Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭, ২২ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ভয়াবহতা দৃশ্যমান

বেড়িবাঁধ-ঘরবাড়ি মেরামত হয়নি : ক্ষতিগ্রস্তদের

ইনকিলাব রিপোর্ট | প্রকাশের সময় : ৩০ মে, ২০২০, ১২:০২ এএম

ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে তছনছ হয়ে গেছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা ও রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ এই ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে। ওই সব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ, ভেসে যাওয়া মাছের ঘের, ঘরবাড়ি এখনো মেরামত করা হয়নি। খোলা আকাশের নিচে এখনো অনেকের বসবাস। নেই খাবার, নেই খাবার পানি। অনেকস্থানে বিদ্যুৎ টেলিফোন ও সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন হয়নি। ঈদের আনন্দ ¤øান হয়ে যায়। পানিবন্দি আছে হাজার হাজার পরিবার। দুর্গত মানুষ নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। আম্পান বয়ে যাওয়া এলাকার চারিদিকে ধবংসের ভয়াবহতা দৃশ্যমান। আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে আম্পানে ক্ষয় ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হলো।

যশোর ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। বহু ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যাও এই এলাকায় তুলনামূলক বেশি। যশোর ও ঝিনাইদহসহ নিহতের সংখ্যা ১৫। বেড়িবাঁধ ভেঙে বিরাট এলাকার জনপদে পানি ঢুকে যায়। ধ্বংসের চিহ্ন এখনো রয়েছে সবখানে।

সেনাপ্রধানের নির্দেশে যশোর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেনাবাহিনী যশোরের ফুলবাড়িসহ বেশকিছু ঘরবাড়ি ইতোমধ্যেই মেরামত করে দিয়েছেন। যশোরে ঝড়ের দিন গাছচাপা পড়ে নিহত হয়েছেন স্বামী-স্ত্রী, মা ও মেয়েসহ ১২জন।

অনেক এলাকার বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ এখনো পুনঃস্থাপন হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক পার্থ প্রতিম সাহা জানান, এ অঞ্চলের ৬ জেলায় সম্পুর্ণ ১৩হাজার ৩শ’৪হেক্টরসহ আংশিক ও আক্রান্ত মোট ১লাখ ১২হাজার ১৯০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার অংকে দাঁড়িয়েছে ৪শ’৯ কোটি ৮০লাখ ৩৩হাজার ৫শ’। সবজি, আম লিচু, পান ও কলার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ জানান, জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গাছপালার ব্যাপক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানালেন, বেনাপোল ও মণিরামপুরসহ বিভিন্ন সড়কে পড়ে যাওয়া গাছ কেটে যোগাযোগ চালু করতে হয়েছে।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে রাজশাহী অঞ্চলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে আম লিচু কলা পেয়ারা পেপে ভূট্টা বাগানের। ঝড়ো বাতাসে নুইয়ে পড়েছে ধান। ভেঙ্গেছে গাছপালা ঘরবাড়ি। আমের ভর মওসুমে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝরে পড়েছে পচিশ শতাংশ আম। এখনো বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ায় ঝরছে আম। ফলে আম নিয়ে হাজার কোটি টাকার বানিজ্যের প্রত্যাশায় ধাক্কা লেগেছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুল হক জানান, রাজশাহীতে শতকোটি টাকার আমের ক্ষতি হয়েছে। আমের রাজধানী চাপাইনবাবগঞ্জে কৃষি কর্মকর্তা মো. রজরুল ইসলাম জানান, ঝড়ে এখানকার আম পেঁপে ও বোরো ধানের ক্ষগতি হয়েছে। তবে ঝড়ের তীব্রতা কম থাকায় ক্ষতির পরিমান তুলনামূলক কম। ঝড় বৃষ্টির কারনে ধান গাছ শুয়ে পড়েছে। এসব ধান কাটা যাবে। সামান্য কিছু ধান ঝরে গেছে। আম লিচু ছাড়াও শাকস্বব্জি ক্ষেতের ভাল ক্ষতি হয়েছে। রাজশাহীর মোহনপুরের বেশকটি পানের বরজ ভেঙ্গে গেছে। ক্ষতি হয়েছে পানের।

খুলনা ব্যুরো জানায়, আম্পানে ক্ষতবিক্ষত উপকূলবাসী জীবনযুদ্ধে এখন পানি মাটির মুখোমুখি। চলছে শুধু কোদাল আর খোন্তা হাতে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রানান্ত প্রচেষ্টা। উপকুল অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত অব্যাহত রেখেছে। এখনও খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরা শ্যামনগরের প্রায় অর্ধশত ছোট বড় ভাঙ্গা বাঁধ আটকানো সম্ভব হয়নি।

বৃহত্তর খুলনার লাখো মানুষ জোয়ার ভাটার সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে আছে। পানিবন্দী হয়ে আছে হাজার হাজার পরিবার। আর কমপক্ষে ২০টি স্থানের ভেড়িবাঁধ যে কোন মুহুর্তে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানে তান্ডবে খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, মহেশ্বরীপুর, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ দুর্গত হয়েছেন। কয়রার ২৪টি স্থানে ভেড়িবাঁধ ভাঙনে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে দুর্গত অবস্থায় দিনযাপন করছে। এছাড়া পাইকগাছার ১০ ও বটিয়াঘাটার ৭টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুলনার নয়টি উপজেলায় ৮০ সহস্রাধিক পরিবার আম্পানে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কয়রার দক্ষিণ বেদকাশীর বাসিন্দা আবু সাঈদ খান বলেন, উপকূলের মানুষ এখন নিজের বাস্তভিটা রক্ষায় ব্যস্ত। গত কয়েকদিন ধরে কয়রার জোড়সিং, খাশিটানা, আংটিহারা সøুইচ গেট, গোলখালি, ছোট আংটিহারা বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ করছেন কয়েক হাজার মানুষ। পুরুষের পাশাপাশি হাঁটু সমান কাদাপানিতে দাঁড়িয়ে মহিলারাও বাঁধ মেরামতে কাজ করছেন।

সাতক্ষীরা জেলা সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ২ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং ১০ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া, আম, তিল ও সবজি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। মৎস্য বিভাগের ক্ষতি হয়েছে ১৭৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। প্রাণিসম্পদের (গবাদিপশু) ৭৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। ৯১টি খামার ও ৬৪০টি গবাদি পশু ও ৮৬টি হাস মুরগির খামারসহ মোট ৭৭ লাখ টাকা ৬৭ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার উপকূলীয় নদ-নদীর ২৩টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

এদিকে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় ৮১ কিলোমিটার রাস্তা ও ৫৭.৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে। দেড় শতাধিক বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। সাতক্ষীরার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যালয় থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
তবে, জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্যমথ্যে জেলায় ঘরবাড়ির ক্ষতির পরিমান আরো অনেক বেশি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ রক্ষার কাজ শুরু করেছে গ্রামবাসী। দ্রæত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে এবং সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানান সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পানি


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ