Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭, ১০ সফর ১৪৪২ হিজরী

ফিতরার আর্থসামাজিক দিক: আসুন এখনই ফিতরা দিয়ে দেই

উবায়দুর রহমান খান নদভী | প্রকাশের সময় : ২৩ মে, ২০২০, ২:০৬ পিএম

সদকাতুল ফিতর,জাকাতুল ফিতর,ফিতরা একই বিষয়। এটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ওপর ফরজ করেছেন। উদ্দেশ্য বলেছেন, ১.রোজাদারদের ত্রুটি বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ ও সওমকে পবিত্র পরিচ্ছন্ন করা। ২. অভাবী মানুষকে খাদ্যসাহায্য প্রদান।

বলেছেন, এটি নারী পুরুষ ছোট বড়ো সবার পক্ষে আদায় করতে হবে। পরিবারের প্রধান তার পোষ্যবর্গের তরফ থেকে এই সদকা আদায় বা প্রদান করবেন। এমনকি ঈদের রাতে জন্ম নেয়া শিশুটির পক্ষ থেকেও অভিভাবক তার ফিতরা দিবেন।

ফিতরা ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে দিতে হয়। যেন ঈদের দিন কোনো মানুষকে খাদ্যের অভাবে কষ্ট করতে না হয়। অনেকের মতে, এটি আরো আগে দিয়ে দিলেও কোনো সমস্যা নেই। রমজানের মধ্যেও অগ্রিম ফিতরা দেওয়া যায়। বর্তমান সময়ে বরং আগে আগে দিয়ে দেওয়াই ভালো।

প্রসঙ্গত আরেকটি মাসআলা বলে রাখা যায়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কয়েকটি খাদ্য দিয়ে সদকাতুল ফিতর দেওয়ার বিধান দিয়েছেন, এসব দেওয়ার চেয়ে যদি এসবের সমমূল্যের টাকা বা প্রাপকের চাহিদা অনুযায়ী অন্য কিছু দেওয়া হয়, তাহলেও ফিতরা আদায় হবে।

যেমন কেউ বললো, আমাকে আটা বা গম না দিয়ে টাকা দিয়ে দিন অথবা বললো, জামা কাপড় দিয়ে দিন। এটা শরীয়তের উদ্দেশ্য ঠিক রেখে গরীবের জন্য বেশী উপকারী পন্থা বেছে নেওয়ার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। সাহাবীদের সমর্থন এবং তাবেয়ী ও সোনালী যুগের অনেকে এমন মত দিয়েছেন বলে শরীয়াসংশ্লিষ্ট কিতাবে পাওয়া যায়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, খেজুর, খুরমা, কিশমিশ, মনাক্কা, পনির, যব, গম, আটা বা ছাতু এক সা´ পরিমাণ প্রতিজনের সদকাতুল ফিতর। মদীনা শরীফে ঈদের দিন সকালে অভাবী মানুষের জন্য তৈরি খাবার হিসাবে এসব যেমন ছিল সহজপ্রাপ্য, তেমনি দুনিয়ার সব এলাকায় বলতে গেলে এ ক´টি বস্তুই সাধারণ খাদ্য।

মানুষের প্রধান খাদ্য হিসাবে ওআইসির ফিকাহ কমিটি চাউলকেও ফিতরার স্টান্ডার্ড ধরে ফতওয়া দিয়েছে। যারা টাকা দিলে ফিতরা আদায় হবে না বলে মত দেন, তারা আবার চাউলের মাসআলাটি মেনে নিয়েছেন। এটি এলাকার প্রধান খাদ্য হওয়ার যুক্তিতে।

তবে অনেক আলেম চাউলকে স্টান্ডার্ড হিসাবে কবুল করেন না, তারা বলেন চাউল দিয়ে দেওয়া যাবে, তবে হাদীসে বর্ণিত দ্রব্যের মূল্য আকারে, অনেকটা টাকা পয়সার মতো। অথচ এটি আধুনিক সময়ের ফতওয়া। আর টাকা তথা দিনার দিরহাম বা কাপড় দিয়ে ফিতরা দেওয়া সোনালী যুগের ফতওয়া।

টাকার মতো চাল ডাল ইত্যাদি দিয়েও সদকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে। অথবা সরাসরি অন্যান্য দ্রব্যের মতো চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করা যাবে। এ নিয়ে দুটি মত আছে। ১. দুনিয়ার বহুদেশের প্রধান খাদ্য হিসাবে একদল আলেমের গবেষণার আলোকে এখন সউদী আরবসহ কয়েকটি আরবদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার ফিতরার তালিকায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম চালের কথাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিজ্ঞ মুফতিগণের সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম চাল দিয়ে ফিতরা দেওয়ার বিধান শরীয়তের আলোকে প্রচলিত হতে পারে কিনা, ভবিষ্যতে উলামায়ে কেরাম এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

২.বিশ্বের আরেক দল আলেম বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫/৬ টি দ্রব্যের নাম বলার সময় চাউল নামটিও বলতে পারতেন। যেহেতু বলেননি, তাই চালকে মূল মানদণ্ড হিসাবে নেওয়া ঠিক হবে না। হাদীসে বর্ণিত মানদণ্ড পর্যায়ের খাদ্য দ্রব্যের মূল্য সমপরিমান চাল,ডাল,আলু, সরিষা, সবজি,গোশত ইত্যাদি দিয়ে ফিতরা দেওয়া যাবে। এখানে চালের মান হবে কারেন্সি নোট বা টাকার মতো। অন্যান্য দ্রব্যের মানও হবে ফিতরার অর্থ মূল্যের মতো। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের বিপুল অধিকাংশ আলেম দ্বিতীয় মতটি পোষণ করে থাকেন।

একটি বিষয় আল্লাহর রাসুল সা. এর পর হজরত মুআবিয়া রা.প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন করে ছিলেন। যে বিষয়ে কোনো কোনো সাহাবী দ্বিমতও করেছিলেন। উম্মত তাঁর সে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ১৪০০ বছর ধরে আমলও করে আসছে।

সেটি হলো, রাসুল সা. বর্ণিত সব বস্তু এক সা´ পরিমাণ দেওয়া আর শুধু গম বা আটা অর্ধেক সা´ দেওয়া। মদীনা শরীফে অন্য সব খাদ্য ছিলো স্থানীয় আর গম ছিলো আমদানিকৃত। মূল্যে ফারাক ছিলো দ্বিগুণ। তাই অন্য সব খাদ্য ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম, আর গম নির্ধারণ করা হলে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম। বাংলা মাপে সাড়ে তিন সের, অর্ধেকের বেলায় পৌনে দুই সের।

দুই এক জন সাহাবীর দ্বিমত সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহ শুধু গম ও আটার বেলায় অর্ধেক সা´ এর হিসাব, হজরত মুআবিয়া রা.এর এই গবেষণামূলক বাস্তববাদী জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সাহাবায়ে কেরামের ইজমা থেকেই অনুসরণ করে আসছে।

এটি অবস্থার পরিবর্তনে এখন অন্য বস্তুগুলোর চেয়ে কমমূল্যের হয়ে গেছে। খুরমা খেজুর কিশমিশ মনাক্কা লাল আঙ্গুর যব বার্লি চিজ পনিরের চেয়ে গমের মূল্য এখন আর বেশী নয়। মদীনায়ে তাইয়্যেবাহ গম সিরিয়া থেকে আমদানি করা হতো। অন্য পণ্য দ্রব্যগুলো ছিলো তুলনামূলক সস্তা বা স্থানীয় উৎপাদন।

কিন্তু সাহাবীদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত গমের পরিমাণে এই সংশোধন আর কেউ পরিবর্তন করতে পারেন না। এটিও ফিতরার অন্যতম স্টান্ডার্ড হিসাবে আছে এবং থাকবে। তাছাড়া, মহান খেলাফতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সাহাবীগণের গবেষণার বরকতময় প্রতিফলন এটিও যে, অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রীর পাশাপাশি বর্তমানে একটি স্বল্প পরিমাণের ফিতরা থাকায় খুব সীমিত আয়ের অথচ ঈদের দিন নেসাবের মালিক কোটি কোটি মানুষের পক্ষে ফিতরা দেওয়ার মাধ্যমে একটি ওয়াজিব ইবাদত পালন করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন নামাজ রোজা করতে অপারগ এবং পরে মৃত্যু বরণকারী অধিকাংশ মানুষের কাফফারা আদায় এ ছোট্ট অংকটির কারণে সম্ভব হচ্ছে। খুব বড়ো ধনী ব্যক্তির জন্য অবশ্য বড়ো পরিমাণ ও অংকও কোনো সমস্যা নয়। বাস্তবতা চিন্তা করলে গমের পরিমাণে সাময়িক সংশোধনটি নানা আঙ্গিকে দেড় হাজার বছর ধরে উম্মতের জন্য সহজতাই এনে দিচ্ছে।

এ হিসাবে হাদীসের আলোকে নির্ধারিত বস্তু বা তার মূল্য ফিতরা হিসাবে দিতে হবে। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, ফিতরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত। এটি নির্ধারণে আর কোনো কর্তৃপক্ষীয় মিটিং বৈঠক ডেকে নতুন করে আলোচনার অবকাশ নেই। একজন রোজাদার নিজেই এই হাদীসের আলোকে নির্ধারিত ফিতরা গরীবের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম।

মুফতি সাহেবগণ বা ইসলামিক ফাউণ্ডেশন যে কাজটি করেন, সেটি হলো ফিতরার ওয়াজিব বিধান পরিপালনের সুবিধার্থ মানুষকে চলতি বছরের ফিতরা সামগ্রীর অর্থ মূল্যটি জানিয়ে দেওয়া। বাজারের ওঠানামায় এ মূল্যে জীবনভর পরিবর্তন আসবে কিন্তু ফিতরা নির্ধারণী দ্রব্যাদি পরিমাপ ও মানদণ্ডে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না।

এজন্য বলা হয়, এবারের ফিতরা ৭০ টাকা। গত ক´বছর আগে ইসলামিক ফাউণ্ডেশন ও দেশসেরা ৩৩ জন মুফতি সাহেবের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে প্রথম বারের মতো সদকাতুল ফিতরের সবগুলো স্টান্ডার্ড সামগ্রীর আলোচনা ও এসবের পরিমাণ এবং বাজার মূল্য বিস্তারিত ভাবে মুসলিম জনসাধারণকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মানুষ যেন শুধু গমের পরিমাণ ও মূল্যের একক ধারণায়ই আটকে না থাকে।

তাই এবছর বলা হয়েছে আদায়কারী জনপ্রতি ৭০ থেকে ২২০০ টাকা ফিতরার ধারণা। ৭০ এর কম নয়, এর বেশী যে যত ইচ্ছা দিয়ে দিবেন।

একজনের ফিতরা অনেকের মাঝে বন্টন করা যায়, একজনকে আবার অনেকের ফিতরাও দেওয়া যায়। নির্দিষ্ট খাদ্যের দ্বারা ফিতরা দেওয়া একটি সুন্নতের অধিক নিকটবর্তী হলেও আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটে টাকা দিয়ে দেওয়ার সুন্নতে।

আরব দেশের বহু মসজিদে দেখেছি, এলাকার লোকেদের দেওয়া ফিতরার বস্তার বস্তা আটা, ময়দা, বার্লি, খেজুর ও পনির রাখা হয়েছে, নেওয়ার কেউ নেই, জিনিষগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব টাকায় আদায় করলে ইমাম সাহেব স্থানীয় গরীব না পেলে প্রবাসী গরীব শ্রমিক ও মজুরি খাটা মানুষগুলোর মাঝে টাকাগুলো বন্টন করে দিতে পারতেন।

বাংলাদেশেও এসব বস্তুর বদলে টাকা দিয়ে ফিতরা দিলে, মানুষ খাদ্যের পাশাপাশি জামা কাপড় ওষুধ বাজার সদায় ঘরভাড়া ভ্রমণ ইত্যাদি সবকিছুই করতে পারে। এজন্য ইমাম আজম হজরত আবু হানীফা নুমান ইবনু সাবিত রহ. টাকা পয়সা দিয়ে ফিতরা দেওয়াকে গরীবের জন্য বেশী লাভজনক বলে মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ´ আনফাউ লিল ফুকারা´।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ফিতরা


আরও
আরও পড়ুন