Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭, ২২ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

বালা-মুসিবত, তাওবা-ইস্তিগ্ফার ও দোয়া-মোনাজাত

রূহুল আমীন খান | প্রকাশের সময় : ৯ মে, ২০২০, ১২:০৫ এএম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘তোমরা কি এও দেখতে পাচ্ছ না যে, এমন কোনো বছর যায় না, যখন তাদের একবার কিংবা দু’বার বিপদে ফেলা হয়, তথাপি তারা তাওবা করে না এবং বিপদ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে না।’ সুরা তাওবা: ১২৬।
‘তাহলে তারা কি সেই চরম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে যা তাদের ওপর আপতিত হবে? তাই যদি হয় তাহলে তার লক্ষণ তো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তা দেখেও চেতন না হলে তখন তাদের ওপরে সেই মহাবিপদ আসবে, তখন আর কি করার থাকবে। সুরা মুহাম্মদ: ১৮।
মানুষ গুনাহ করবেই, কম হোক আর বেশি হোক, সগীরা হোক কিংবা কবিরা। কেবলমাত্র নবী-রাসূলগণই পাপমুক্ত- মাসূম। তাঁরা আল্লাহর দূত। আল্লাহর বাণী তাদের কণ্ঠ দিয়ে উচ্চারিত হয়। আল্লাহর হুকুম-আহকাম, আদেশ, নিষেধ, করণীয়, বর্জনীয় জানিয়ে দেবার জন্য, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য স্বয়ং আল্লাহই মানব জাতির কাছে তাদেরকে পাঠিয়েছেন। তাদেরকে যদি পাপমুক্ত, গুনাহমুক্ত, ত্রু টিমুক্ত রাখা না হতো তাহলে পুরো দ্বীনই সন্দেহ-সংশয়ের আবর্তে নিক্ষেপিত হতো, তাই তারা মাসূম বা বেগুনাহ। তাঁরা ছাড়া অন্য সকলেই কম-বেশি পাপ করবে। এটাই মানব প্রকৃতি। মানুষের মধ্যে কুপ্রবৃত্তি আছে, এটা সহজাত, আছে মানব জাতির চিরশত্রু শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা, আছে মন্দ পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব, তাই মানুষ পাপ করবে এটাই স্বাভাবিক। ভুলের কারণেই মানুষের জান্নাতচ্যুৎ হওয়া, দুনিয়ায় আসা। আল্লাহপাক তো আদিপিতা আদম ও আদিমাতা হাওয়াকে সৃষ্টি করে, জান্নাতেই রেখেছিলেন। ভুলের খেসারত দেবার জন্যই তাদের এই দুনিয়ায় আগমন। আদম-হাওয়া ভুল করে আল্লাহর হুকুমের খেলাফ করলেন- নিষিদ্ধ ফল গন্দম খেলেন। ভুল বা আদেশ অমান্যের অপরাধ শয়তানও করেছে। সে আল্লাহর হুকুম, নির্দেশ অমান্য করে আদমকে সিজদা না করে পাপ করেছে। তবে আদম আ. ও আজাজিল শয়তানের মধ্যে প্রার্থক্য হলো এই- আদম ভুল বুঝতে পারামাত্র শরমিন্দা হয়েছেন, অনুতপ্ত হয়েছেন, তাওবা করেছেন। খোদার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন, কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করেছেন। বলেছেন, ‘রব্বানা জালামনা আনফুসানা, ওয়ায়িল্ লাম্ তাগফির লানা ও তার হামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসেরীন’- হে আমাদের পরওয়ারদেগার! ‘আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি, আপনি যদি ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন, তবে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব।’ অপরদিকে ইবলিস লজ্জিত না হয়ে, অনুতপ্ত না হয়ে হলো বিদ্রোহী। খোদার সামনে প্রকাশ করল অহঙ্কার। দম্ভভরে বলল, আমি তো আদমের চেয়ে সেরা। আমি আগুনের তৈরি আর আদম হচ্ছে তুচ্ছ মাটির তৈরি। (খোদা তোমার এ আদেশ ঠিক নয়,) উত্তম হয়ে অধমকে আমি সিজদা করতে পারি না। অপরাধ দু’জনারই। একজন তাওবা করার জন্য পেলেন ক্ষমা, লাভ করলেন মহাসম্মান এবং পরকালে লাভ করবেন অনন্ত সুখের জান্নাত। আর একজন হলো মরদূদ-চির অভিশপ্ত ও ঘৃণীত। পরকালীন জিন্দেগীতে ভয়াল ভীষণ জাহান্নামই হবে তার চিরস্থায়ী নিবাস। তাই পাপ করা যেমন আমাদের উত্তরাধিকার, তেমনি তাওবা করা, মার্জনা, ক্ষমা, আল্লাহর করুণা, দয়া ও ভালোবাসা লাভ করাও আমাদের উত্তরাধিকার। আল্লাহ পরম প্রেম ভরে ডাক দিয়ে বলেন, ‘ইয়া ইবাদিয়াল্লাজিনা আছরাফু আলা আনফুসিহিম লা-তাকনাতু মির রহমাতিল্লাহ ইন্নাল্লাহা ইয়াগফিরুজ জুনুবা জামিয়া- হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ- আল্লাহর দয়া অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না, আল্লাহ তোমাদের সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ সুরা যুমার : ৫৩।
‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ কর তোমাদের ওপর শাস্তি আসার পূর্বে। এরপর তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না।’ সুরা যুমার: ৫৪।
তাওবাকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন, ভালোবাসেন, তাওবাকারীর অপরাধ আল্লাহ মার্জনা করেন, এমনি কি তার পাপসমূকে পুণ্যে রূপান্তরিত করেছেন। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ বলছেন, ‘যারা তাওবা করে ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দিবেন পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা ফুরকান: ৭০।
‘আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালোবাসেন।’ সুরা বাকারা: ২২২।
কুরআনুল কারীমে বিভিন্ন সূরায় বহুসংখ্যক আয়াতে আল্লাহপাক তাওবাকারীকে ক্ষমা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ও বেহেশত্ দানের সুসংবাদ দিয়েছেন। তার দয়া ও রহমত থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন।
‘যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।’ ‘সে হচ্ছে- স্থায়ী জান্নাত যে অদৃশ্য বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দয়াময় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন অবশ্যই তারা সেই প্রতিশ্রুত স্থানে পৌঁছবে।’ সুরা মারয়াম: ৬০ ও ৬১।
‘সীমা লঙ্ঘন করার পর কেউ তাওবা করলে ও নিজেকে সংশোধন করলে আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হবেন, আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।’ সুরা মায়িদা: ৩৯।
‘হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর (তাওবা কর) যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ সুরা নূর: ৩১। ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহপাক পাপী বান্দার তাওবায় ওই ব্যক্তির চেয়েও বেশি খুশি হন। যে ব্যক্তি উটের পিঠে খাদ্য পানীয় ইত্যাদি আবশ্যকীয় দ্রব্য বস্তায় বোঝাই করে উত্তপ্ত মরু বিয়াবান পাড়ি দিতে গিয়ে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ল। পথিমধ্যে এক মরুদ্যানে পৌঁছে একটি ছায়ায় উটটিকে রেখে অবসন্ন দেহে সেই ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর জেগে উঠে দেখল উটটি নেই। অস্থির হয়ে সে হারানো উটটিকে খুঁজল বহুক্ষণ। খুঁজে খুঁজে দেহ-মন হলো আরও অবসন্ন। অবশেষে সে গাছের ছায়ায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। হঠাৎ তন্দ্রা কেটে গেলে সে চেয়ে দেখল তার সে হারানো উটটি মাল-সম্ভারসহ তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ওই উট হারিয়ে যাওয়া বেদুঈন তার হারানো উটকে ব-মাল ফিরে পেয়ে যতটা না আনন্দিত হয় কোনো বান্দা যখন গুনাহর কাজ করার পর অনুতপ্ত হৃদয়ে তাওবা করে তখন ময়াময় আল্লাহ তার চেয়েও বেশি খুশি হন।
নবী কারীম ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি প্রত্যহ ৭০ বার তাওবা করে থাকি।’
আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি দিন রাতের মধ্যে ১০০ একশত বার তাওবা করে থাকি’ অথচ সবারই জানা যে, তিনি ছিলেন মাসূম বা বেগুনাহ। আল্লাহপাক তাঁর আগের পাছের সমুদয় গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তথাপিও যখন তার অবস্থা এমন, তখন আমাদের কি করা উচিত। আমাদের উচিৎ, শয়তানের ফেরেবে, কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় অথবা পরিবেশ পারিপর্শ্বিতার কারণে কোনো গুনাহ করে বসলে সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে নেয়া।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পাপ কাজ করে তা থেকে তাওবা করে সে ব্যক্তি এমন নিষ্পাপ হয়ে যায় যেন সে পাপ কাজ করেনি।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, ‘আত্তাহিকু মিনায যানবি কামান লা-যানবা লাহু’ অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তি (খালেস) তাওবা করে সে এমন হয়ে যায় যেন তার কোনো পাপই নেই।’ (মিশকাত)।
আল্লাহর হাবীব ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, আদম সন্তান মাত্রই পাপ করে থাকে, আর পাপীদের মধ্যে তারাই অধিক উত্তম যারা বেশি বেশি তাওবা করে।’ (তিরমিজি, ইবনুমাযা, মিশকাত।
অবশ্যই তাওবা হতে হবে খালিস। কিছু নির্দিষ্ট শব্দের উচ্চারণ শুধু নয়। নিবিষ্ট মনে, গভীর আন্তরিকতা সহকারে, কৃতপাপের জন্য লজ্জিত হয়ে, অনুতপ্ত হয়ে, আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাওয়া, ভবিষ্যতে আর পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা আর তার ওপর অটল অবিচল থাকাই হচ্ছে প্রকৃত তাওবা।
আল্লাহপাক বলেন, ‘আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি যে তাওবা করে, ঈমান আনে, নেক কাজ করে ও সৎপথে অবিচলিত থাকে। সুরা ত্ব-হা: ৮২।
প্রকৃত মুমিনের হৃদয়ে একই সাথে ভয় ও আকাক্সক্ষা বিরাজ করবে। আল্লাহর ক্রোধ, আজাব-গজবের ভয়ে সে যেমন ভীত কম্পিত থাকবে, তেমনি তার রহমত দয়া-করুণা, আশায়-ভরসায় থাকবে আশান্বিত ও প্রসন্ন। গুনাহ হবেই। তবে কর্তব্য হলো, চেতনা আসার সাথে সাথে তাওবা করবে, তাঁর সমীপে বিনীতভাবে প্রার্থনা করে ক্ষমা ভিক্ষা করবে। এখন নয়, পরে তাওবা করব, এ রূপ অবহেলা করতে থাকলে তাওবা আর নসীব হবে না। যথাসময় তাওবা না করে মুমূর্ষু অবস্থায় অনুশোচনা করলে তা কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহপাক বলেন, ‘তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে এবং তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে বলে, আমি এখন তাওবা করছি এবং তাওবা তাদের জন্যও নয় যারা মারা যায় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা, যাদের জন্য আমি মর্মন্তুদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।’ সুরা নিসা: ১৮। (ক্রমশঃ)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ