Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১ হিজরী

সারাদেশে ১৭৬১ অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং যেন মৃত্যুফাঁদ

অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন ধূমকেতুর ১২শ’ যাত্রী, বিদ্যুতের পোলবাহী ট্রাকের সাথে ধাক্কা লেগে দুমড়ে-মুচড়ে গেল ইঞ্জিন

প্রকাশের সময় : ২২ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নূরুল ইসলাম : রাত তখন ৪টার মতো। ৭২ কিলোমিটার গতিবেগে ছুটছে রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী ধূমকেতু এক্সপ্রেস। অধিকাংশ যাত্রী তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মির্জাপুর রেলস্টেশন অতিক্রম করার পর কালিয়াকৈর আইসিটি পার্কের কাছাকাছি এলে বিকট শব্দে যাত্রীদের ঘুম ভেঙে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে দাঁড়িয়ে যায় ট্রেনটি। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যাত্রীরা কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। পরে জানতে পানে ট্রেনটি বিদ্যুতের পোলবাহী একটি ট্রাকের সাথে ধাক্কা লেগেছে। ট্রাকটি ছিটকে পড়েছে। দুমড়ে-মুচড়ে গেছে ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনের অংশ। ওই ট্রেনের একজন যাত্রী জানান, এলএইচবি কোচের ট্রেন বলে হয়তো গতিবেগ বেশি থাকার পরেও ট্রেনের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তা না হলে ট্রেনের প্রায় ১২শ’ যাত্রীর জীবন বিপন্ন হতে পারত। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন ট্রেনের লোকোমাস্টার (এলএম)। সারাদেশে ১৭৬১টি অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংয়ে প্রতিনিয়ত এরকম দুর্ঘটনা ঘটছে। রেলের মোট ২ হাজার ৫৪১টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২৪২টিতে (গেটকিপার) রক্ষী আছে। সব মিলিয়ে ২ হাজার ২৯৯টি লেভের ক্রসিংয়ে কোনো রক্ষী নেই।
সারা দেশে ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথের ওপর দিয়ে গেছে প্রায় ৫০ হাজার সড়কপথ। এসব পথে লেভেল ক্রসিং আছে ২ হাজার ৫৪১টি, যার মধ্যে অনুমোদিত ক্রসিংয়ের সংখ্যা মাত্র ৭৮০টি। অনুমোদনহীন ১ হাজার ৭৬১টি। আবার ৭৮০টি অনুমোদিত ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ২৪২টিতে রক্ষী আছে। ৫৩৮টি অনুমোদিত ক্রসিংয়েই রক্ষী নেই। অর্থাৎ অরক্ষিত আছে ২ হাজার ২৯৯টি লেভেল ক্রসিং। এসব লেভেল ক্রসিংয়ে প্রায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রেল তথা দেশের সম্পদ। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২ হাজার ৫৪১টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৩৬৫টি (ইঞ্জিন) ক্রসিং এবং ৪১৫টি (ট্রাফিক) ক্রসিং। এর মধ্যে অনুমোদিত ক্রসিংয়ের সংখ্যা ৭৮০টি এবং অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬১টি।  ৩৬৫টি ইঞ্জিন ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ১৫২টিতে (গেটকিপার) আছে। ৪১৫টি ট্রাফিক ক্রসিংয়ে রক্ষী আছে মাত্র ৯০ জন। সে হিসাবে রেলের মোট ২ হাজার ৫৪১টি লেভেল ক্রসিংয়ে বর্তমানে মাত্র ২৪২টিতে রক্ষী আছে। অনুমোদনহীন এবং অরক্ষিত রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে দুর্ঘটনার হার বাড়ছে। অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংগুলো  নির্মাণ করেছে বিভিন্ন সংস্থা। এর মধ্যে এলজিইডি ৪৭০টি, সড়ক ও জনপথ ১২টি, ইউনিয়ন পরিষদ ৫০৫টি, পৌরসভা ৮৪টি, সিটি কর্পোরেশন ৩৬টি, চট্টগ্রাম বন্দর ৩টি, বেনাপোল স্থলবন্দর ১টি। বাকিগুলো মানুষের তৈরি, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সূত্র জানায়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যখন কোনো নতুন লাইন চালু করে তখন প্রয়োজন অনুযায়ী লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করে এবং রক্ষী নিয়োগ করে থাকে। কিন্তু রেলকে না জানিয়ে বা অনুমোদন না নিয়ে যত্রতত্র এলজিইডি, সড়ক ও জনপদ, ইউপি, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনসহ প্রয়োজনে প্রাইভেট পর্যায়ে রেলের ওপর দিয়ে ক্রসিং বানানো হয়েছে। যা রেলওয়ের আইনে কেউ করতে পারে না। এসবের জন্য বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত রেলওয়ের পক্ষ থেকে করা শতাধিক মামলা যা বিচারাধীন রয়েছে। সূত্র জানায়, দেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে মোট ৩২৬টি করে ৬৫২টি অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং অনুমোদিত করা ও জনবল নিয়োগের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ কোটি টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পূর্ব ও পশ্চিম রেলের অন্তত ৫৫২টি লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঝুঁকি কমবে। রেলওয়ের পরিচালক (ট্রাফিক) সৈয়দ জহিরুল ইসলাম জানান, স্থানীয় সরকার ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা রেলওয়ের অনুমোদন না নিয়েই লেভেল ক্রসিং তৈরি করেছে। আবার যেগুলোর অনুমোদন আছে, সেগুলোর সবগুলোতে রক্ষী নেই। কোথাও স্থায়ী কর্মী থাকলেও কোনো কোনো ক্রসিংয়ে অস্থায়ী কর্মী দিয়ে চালানো হচ্ছে।
আলাপকালে রেলওয়ের দুই জোনের লোকোমাস্টাররা  (ট্রেনের চালক) জানান, লেভেল ক্রসিং না থাকার কারণে তাদেরকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চালাতে হয়। একজন চালক বলেন, ট্রেনের গতি কোন স্থানে কত হবে, তা মোটামুটি নির্ধারণ করে দেয়া আছে। সুতরাং ওই গতিতেই আমরা চালাতে বাধ্য। কিন্তু মাঝপথে অরক্ষিত লেভেলক্রসিংগুলোর কারণে আমরা গতি কমাতে বাধ্য হই। কখনও কখনও হাতে সময় না থাকলে দ্রুতগতিতেই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং পার হতে হয়। এতে করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকেই।  রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে,  ট্রেন ভ্রমন নিরাপদ করার জন্য লেভেল ক্রসিংগুলোতে কর্মী নিয়োগের বিকল্প নেই। কারণ সড়কগুলোতে বেপরোয়াভাবে যানবাহন চলাচল করে এটা সবারই জানা। সেই বেপরোয়া বাস বা গাড়ি চালকদের কথা মাথায় রেখে লেভেল ক্রসিংগুলোতে গেটকিপার নিয়োগ করা জরুরি। তা না হলে একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত তিন বছরে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৭৩টি। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত আড়াই বছরে ৩৫টি যাত্রীবাহী, ১১৫টি মালবাহী ট্রেননসহ ১৫০টির অধিক ছোট-বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে অকার্যকর সিগন্যাল ব্যবস্থা, লেভেল ক্রসিংয়ের অব্যবস্থা এবং চালকের সিগন্যাল অমান্য করাকে দায়ী করা হয়। এ ছাড়া দায়িত্বহীন গেটম্যান লেভেল ক্রসিংয়ের গেট বন্ধ না করার কারণে রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ ঘটে। বুধবার দিবাগত রাতে কালিয়াকৈর আইসিটি পার্কের বাউন্ডারির বাইরে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো রক্ষী নেই। এ কারণেই একটি বিদ্যুতের পিলারবাহী ট্রাকের সাথে ধুমকেতু এক্সপ্রেসের ধাক্কা লাগে। ফেনীতেও একটি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে গতকাল একটি মালবাহী ট্রেনের সাথে ট্রাকের সংঘর্ষ ঘটে। তবে ট্রেনের ইঞ্জিন উল্টে চালক আহত হন। এতে করে ঢাকা চট্টগ্রাম রুটে বেশ কয়েক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। ট্রেন চালকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এর আগেও একই স্থানে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিম জোন ফেসবুকে এই লেভেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগের জন্য বেশ কয়েকটি পোস্ট দেয়া হয়। ওই ফেসবুকের অ্যাডমিন বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, ধূমকেতুর লোকোমোটিভের অবস্থা দেখে সহজেই বোঝা যায়, লোকোমাস্টার প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। রক্ষা পেয়েছেন ট্রেনে প্রায় ১২শ’ যাত্রী। আমরা এই লেভেল ক্রসিংয়ে অবিলম্বে একজন গেটম্যান নিয়োগ ও সিগনাল বসানোর দাবি জানাচ্ছি।
 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ