Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

শাহজালাল বিমানবন্দরে আতঙ্ক : নিরাপত্তা নড়বড়ে

প্রকাশের সময় : ২১ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:০৩ এএম, ২১ জুলাই, ২০১৬

নেই প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি, বোমা তৈরীর সরঞ্জাম জব্দ, দিনভর তোলপাড়
উমর ফারুক আলহাদী : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে আবারো প্রশ্ন ওঠেছে। দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেই প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি। বিস্ফোরক দ্রব্য শনাক্ত করতে বসানো হয়নি অত্যাধুনিক নিরাপত্তা স্ক্যানিং মেশিন। তবে বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে বিভিন্ন সংস্থার নিরাপত্তা সদস্য। তবে কথিত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও গতকাল পুরো বিমানবন্দরে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক। বিমানবন্দরের কার্গো গেইট দিয়ে বোমা তৈরীর সরঞ্জামাদি খালাসের ঘটনায় গতকাল এ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে দিনভর বিমানবন্দর এলাকায় তোলপাড় চলে। পরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে (আইরিন) বোমা তৈরির সরঞ্জাম সন্দেহে কুরিয়ারের একটি পার্সেল জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দারা।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যন্ত্রপাতিগুলো আধুনিক কিনা তা খতিয়ে দেখতে বলছে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের অভিযোগ এক্সপ্লোসিভ ডিটেক্টর মেশিন কাজ করে না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে নিয়োগ দেয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে রয়েছে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ।
গতকাল বুধবার বিকেলে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহম্মদ সফিউর রহমান জানান, বোমা তৈরীর সরঞ্জাম সন্দেহে একটি চালান জব্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সকালে বিমানবন্দরের কুরিয়ার গেট দিয়ে খালাসের সময় একটি পার্সেল জব্দ করা হয়েছে। ডকুমেন্ট ঘোষণায় এবং শুল্কায়িত ২ দশমিক ৫ কেজির পার্সেলটি সন্দেহজনক হওয়ায় এটি তল্লাশি করা হয়। তিনি আরো বলেন, তল্লাশিতে পার্সেলের ভেতর বিভিন্ন সার্কিট, বোর্ড, ব্রিজ ও তার এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে বহনকারী সিএন্ডএফ এজেন্ট তমা ট্রেডের প্রতিনিধি কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। বিভিন্ন সংস্থার মতামত নিয়ে বোমা তৈরির সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার হতে পারে সন্দেহে পার্সেলটা আটক করে কাস্টমস গুদামে জমা দেয়া হয়।
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, পার্সেলটা গত ৩ জুলাই টিজি-৩২১ নম্বর ফ্লাইটে এসসিএস এক্সপ্রেসের মাধ্যমে শাহজালালের ফ্রেইট ইউনিটে আসে। পণ্যটি ডকুমেন্ট হিসেবে মিথ্যা ঘোষণায় বি/ই দাখিল করে খালাস নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পণ্যটি চট্টগ্রামের একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির নামে আসে। মিথ্যা ঘোষণার বিষয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রহণযোগ্য কোন ব্যাখ্যা না পাওয়ায় সরঞ্জামাদি আটক দেখানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই থেকে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে শুল্ক গোয়েন্দার পক্ষ থেকে সারা দেশের বন্দরসমূহে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ অভিযান ‘আইরিন’ পরিচালনা করছে। বিশেষ করে পার্সেলের মাধ্যমে অবৈধভাবে হাল্কা অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক প্রতিরোধই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। এই অভিযান এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল অন্যান্য দেশেও একযোগে পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্যকে দায়িত্ব দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বিমানযাত্রা কতটা নিরাপদ? আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ যাত্রীর পোশাকে ধাতু অথবা বিপজ্জনক বস্তু শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে বিদেশী একাধিক গোয়েন্দা সংস্থ। কিন্তু তা আজো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গতকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, রেডলাইনকে নিয়োগ দেয়ার পরও নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ আগে যেমন ছিল, তেমনি রয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের অভিযোগগুলোর বিষয়ে শাহজালালের নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ গত কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিমানবন্দরের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে দেখা গেছে, নিরাপত্তাকর্মীরা আগের মতোই স্ক্যান করার সময়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন, মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন, কথা বলেন, অন্য লোকের সঙ্গে গল্প করেন, পত্রিকা পড়েন, খাবার খান।
অন্যদিকে অভিযোগ আছে, রেডলাইন-এর সঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক হিসেবে চুক্তি হলেও প্রতিষ্ঠনিটি শুধুমাত্র লন্ডনভিত্তিক ফ্লাইটের তদারকি করছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ২০ মিনিট স্ক্যান করার পরে ৪০ মিনিট বিশ্রাম নেয়ার নিয়ম থাকলেও লোকবল কম থাকায় একটানা কাজ করছেন সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মীরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে, বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদ-ে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমাদের চেষ্টার ফলেই গত মে মাসে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ আরএ-৩ (ইইউ অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ভ্যালিডেটেড রেগুলেটেড এজেন্ট) হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। মন্ত্রী দাবি করেন, ‘এখন আমাদের বিমান বন্দরের নিরপত্তা আন্তর্জাতিক মানের। তবে এক্সপ্লোসিভ ডিটেক্টর মেশিন এখনো কার্যকর হয়নি। শিগগিরই এটা স্থাপন করা হবে।
গত ডিসেম্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা দেখিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার পথ ধরে যুক্তরাজ্যও গত ৮ মার্চ ঢাকা থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহন বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ গত ২৬ জুন সরাসরি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ করে জার্মানি। তবে এরইমধ্যে যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়া তাদের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে ব্রিটিশ অ্যাভিয়েশনের মতামত ঃ
ব্রিটিশ এভিয়েশনের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিল্লিভিত্তিক লিয়াজোঁ অফিসার জন লাভসে গত নভেম্বরে ঢাকা বিমানবন্দর পরিদর্শনে আসেন। পরিদর্শনের পর তিনি রিপোর্টে জানান, ‘যাত্রীদের সঠিকভাবে স্ক্যানিং করা হয় না এবং মালামাল ট্যাগ করার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। বিমানবন্দরে যারা স্ক্যান করেন, তারা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন, বসে বসে টেলিফোনে কথা বলেন, অন্য লোকের সঙ্গে গল্প করেন, তাদের প্রশিক্ষণ নেই।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী একজন কর্মী ২০ মিনিট স্ক্যান করার পরে তাকে ৪০ মিনিট বিশ্রাম দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে লোকবল কম থাকায় এক বা দুই ঘণ্টা একটানা কাজ করতে হয়।’
গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি আবারও ঢাকায় আসেন জন লাভসে। তখন তিনি তার প্রতিবেদনে বলেন, ‘কার্গো রাখার জায়গায় বেসরকারি ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের লোকেরা কাজ করেন, নিরাপত্তা ট্যাগ লাগানোর মেশিন ব্যবহার করা হয় না এবং কার্গো ওয়ারহাউসের বাইরে মালামাল স্তূপ করে রাখা হয়। বিমানবন্দরে এক্সপেস্নাসিভ ট্রেসিং মেশিনও কাজ করে না। এছাড়া এ সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত লোকদের সুষ্ঠু প্রশিক্ষণও নেই।’ রিপোর্টে বলা হয়, কার্গো রাখার জায়গায় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের বেসরকারি লোকদের সরিয়ে নিতে, নিরাপত্তা ট্যাগ লাগানোর মেশিন ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়া হয় এবং কার্গো ওয়ারহাউসের বাইরে সব মালামাল ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণের জন্য গত ২১ মার্চ যুক্তরাজ্যের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘রেডলাইন অ্যাসিওরড সিকিউরিটি’র সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের। দুই বছরের জন্য রেডলাইনকে ৭৩ কোটি ২৫ লাখ টাকায় নিয়োগ দেয়া হয়।

 

 



 

Show all comments
  • রাশেদ ২১ জুলাই, ২০১৬, ১:০৮ পিএম says : 1
    নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শাহজালাল বিমানবন্দরে আতঙ্ক : নিরাপত্তা নড়বড়ে
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ