Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪ আশ্বিন ১৪২৭, ০১ সফর ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

শ্রাবণের অঝর ধারায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, চলছে নদী ভাঙ্গন

প্রকাশের সময় : ১৮ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

বিশেষ সংবাদদাতা : শ্রাবণের অঝর ধারা ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। দুটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অনেক এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে করে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সেইসাথে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন। এতে করে ভাঙ্গনকবলিত এলাকার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে। সীমান্ত নদী ভাঙ্গন এলাকার পরিস্থিতি আরও করুণ বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে বর্ষা ঋতুতে শ্রাবণের আবেদন অনেক। শ্রাবণে অঝরে বৃষ্টি ঝড়ে। তবে নেই ঝড় ঝাপটা। বর্ষা প্রেমীদের কাছে শ্রাবণ ভিন্যমাত্রা যোগ করে। ঘনকালো মেঘ আর ঝম ঝমিয়ে বৃষ্টি। এ যেনো শ্রাবণের চিরচেনা রূপ।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রাবণকে এভাবেই অখ্যায়িত করেছেন এভাবে ‘এই শ্রাবণ-বেলা বাদল-ঝরা যূথীবনের গন্ধে ভরা/ কোন ভোলা দিনের বিরহিনী, যেন তারে চিনি চিনি/ ঘন বনের কোণে কোণে ফেরে ছায়ার-ঘোমটা-পরা।’
শ্রাবণের এই অঝর ধারায় ডালিয়ায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার এবং জারিয়াজঞ্জাইলে কংস নদীর পানি বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও ধরলা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, করতোয়া, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, আত্রাই, বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, টঙ্গীখাল, কালিগঙ্গা, ধলেশ্বরি, বংশি, পুনর্ভবা, টাংগু, মহানন্দা, ছোট যমুনা, গঙ্গা, পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, কপোতাক্ষ, সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, ধলাই, যাদুকাটা, সুমেশ্বরি, মেঘনা, গোমতি, মহুরি, হালদা, সাংগু ও মাতামুহুরি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে কোন কোন নদীর পানি বিপদ সীমা ছুঁই ছুঁই করছে।
শ্রাবণ মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে জলীয়বাষ্পবাহী মৌসুমী বায়ু দেশের আকাশে বিস্তার লাভ করায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে শ্রাবণ মাসের শুরুতেই আবারো ফুসে উঠেছে তিস্তা নদী। গত রাতের ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে নীলফামারী ডালিয়া পয়েন্টে গতকাল রোববার তিস্তা নদী বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ব্যারেজের ৪৪টি কপাট খুলে রেখেও পানির স্রোত সামলানো যাচ্ছে না। এতে ব্যারেজের উজান ও ভাটিতে তিনটি ইউনিয়নের ১১টি চরের বাড়ি ঘরে থৈ থৈ করছে পানি। বিশেষ করে ডিমলা উপজেলা খালিশা চাপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর, ছোটখাতা, সতীঘাট টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চর খড়িবাড়ি, পূর্ব খড়িবাড়ি, টাবুর চর, পূর্ব টাবু, জিঞ্জিরপাড়া, একতাপাড়া, মুন্সিপাড়া এবং খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের কিসামতের চরে বাড়ি ঘরে থৈ থৈ করছে হাটু পানি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান জানান, ভারত গজলডোবা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দিলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা প্লাবিত হয়ে যায়। তখন তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দেয়ার পরেও পানির স্রোত সামলানো সম্ভব হয় না। এতে ব্যারেজের উজান-ভাটিতে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোর বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়। বাড়ে মানুষের ভোগান্তি। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এদিকে পানি বৃদ্ধির কারণে ঘাঘট-করতোয়া, তিস্তা-যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবেষ্টিত গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে প্লাবিত হওয়া এসব গ্রামের অনেকের বসতবাড়ির লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সেইসঙ্গে শত শত একর ফসলি জমি, পাট, পটল, কাঁচামরিচ ও শাক-সবজির ক্ষেতসহ সদ্য রোপণকৃত বীজতলা তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় পানিবন্দী হাজার হাজার মানুষ মানবেতন জীবনযাপন করছে। নি¤œাঞ্চল তলিয়ে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ি, আগামী ৪৮ ঘন্টা এসব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এতে করে এসব এলাকার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন পানি বিশেষজ্ঞরা।
ধরলা নদীর পানির তোড়ে ভেঙ্গে গেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় আধা কিলোমিটার বাঁধের অংশ বিশেষ। এলাকাবাসী জানায়, ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ দ্রুত মেরামত না করলে আরও বড় ধরণের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ইতেমধ্যেই ভাঙ্গা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে ফুলবাড়ি উপজেলার ৩ ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রাম।
এছাড়া নদী ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে প্রায় ৫ হাজার মানুষ। হুমকিতে রয়েছে শতাধিক বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্রীজ ও কালভার্ট। পানি বৃদ্ধির কারণে নি¤œঞ্চলের পাট, সবজি, কলা ও আমন বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তলিয়ে গেছে উঠতি পটল, ঝিঙ্গা, ঢেড়শসহ বিভিন্ন সবজি, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত। এ অবস্থায় কৃষকরা আগাম কেটে নিচ্ছেন তাদের সদ্য উৎপাদিত এবং প্লাবিত জমির ফসল।
এ ছাড়া পানিবন্দী এসব গ্রামের শতশত পরিবারের লোকজন বসতবাড়ি ছেড়ে উঁচু জায়গা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উঁচু মাচা পেতে বসবাস করছেন। বন্যা কবলিত এসব এলাকার অধিকাংশ কাঁচা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় লোকজন এখন নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় চড়ে যাতায়াত করছেন। বর্তমানে পানিবন্দী এসব এলাকার নারী-পুরুষ তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়ে অসহায় ভাবে দিনাতিপাত করছেন। বিশেষ করে তারা গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়া এলাকাগুলো হলো সদর উপজেলার কামারজানি, মালিবাড়ি, লক্ষ্মীপুর, কুপতলা, গিদারী ও কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম। প্লাবিত হয়েছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের উত্তর ও দক্ষিণ শ্রীপুর, কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের ছয়ঘড়িয়া, হরিপুর ইউনিয়নের হাজারির হাট, চড়িতাবাড়ি, বোছাগাড়ি, হরিপুর খেয়াঘাট ও বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর, বেলকা নবাবগঞ্জ, কাপাসিয়া, চন্ডিপুর ও তারাপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম।
এ ছাড়া সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া, মদনের পাড়া, আমদির পাড়া, কাঠুয়া, গোবিন্দপুর, জটিরপাড়া, থৈকরের পাড়া, চিনিরপটল, পালপাড়া, চকপাড়া, পবনতাইর, কুন্ডপাড়া, চানপাড়া, গোবিন্ধি, বাঁশহাটা ও মিয়াপাড়া গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট, পাটগ্রাম উপজেলার ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা, হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার বৈরাতি ও আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা কলতারপাড় চরাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। পানির চাপে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কানাইপাড়ায় ধসে গেছে সøুইচগেট। এতে ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। এছাড়া ভাঙনের মুখে পড়েছে ২টি কমিউনিটি ক্লিনিকসহ ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভাঙন কবলিত মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছে। গৃহহীন হয়েছে কয়েকশ পরিবার।
এদিকে বন্যাপূর্বাভাস কেন্দ্র জানায়, পর্যবেক্ষণাধীন পানি সমতল ৯০টি স্টেশনের মধ্যে ৩৯টির পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্রাস পেয়েছে ৪৩টির পানি, অপরিবর্তিত ৪টি এবং ২টি পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শ্রাবণের অঝর ধারায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
আরও পড়ুন