পৌঁছলো তখন প্রায় বিকেল পাঁচটা।
মাথার ওপর মেঘলা আকাশ।
মাঝে মাঝে একটু ঝড়ো বাতাস। কিন্তু সোমা ও ওর বন্ধুদের কোন কিছুতেই উৎসাহের কমতি নেই।
উচ্ছল তারুণ্যে প্রাণবন্ত সবাই।
অনেকগুলো রাইডে উঠলো ওরা। প্রায় সবাই ঢাকার বাইরে থেকে পড়াশোনা করে।
কিছুদিনের ছুটিতে পুরোন বন্ধুরা একসাথে হয়েছে সবাই।
হৈ চৈ করে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে, টেরই পেলনা ওরা।
রাত তখন আটটা।
যে যার ঘাড়িতে উঠে বসলো।
ঝড়ো হাওয়ার মাত্রাটা একটু যেন বেড়েছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমক আকাশে।
সবাই যেন একটু ঘাবড়ে গেল।
অন্য দুটি গাড়ি যাবে ধানমন্ডি এবং শ্যামলী। কাজেই ওরা ফ্যান্টাসি কিংডম থেকে বেরিয়ে পেছনের অন্য রাস্তা ধরে এগুলো।
সোমা রওনা দিল গুলশানের দিকে। আশুলিয়া রাস্তা তখন দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকার। এবং নিরিবিলি।
দেখতে দেখতে ঝড় বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে গেল। ভীষণ ভাবে ভয়ে একেবারে কাঁদা হয়ে গেল সোমা।
কড় কড় কড়াৎ !
কোথায় যেন বাজ পড়লো।
ভয়ে এক সময় ইয়ার খানের হাত চেপে ধরলো সোমা।
সামনের দিকে তীব্র দৃষ্টি ইয়ার খানের।
বৃষ্টির জন্যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
সব কিছুই ঝাপসা।
সোমার অবস্থা দেখে একটু যেন বিরক্ত হোল ইয়ার খান।
একটু কঠিন কণ্ঠে বলল-
ঃ হাত ছেড়ে দিন মেম সাহেব।
সোমা ওর হাতটা সরিয়ে নিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলল-
ঃ আমার ভীষন ভয় করছে।
ঃ করার কিছুই নেই।
তেমনি নির্বিকার কণ্ঠ ইয়ার খানের।
তারপরেও মেঘ গর্জ্জন আর বিদ্যুৎ চমকের সাথে সাথে ইয়ার খানের গা ঘেঁষে বসছে সোমা। অনিচ্ছা সত্বেও ধরে ফেলেছে ওর হাত।
বার বার বিরক্ত হচ্ছে ইয়ার খান।
এক সময় বলল-
এরকম করলেতো এ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাবে মেম সাহেব।
ঃ প্লীজ তুমি কোথাও গাড়ি থামাও।
ঃ গাড়ি থামাবো ? বাড়ি যেতে হবে না?
ঃ সেটা ঝড় কমলে-
ঃ ঝড় যদি না কমে ?
ঃ আমি জানিনা, আমি কিছু জানিনা, আমার ভীষন ভয় করছে। প্লীজ তুমি গাড়ি থামাও।
ইয়ার খান তেমনি সামনের বৃষ্টি স্নাত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল-
ঃ ভয়কি মেম সাহেব ! আমি রয়েছিনা !
সোমা তাকালো ইয়ার খানের দিকে।
অন্ধকারে ওর মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছেনা। তবুও যেন বুঝতে পারছে।
কি অদ্ভূত দৃঢ়তা ওর চোখে মুখে।
উত্তরার কাছাকাছি এসে স্ট্রাট বন্ধ হয়ে গেল গাড়ির।
ঝড় কমলেও মুষলধারে বৃষ্টি একেবারেই বন্ধ হয়নি।
কাছাকাচি একটা পেট্রোল পাম্পের পাশে গাড়ি রেখে অপেক্ষা করতে লাগলো অন্য কোন গাড়ির জন্যে।
বুকের ভেতরটা কেমন ধুক ধুক করতে লাগলো সোমার।
বৃষ্টির মাত্রা যেমন বাড়ছে।
রাত ও তেমনি বাড়ছে।
বাবা-মা নিশ্চয় এতোক্ষণে দুঃচিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন।
মোবাইলটাও কাজ করছেনা।
মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে সাঁই সাঁই শব্দ করে।
ইয়ার খান একসময় বলল-
ঃ আপনি এখানে থাকুন মেম সাহেব। আমি একটু আগে গিয়ে দেখি।
বলে যেতে পা বাড়ালো ইয়ার খান। পেছন থেকে ওর সার্ট চেপে ধরলো সোমা।
একটু থমকে, পেছন ফিরে ওর দিকে তাকালো ইয়ার খান।
দেখলো উসৃঙ্খল তারুণ্যের সোমা মেম সাহেবের ভেজা ক্লান্ত আর অসহায় দু’টো চোখ। তখনো হাতের মুটিতে ধরা ইয়ার খানের ভেজা সার্টের একাংশ।
সোমা কণ্ঠে যেন কম্পিত মিনতি ঝরে পড়লো।
বলল-
ঃ আমাকে একা ফেলে যেওনা প্লীজ !
কি যেন একটু ভাবলো ইয়ার খান। তারপর সোমার একটা হাত ধরে নিয়ে জোরে হেঁটে রাস্তার খানিকটা আগে গিয়ে দাঁড়ালো।
বার কয়েক হাত তুলে ইশারা দিল।
কিন্তু বেশ কয়েকটা গাড়ি দ্রæত চলে গেল ওর সিগনাল উপেক্ষা করে।
অনেক্ষন পর একটা মাইক্রোবাস থামলো দয়াপরবশ হয়ে-।
উঠে বসলো ওরা দু’জন।
একসময় ড্রাইভার বললো-
ঃ এই ঝড় বৃষ্টির রাতে মেয়ে ছেলে নিয়ে কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
ইয়ার খান দাঁত দাঁত চেপে হাত মুষ্টি বদ্ধ করলো।
লক্কর ঝক্কর মাইক্রোবাসটি খুব দ্রæত লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চলতে লাগলো বৃষ্টি স্নাত অন্ধকার পেরিয়ে।
ইয়ার খানের গা ঘেঁষে বসে রইলো সোমা একেবারেই ঝিম ধরে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন