Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ জামাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

জঙ্গিদের হাতে ভয়ঙ্কর যুদ্ধাস্ত্র, ট্রানজিট চট্টগ্রাম

প্রকাশের সময় : ১৮ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

রফিকুল ইসলাম সেলিম : গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলাকারী জঙ্গিদের হাতে অন্যান্য অস্ত্রের সাথে ছিল একে-২২ রাইফেল। এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাষ্য ওই হামলায় জড়িতরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য। গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানার মাঝিরঘাটে তিন খুনসহ একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুটি একে-২২ রাইফেল উদ্ধার করে পুলিশ। নিজেদের ছোড়া গ্রেনেডে আহত হয়ে ওই দুটি রাইফেল রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
পরে মামলা তদন্তকালে পুলিশ নিশ্চিত হয় ওই ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িতরা জেএমবি’র সদস্য। তদন্তের সূত্র ধরে নগরীর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগরের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তাদের দু’জন স্বীকার করে সদরঘাটের ছিনতাইয়ে তারা জড়িত ছিল। তহবিল সংগ্রহ করতেই তারা ওই ছিনতাই করতে গিয়েছিল।
খোয়াজনগরের ওই জঙ্গি আস্তানা থেকে আরও একটি একে-২২ রাইফেলসহ বিপুলসংখ্যক গুলি ও গ্রেনেড উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর ধারাবাহিক অভিযানে হাটহাজারীর আমানবাজারে আরও একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে এমকে-১১ অটোমেটিক স্নাইপার রাইফেল, ২টি ম্যাগজিন, ২৫০ রাউন্ড গুলি, ৫ কেজি বিস্ফোরক জেল, ১০টি ডেটোনেটর, বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে ডিবি।
তারও আগে নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার একটি আবাসিক ভবন এবং বাঁশখালীর লটমণি পাহাড়ে জঙ্গি আস্তানা থেকে একাধিক একে-২২, একে-৫৬ রাইফেলসহ ভারি অস্ত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। বাঁশখালীর আস্তানা থেকে উদ্ধার হয় ফোর সেভেন নামে ভারি অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র।
এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রামের র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিদের হাতে ভারি যুদ্ধাস্ত্র আসছে এটা এখন নিশ্চিত। তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজার সীমান্ত পথে আসা এসব অস্ত্র জঙ্গিদের হাতে চলে যাচ্ছে বলেও তাদের ধারণা। আর এই ক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে তারা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।
ঢাকার গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র এবং এর আগে চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মিল থাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। এসব অস্ত্রের উৎস খুঁজে তা বন্ধ করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কালো অস্ত্রের সওদাগরি সিন্ডিকেটের উপরও শুরু হয়েছে কড়া নজরদারি।
সূত্র জানায়, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান-খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পাশাপাশি কক্সবাজারের সীমান্তে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছ থেকে জঙ্গিরা বিদেশি পিস্তল এবং একে-২২ রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করছে এমন তথ্য রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে। সীমান্ত পথে আসা এসব অস্ত্র চট্টগ্রামকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সে সাথে দেশে বৈধ অস্ত্রের বিপরীতে বরাদ্দকৃত বুলেট বা গুলি জঙ্গিদের কাছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা পুলিশের।
নগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ঢাকার গুলশানে ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলার ঘটনায় এ ধরনের ভারি অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি আবারও সামনে চলে এসেছে। চট্টগ্রামে জঙ্গিদের হাতে যে ধরনের অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, একই ধরনের অস্ত্র ওই হামলায় ব্যবহার হয়েছে। বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে এসব ভারি অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও মনে করছেন, জঙ্গিদের অস্ত্র পাচারের জন্য চট্টগ্রামকে ট্রানিজট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ দেশে এ পর্যন্ত এ ধরনের যতগুলো অস্ত্র ধরা পড়েছে তার বেশিরভাগই চট্টগ্রাম হয়ে দেশে এসেছে।
বিষয়টি স্বীকার করে এখানকার পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিস্তীর্ণ দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে সন্ত্রাসীদের জন্য এটি সুবিধাজনক রুট। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারের দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে এসব অস্ত্র আসার সুযোগ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন চালান ধরাও পড়েছে। রেঞ্জ পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, সীমান্ত এলাকায় ইতোমধ্যে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আর এই অঞ্চলে যারা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায় জড়িত তাদের উপরও নজরদারি চলছে।
জঙ্গিদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় নগরীর বিভিন্ন থানায় ৫টি মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেন এসব অস্ত্র সীমান্ত পথে দেশে এসেছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কাদের হাত ধরে এসব অস্ত্র জঙ্গিদের কাছে পৌঁছেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে সীমান্তের ওপারে তৎপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সদরঘাটে ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্ধারকৃত দুটি একে-২২ রাইফেল ওই ঘটনার মাত্র তিনদিন আগে রাঙ্গামাটি সীমান্ত পথে দেশে আসে বলেও নিশ্চিত হয় পুলিশ।
তবে এসব অস্ত্রে ব্যবহৃত গুলি বা বুলেট অস্ত্রের সাথে আসেনি। দেশে বিভিন্ন উৎস থেকে এসব গুলি সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের ধারণা দেশে বৈধ অস্ত্রের অনুকূলে বরাদ্দকৃত গুলিই তারা ব্যবহার করছে। এসব গুলি জঙ্গিসহ সন্ত্রাসীদের কাছে যাচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এ কে এম হাফিজ আকতার। সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক এক সভায় তিনি বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার হচ্ছে মর্মে অভিযোগ তোলেন। তিনি নিশ্চিত করে বলেন, গেল ইউপি নির্বাচনে একজন জনপ্রতিনিধি ও একজন সরকারি কর্মকর্তার নামে থাকা বৈধ অস্ত্র অবৈধ কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
গত বছরের শেষদিকে নগরীতে র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে ১২টি একে-২২ রাইফেলসহ বেশ কয়েকটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধাস্ত্র ধরা পড়ে। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় র‌্যাব-পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন সীমান্ত পথে এসব অস্ত্র দেশে এসেছে। ওই সময় বান্দরবান সীমান্ত থেকেও বেশ কয়েকটি ভারি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। বান্দরবানের একটি আবাসিক হোটেলে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা একে-২২ রাইফেল র‌্যাবের হাতে ধরাও পড়ে। তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও কক্সবাজার সীমান্ত পথেও ভারি অস্ত্র আসছে। অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাত হয়ে এসব অস্ত্র চট্টগ্রাম, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে চলে যাচ্ছে। এসব অস্ত্রের একটি অংশ জঙ্গিদের হাতেও চলে যাচ্ছে।



 

Show all comments
  • Suvro ১৮ জুলাই, ২০১৬, ৪:২৪ পিএম says : 1
    ata khub e udbeg er bisoy
    Total Reply(0) Reply
  • Santa ১৮ জুলাই, ২০১৬, ৪:২৫ পিএম says : 1
    prosasoner uchit druto step nea
    Total Reply(0) Reply
  • Firoz ১৮ জুলাই, ২০১৬, ৪:২৯ পিএম says : 1
    সন্ত্রাসীদের উপর নজরদারি আরো বাড়াতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • মামুন খান ১৮ জুলাই, ২০১৬, ৪:২৯ পিএম says : 1
    এদের বিরুদ্ধে আরো বেশি বেশি অভিযান পরিচালনা করা উচিত বলে আমি মনে করি।
    Total Reply(0) Reply
  • সুলতান ১৮ জুলাই, ২০১৬, ৪:৪২ পিএম says : 1
    সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের কোন ধরনের ছাড় দেয়া ঠিক হবে না।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন