Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

টিকাযুদ্ধ বদলে দিতে পারে বিশ্বের ক্ষমতার রাজনীতি

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ২২ মে, ২০২০, ১২:০৫ এএম

পৃথিবীতে দুর্লভ জিনিসেরই দাম বেশি। এর পেছনেই মানুষ হন্যে হয়ে ছোটে এবং তা পাওয়ার জন্য যুদ্ধ পর্যন্ত করে। যেমন সোনা, হীরা, প্লাটিনামসহ খনিজ সম্পদ। এমনকি অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রের পেছনেও ছোটে। অস্ত্রের মালিক হওয়া বা সংগ্রহ করার বিষয়টি দুর্লভ তো বটেই, কষ্টসাধ্যও। এজন্য অনেক ধাপ ও পরীক্ষা দিতে হয়। ইচ্ছা করলেই কেউ এমনি এমনি রাখতে পারে না। এটি যদি দুর্লভ না হতো বা সহজলভ্য হতো, তাহলে বোধকরি, অনেকেই একটা করে অস্ত্র সংগ্রহে রাখত। এই অবাধ সুযোগ বিশ্বের কোনো দেশেই নেই। তবে ক্ষমতাধর দেশগুলো তাদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি এবং অন্যদেশের একই শক্তি বৃদ্ধিতে অস্ত্র বিক্রি বা ব্যবসা করে থাকে। এ ব্যবসা এক দেশের সাথে আরেক দেশের হয়। মূলত অস্ত্র ব্যবসা যেমন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ ব্যবসা, তেমনি ক্ষমতারও প্রতীক। ফলে পরাশক্তির দেশগুলোর মধ্যে এ নিয়ে বেশ প্রতিযোগিতা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ক্ষমতার দ্ব›দ্ব নিয়ে মানসিকযুদ্ধ শুরু হয়, যাকে বলে স্নায়ুযুদ্ধ। অর্থাৎ একে অপরকে আক্রমণের জন্য দেশ দুটি মনে মনে ফুঁসতে থাকে। এজন্য নানা রণকৌশল থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কার ও মজুদ করতে থাকে। কার কত অস্ত্র মজুদ আছে এবং কার অস্ত্রের জোর কত, ধারাবাহিকভাবে তার বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দেশগুলো নিত্য নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কার করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে দেখে এর কার্যক্ষমতা কতটুকু। তবে আশির দশকের শেষের দিকে এই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়েনের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্ভাচেভের পেরেস্ত্রইকা নীতির কারণে সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক পরাশক্তির দেশ হয়ে পড়ে। তার প্রতিদ্ব›দ্বী বলে তেমন কেউ আর থাকে না। ইউরোপের ধনাঢ্য দেশগুলো তার লেজুড়বৃত্তি করে দলভুক্ত হয়। রাশিয়া ক্ষয়ীষ্ণু শক্তি নিয়ে ধুঁকতে থাকে। ক্ষমতা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে যা খুশি তা করা শুরু করে। নানা উছিলায় একে আক্রমণ করে, ওকে মারে-এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে। এক ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে স্বৈরশাসক আখ্যা দিয়ে বা তার কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে-এই উছিলায় রাতারাতি হামলা চালিয়ে পুরো ইরাককে তছনছ করে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নীর মধ্যকার দ্ব›দ্ব উসকে দিয়ে রক্তাক্ত যুদ্ধের সূচনা করে। নানা অজুহাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধবিগ্রহ লাগিয়ে দেয়। ইরাকের পর লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফীকেও একই অজুহাতে হত্যা এবং দেশটিকে লন্ডভন্ড করে দেয়। সিরিয়ায় নানামুখী যুদ্ধ লাগিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। আফগানিস্তানেও একই কান্ড করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এসব কাজ করেছে শুধুমাত্র তার স্বার্থ আদায় এবং বিশ্বে তার একক ক্ষমতা জাহির করার জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ করছে বা লাগিয়ে রেখেছে, তার নেপথ্যের কারণ হচ্ছে, সেখানের তেল নিয়ে যাওয়া, নিয়েছেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব অঞ্চলে যুদ্ধ লেগে আছে, তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ রয়েছে। এই মদদ দিচ্ছে, যুদ্ধরত দলগুলোর কাছে তার অস্ত্র বিক্রি করার জন্য। এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার ক্ষমতা ধরে রাখছে। তবে কাল পরিক্রমায় রাশিয়া একটু একটু ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও এখন মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি বা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দেয়ার মতো শক্তি অর্জন করেনি। এর মধ্যেই চীন আবির্ভূত হয় বিশ্বের বিস্ময় হিসেবে। চীন কোনো অস্ত্রবাজি বা অস্ত্রের জোরে নয়, প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। চীন সূচনা করে নতুন একযুদ্ধ, যাকে বলে ইকোনোমিক ওয়ার বা অর্থনৈতিক যুদ্ধ। অর্থনীতিতে সব দেশকে ছাড়িয়ে কত দ্রুত এগিয়ে যাওয়া যায়, তার রেস শুরু করে দেয়। দেখা গেল, অর্থনীতির এ রেস অস্ত্রের ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী। এমনকি যে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রবাণিজ্যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ, তাকেও বিভিন্ন পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়েছে। অর্থাৎ অস্ত্রের চেয়ে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা বেশি এবং শক্তিশালী। কারণ অর্থ থাকলে অস্ত্র থেকে শুরু করে সবকিছুই কেনা যায়। চীন এই অর্থযুদ্ধের নীতি নিয়ে আবির্ভূত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে দাঁড়ায় চীন। শুধু অর্থের দিক থেকেই নয়, অস্ত্রের দিক থেকেও চীন প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ইরান, উত্তর কোরিয়াসহ তার কথা শোনে না এমন দেশগুলোকে অবরোধ দিয়ে নাকে দড়ি লাগিয়ে ঘুরাতে পারলেও চীনের সাথে সে কোনো দিক দিয়ে পেরে উঠতে পারছে না। মাঝে চীনের ওপর ক্ষুদ্ধ হয়ে পণ্যের শুল্কহার বৃদ্ধি এবং নিষিদ্ধও করে। তাতে দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রই অসুবিধায় পড়ে গেছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন বাধ্য হয়েই সেই শুল্ক ও অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের এখন মাথা ব্যথার কারণে হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। তাকে কোনোভাবেই কাবু কিংবা আয়ত্তে রাখতে পারছে না।

দুই.
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেই মহামারী হয়ে দেখা দিয়েছে করোনাভাইরাস। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে এবং প্রতিদিনই মরছে। আক্রান্তও হচ্ছে বেশুমার। চীনের উহান থেকে প্রথম এ ভাইরাসের উৎপত্তি ঘটে। তবে কীভাবে, কোত্থেকে এর উৎপত্তি তা অজানাই থেকে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, উহানের বাজারে বিষাক্ত যেসব প্রাণীর গোশত বিক্রি করা হতো সেখান থেকে কিংবা বাদুর থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে। ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। মুহূর্তেই একজনের কাছ থেকে অসংখ্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর সংক্রমণে পুরোবিশ্ব দিশাহারা হয়ে পড়েছে। শুরুতে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বুঝতেই পারেনি, এ ভাইরাস কিভাবে মোকাবেলা করা হবে। এ প্রস্তুতিও তাদের ছিল না। বুঝতে বুঝতে সময় লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত বোঝা গেল, এ থেকে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন এবং বৃহৎ পরিসরে লকডাউন করা। অর্থাৎ কারো সাথে কারো কোনো ধরনের সংস্পর্শে আসা যাবে না। কথা বলতে হলেও, মুখে মাস্ক, হাতে গ্ভসসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী বা পিপিই সমৃদ্ধ হয়ে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলতে হবে। তবে অসামাজিক অবস্থা থেকে শত-সহস্র বছর ধরে মানুষের সামাজিক হয়ে ওঠার ধারা তো নিমিষে বন্ধ করে দেয়া যায় না। একজনের সাথে আরেকজনের দেখা-সাক্ষাৎ, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, বেড়াতে যাওয়া, বাজার সদাই করাসহ বিভিন্ন সমাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার মতো চিরায়ত সামাজিক প্রথা থেকে হুট করে দূরে সরানো চাট্টিখানি কথা নয়। ফলে উন্নত বিশ্বসহ করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোতে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারফিউর মতো লকডাউন করতে হয়। বিভিন্ন মেয়াদে অফিস-আদালত, দোকানপাট, যানবাহন চলাচল বন্ধ থেকে মানুষের ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ করতে হয়। আমাদের দেশেও সাধারণ ছুটির নামে অঘোষিতভাবে লকডাউন করা হয়। তবে এ লকডাউন সবাইকে মানানো অত্যন্ত কঠিন। বিভিন্ন উছিলায়, ফাঁক-ফোকর দিয়ে মানুষ বের হয়েই যায়। এজন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপও নিতে হয়। বিনা কারণে ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য জরিমানাসহ গ্রেফতার করা হয়। এ লকডাউনের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এখন ভেঙ্গে পড়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে অর্থনীতির এমন দুর্দশা আর কখনো হয়নি। যে তেলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধ লাগিয়ে কিংবা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তার দেশেই সেই তেলের দাম ব্যারল প্রতি শূন্য ডলারে নেমে আসে। আর করোনাকে শুরুতে ট্রাম্প খুব একটা গুরুত্ব দেননি, যার ফলে তেমন প্রস্তুতিও নিতে দেখা যায়নি। যখন আক্রান্ত ও মৃতের হার অস্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন দৌড়েও কূল পায়নি। বিশ্বের মধ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্র করোনায় মৃতের দিক থেকে শীর্ষে। লকডাউন করেও এই মৃতের সংখ্যা কমাতে পারেনি। তবে দুই মাস পর করোনার ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেই অর্থনীতির ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ট্রাম্প সীমিত পরিসরে লকডাউন তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, বৃহত্তর স্বার্থে কিছু মানুষকে মরতে হবে। তার এই অমানবিক কথা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই সমালোচনা হচ্ছে। তবে বিশ্বব্যাপী করোনার তান্ডবের মধ্যেই বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীরা দলবেঁধে এর প্রতিষেধক আবিষ্কারে দিন-রাত গবেষণা করা শুরু করে। জানুয়ারির শুরু থেকেই এই গবেষণা গতি লাভ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য মতে ইতোমধ্যে শতাধিক প্রতিষেধক উদ্ভাবিত হয়েছে। তবে সবগুলোর প্রয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়নি বা প্রয়োগ করার মতো অবস্থার মধ্যে নেই। এর মধ্যে সাতটির মতো টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলকভাবে মানবদেহে প্রয়োগ করা হয়েছে। গত ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি গিলিয়েড সায়েন্স-এর উদ্ভাবিত রেমডিসিভির ভেকসিন ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক ফার্ম সোরেন্টো সুস্থ মানুষের দেহে করোনা শতভাগ প্রতিহত করে এমন অ্যান্টিবডি অবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের আবিষ্কৃত এসটিআই-১৪৯৯ নামের অ্যান্টিবডি ৪ দিনেই শতভাগ কাজ করবে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রে স্টেম সেল থেরাপির প্রয়োগ করা হয়েছে। ভারতে সুস্থ হওয়া করোনা রোগীর শরীরের অ্যান্টিবডি নিয়ে প্লাজমা থেরাপি পরীক্ষা করে সাফল্যের দাবী করেছে। এদিকে ইটালি করোনার কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরির দাবি করেছে। ইটালির টাকিস নামের একটি কোম্পানি এই ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। বলা হচ্ছে, এটি করোনাভাইরাস ধ্বংসে সফল হয়েছে। এছাড়া জার্মান, ফ্রান্সসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো করোনার দ্রুত ভ্যাকসিন উৎপাদনে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত যে কোনো রোগের টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে এক যুগেরও বেশি সময় লেগে যায়। কারণ ভ্যাকসিনটি আবিষ্কার করে তা কতটা কার্যকর এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি, তা পরীক্ষা করা হয় সাধারণত ইঁদুর বা অন্য কোনো প্রাণীর ওপর। শুরুতে এসব পরীক্ষা ব্যর্থ হতে পারে, আবার কার্যকরও হতে পারে। কার্যকর হলে সময় নিয়ে বারবার পরীক্ষা করে মানবদেহে প্রয়োগের উপযোগী করা হয়। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তা প্রতিরোধে এর এন্টিডটস কি হতে পারে, তাও আবিষ্কার করা হয়। এভাবে একটি ভ্যাকসিন মানুষের উপযোগী হয়ে বাজারে আসতে একযুগের বেশি সময় লেগে যায়। তবে করোনার দ্রুতগতি এবং এর কোনো প্রতিষেধক না থাকায় বিপাকে পড়ে গেছে মানুষ। গবেষকরাও তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিষেধক আবিষ্কারে সক্ষম হচ্ছে না। কারণ গবেষণা শুরু করতেই তো অনেক বছর লেগে যায়, সেখানে এই মুহূর্তে প্রয়োজন এমন প্রতিষেধক পুরোপুরি অসম্ভব। তারপরও গবেষক ও বিজ্ঞানীরা করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারে দিন-রাত এক করে ফেলেছেন। যে কাজ করতে একযুগের অধিক সময় লাগে, সে কাজ তারা গত পাঁচ মাস ধরে করছেন এবং এর মধ্যে শতাধিক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন। যদিও সেগুলোর কার্যকারিতা এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।


তিন.
করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কার নিয়ে বিশ্বব্যাপী তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে। পাশাপাশি ক্ষমতার যুদ্ধও শুরু হয়েছে। এ প্রতিযোগিতা মূলত শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে। এ যুদ্ধকে বলা যায়, ‘টিকাযুদ্ধ’। কারণ যে দেশ করোনার প্রথম কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার করতে পারবে, সে দেশ এ টিকা নিয়ে বিশ্বে ছড়ি ঘোরাতে পারবে। তার কাছে পুরোবিশ্ব জিম্মি হয়ে পড়বে। দেশটি তখন এর মাধ্যমে বাণিজ্য শুরু করবে এবং বিনিময়ে তার স্বার্থ আদায় করে নেবে। এ যুদ্ধ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা তড়িঘড়ি করেই রেমডিসিভি নামে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু করে দিয়েছে। শুরুতে এর ফলাফল খুব বেশি ইতিবাচক বলে ঘোষণা করা হয়নি। কয়েকদিন পর ঘোষণা করা হয়েছে, এটি গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য খুবই কার্যকর এবং এটি ১১ দিনের মধ্যে রোগীকে সুস্থ করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রশাসন এফডিএ তার অনুমোদনও দিয়ে দেয়। এদিকে চীনও করোনার কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে ফেলেছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে তা মানুষের মধ্যে প্রয়োগ শুরু করেছে। তবে অন্যদেশের ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে যত মাতামাতি হচ্ছে, চীনেরটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই নেই। চীনও চুপচাপ রয়েছে। এখানেই চীনের সূক্ষ্ম কূটনীতি বা কৌশল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যেহেতু চীনেই এই ভাইরাসের প্রথম উৎপত্তি এবং তারা সংগ্রাম করে এ থেকে মুক্ত হয়েছে, তাই এ রোগের চরিত্র সম্পর্কে তার সবচেয়ে বেশি জানার কথা। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও চীন সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। ফলে তার পক্ষেই সম্ভব করোনার কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার করা। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রও ভাল করেই জানে। ফলে চীনকে দমানোর জন্য ইতোমধ্যে ট্রাম্প বলেছেন, করোনার উৎপত্তি চীনের ল্যাবরেটরি থেকে। চীন এটা তৈরি করেছে এবং এর প্রমাণের দলিল তিনি দেখেছেন। যদিও ইউরোপসহ বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ট্রাম্পের এ দাবীর পক্ষে একমত নয়। তারা সরসরিই বলেছে, এতে চীনের কোনো হাত নেই। এটি বাদুড় বা বনরুই জাতীয় প্রাণী থেকে ছড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মনে করছে, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন অন্যান্য যেসব দেশ আবিষ্কার করছে, তাদের আবিষ্কারের ফর্মুলা চীন হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি করতে পারে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা দেশগুলোর চিকিৎসক থেকে শুরু করে গবেষকদের সতর্ক করে দিচ্ছেন। বোঝা যাচ্ছে, করোনার উৎপত্তি নিয়ে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের দায়ী করা এবং এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে চীনের প্রতি নানামুখী দায় চাপানোর মধ্যে বিশ্বরাজনীতির নতুন উপাদান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই চাচ্ছে না, চীন করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বজুড়ে রাজত্ব শুরু করুক। যদি তাই হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সবদেশ চীনের এই ভ্যাকসিন ও টিকার রাজনীতি বা যুদ্ধের শিকার হবে। বিশ্বশক্তির ভারসাম্য বিনষ্ট এবং এককেন্দ্রিক হয়ে পড়বে। তখন এই এক ভ্যাকসিন থেকে বিশ্বরাজনীতির মোড় অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে। যুদ্ধটা যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে, তাই এই দুই দেশই চাইবে সবার আগে করোনার ভ্যাকসিন ও টিকা আবিষ্কার করে বিশ্বনেতৃত্ব হাতের মুঠোয় নিতে।


চার.
বলা যায়, চীনের নীরব অথচ কার্যকর করোনা ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কারের আশঙ্কাকে সামনে রেখেই যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা তাড়াহুড়ো করে রেমডিসিভির ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিবডি মানুষের ওপর প্রয়োগ করা শুরু করেছে। এটি এমন এক সময়, যখন ডুবন্ত মানুষ বেঁচে থাকার আশায় খড়কুটো আঁকড়ে বেঁচে থাকতে চাইছে। সারাবিশ্বের মানুষের এমন ডুবন্ত সময়টিকেই যুক্তরাষ্ট্র বেছে নিয়েছে। ভ্যাকসিন রেমডিসিভির প্রয়োগের অনুমোদন দিয়ে নেতৃত্ব নিজের হাতে রাখতে চাইছে। বলা যায়, টিকাযুদ্ধের সূচনা যুক্তরাষ্ট্র আগেভাগেই শুরু করে দিয়েছে। অন্যদিকে চীন নীরবে তার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মতো। যদি রেমডিসিভির তড়িঘড়ি প্রয়োগ পুরোপুরি কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত না হয় এবং চীনের ভ্যাকসিন পরে এসে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠে, তাহলে বলা যায়, এ যুদ্ধে চীনই জয়ী হবে। তখন শুরু হবে আসল ‘টিকাযুদ্ধ’, যা পুরোবিশ্বের ক্ষমতা এবং রাজনীতি বদলে দেবে। তবে এখন সবার আগে প্রয়োজন একটি কার্যকর ভ্যাকসিন বা টিকা, যাতে মানুষ আশ্বস্থ হয় এবং আরোগ্য লাভ করে।
darpan.journalist@gmail.com



 

Show all comments
  • Forex Man ২২ মে, ২০২০, ১:০৩ এএম says : 0
    দারুন একটা আর্টিকেল।ধন্যবাদ লেখককে।
    Total Reply(0) Reply
  • তোফাজ্জল হোসেন ২২ মে, ২০২০, ১:০৭ এএম says : 0
    অদৃশ্য শক্তি না বলে মাইস্ক্রোস্কপিক শক্তি বলা ভালো। আর নৈতিকভাবে মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই সমস্যায় রয়েছে। তবে পৃথিবীর মানুষকে একজনের ভাত আট জন মিলে খেতে হবে এটা শিওর। পূর্ব দেশই ক্ষমতায় আসবে। আসল কথা ভাবলে কোন কাজ হবে না সৃষ্টির বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি ভয়াবহ হতেই থাকবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Saimon Hossain ২২ মে, ২০২০, ১:০৭ এএম says : 0
    ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলের উপদেষ্টা নাথালি টোকি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক ক্ষমতা যেমন সুয়েজ সমস্যার কারণে কমে গিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য করোনাভাইরাস সেই “সুয়েজ মুহূর্ত” ফিরিয়ে আনতে পারে।’
    Total Reply(0) Reply
  • Mahbub Bosunia ২২ মে, ২০২০, ১:০৮ এএম says : 0
    চীন যেভাবে বানিজ্য পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে তাতে মনে হয় খুব অল্প দিনেই আমেরিকাকে পিছনে ফেলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
    Total Reply(0) Reply
  • Anwar Hossain ২২ মে, ২০২০, ১:০৮ এএম says : 0
    চীন বা যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক না কেন বাংলাদেশ বড় ক্ষতির মুখে পড়বে এটা অনেকটা নিশ্চিত। কিন্তু করনীয় নির্ধারনে সর্বদলীয় বিশ্লেষণধর্মী কমিটি গঠন করে পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যনিধারনী ঠিক করা জরুরী।
    Total Reply(0) Reply
  • Nurur Rahman ২২ মে, ২০২০, ১:০৮ এএম says : 0
    ‘অদৃশ্য এক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের’ মধ্যে আছে পুরো বিশ্ব´--------- অদৃশ্য কোন শক্তি কি করে হবে? এটা একটা ভাইরাস মাত্র ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরিস্কার দেখা যাবে। এর জেনেটিক কোড ইতিমধ্যে উন্মোচিত হয়ে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী গুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এটা কোন শক্তির আধার নয়, শুধুমাত্র রোগের আঁধার। আপ্নারা আগে ভাগে প্রস্তুতি নেন নি সেজন্য আপ্নাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বেশি। যারা আগে ভাগে প্রস্তুতি নিয়েছেন যেমন ভিয়েতনাম দক্ষিণ কোরিয়া তাইওয়ান জার্মানি তাদের কিন্তু তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
    Total Reply(0) Reply
  • Akbar Ali ২২ মে, ২০২০, ১:০৯ এএম says : 0
    পৃথিবীর নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব এই মুহূর্তে করোনার হাতে। ওর কর্তৃত্ব কবে শেষ হবে এখনও কেউ জানে না। ওর পালা শেষ হলে, যাকে যে অবস্থায় রেখে যাবে সেখান থেকেই সে দৌড় শুরু করবে। তখন ক্ষমতার নূতন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। সক্ষমতার বিচারে মানদন্ড হবে নৈতিক ও মানবিক দিকগুলো, করোনার প্রাক্কালে যেগুলি সবচেয়ে বড় অবক্ষয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। নেতৃত্ব নির্ধারণে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হবে বস্তুগত উপায় উপকরণ ব্যবহারে দক্ষতা।
    Total Reply(0) Reply
  • Abdul Haque ২২ মে, ২০২০, ১:০৯ এএম says : 0
    আমার মনে হয় ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে থাকা চীন আরও এগিয়ে যাবে দূর্বার গতিতে। অর্থনীতি শক্তিশালী হবে ঈর্ষণীয় মাত্রায়। বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রন থাকবে চীনের হাতে।
    Total Reply(0) Reply
  • মানিউল ইসলাম ২৩ মে, ২০২০, ৭:৫০ পিএম says : 0
    চমৎকার লিখনি ও উপস্থাপনা। মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত উপমহাদেশ নিয়ে কিছু আর্টিকেল লিখার অনুরোধ রইলো। ধন্যবাদ
    Total Reply(0) Reply
  • TAWHID MOLLAH ২৭ মে, ২০২০, ১:৪৯ পিএম says : 0
    সময় উপযোগী প্রতিবেদন। ধন্যবাদ স্যার।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: টিকাযুদ্ধ
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ