Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭, ২৩ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

কাঁঠাল

| প্রকাশের সময় : ৫ জুন, ২০২০, ১২:০২ এএম

গ্রীষ্মকালীন ফলের মধ্যে কাঁঠাল অতি পরিচিত ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ফল। এটি আমাদের জাতীয় ফল। কাঁঠালের অনেকগুলো ফুল মিলিত হয়ে একটি ফুলের সৃষ্টি করে যাকে বলা হয় ক্যাটকিন তাই কাঁঠাল একটি যৌগিক ফল। বিভিন্ন ফলের মধ্যে কাঁঠাল সবচেয়ে বড় ফল। ফল মানুষের দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে নানা প্রকার রোগ ব্যাধি থেকে বাঁচিয়ে রাখে। ফলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে। যা আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করে।
মৌসুমী ফলের মধ্যে পুষ্টিতে ভরপুর ফল কাঁঠাল। এটি সুগন্ধি অতি সুস্বাদু, রসালো, পুষ্টিকর একটি ফল। কাঁঠালের কাঁচা বাকল, পাকা কাঁঠালের কোয়া ও বীজ সবই অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়। কাঁঠালে প্রায় সব খাদ্য উপাদান ও খনিজ লবণ পাওয়া যায়। সবার জন্য একটি ভালো ও উন্নত খাবার। শিশু উঠতি বয়সের ছেলে মেয়ে, গর্ভবর্তী মা, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান এমন মায়েদের জন্য কাঁঠাল খুবই প্রয়োজনীয় খাবার। কাঁঠালে সব ভিটামিন, খনিজ উপাদান, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রণ, জিংক, সালফার, ক্লোরিন, কপার পাওয়া যায়। যা মনব দেহের স্বাস্থ্য রক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।
পুষ্টি উপাদান : পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী পাঁকা কাঁঠালে পুষ্টি উপাদান হলো: জলীয় অংশ ৮৮ গ্রাম, শর্করা ২৪ গ্রাম, আঁশ ২ গ্রাম, চর্বি ০৩ গ্রাম, প্রোটিন ১.৮ গ্রাম, ভিটামিন ২৯৭ আইইউ, ভিটামিন সি ২১ মিলিগ্রাম, খনিজ লবণ ১.১ গ্রাম, খাদ্য শক্তি ৪৮ কিলোক্যালরি, লৌহ ০.৬ গ্রাম, ভিটামিন বি-১ ০.১১মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-২ ০.১৫ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩৪ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ৩৭ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ৩০ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৩০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম ৪১.১ মিলিগ্রাম, কপার ০.২৩ মিলিগ্রাম, সালফার ৬৯ মিলিগ্রাম এবং ক্লোরিন ৯ মিলিগ্রাম, তবে মনে রাখবেন কাঁঠালের জাত উৎপাদনের স্থান ও জলবায়ু ইত্যাদি পরিবর্তনের কারণে পুষ্টিগত মান কম বেশি হতে পারে।
রাসায়নিক উপাদান ঃ ফলে ভিটামিন ও খনিজ উপাদান আছে। পাতায় থাকে অ্যাসিটাইল কোলাইন, সাইক্লো আটেনোন, বিটা সিটাস্টেরল। বাকলে থাকে ট্যানিন, ফ্ল্যাভোনয়েডস, সাইক্লোহেটারোফাইলিন, আইসোডেরি ভেটিভস। বাকলের রসে বা কষে আছে এক প্রকার দানাদার স্টেরোকিটোন, আরটোস্টেনন। বীজে থাকে লেকটিনস আইসোলেকটিনস এবং স্টার্চ।
উপকারিতা ঃ কাঁঠালে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন এ পাওয়া যায়। যা আমাদের নানা রোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে। রাতকানা অর্থাৎ যারা রাতের বেলা চোখে কম দেখে তা প্রতিরোধ করে বিশেষ করে আমাদের দেশে শিশু এ রোগে ভোগে বেশি। আমাদের দেশে প্রতি বছর ভিটামিন এ-এর অভাবে প্রায় ৩৫-৪০ হাজার শিশু রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয়। আমরা একটি সচেতন হয়ে যদি মৌসুমী ফল বা কাঁঠাল জাতীয় খাবার অথবা ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ফল শিশুদের খাওয়ানো হয় তাহলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
কাঁঠালে প্রচুর পটাশিয়াম আছে। পটাসিয়াম মানব দেহের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে রাখে। কাঁঠালে যে আঁশ থাকে তা আমাদের হজম কাজকে খুব সহজ করে। ফলে আমাদের পায়খানা পরিষ্কার হয় অতি সহজে। কাঁঠালে শক্তিশালী অন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা দেহকে ক্ষতিকর ফ্রি র‌্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
কাঁঠালে চর্বির পরিমাণ খুবই কম। তাই বেশী কাঁঠাল খেলে দেহের ওজন বৃদ্ধি পায় না। কাঁঠালের ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম দেহের হাঁড় ও দাঁতের গঠন সুরক্ষা করে। কাঁঠালের নানা উপাদান আমাদের মস্তিষ্ককে সুরক্ষা রাখে এবং স্নায়ুর দুর্বলতা কমায়। এ ফলে থাকা ম্যাগনেসিয়াম শরীরে নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে এবং রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ ঠিক রাখে কাঠালের ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস উপাদান আলসার উচ্চ রক্তচাপ এবং শরীরের চামড়া কুছকিয়ে যাওয়া বা বার্ধক্য প্রতিরোধে বিরাট ভূমিকা পালন করে।
কাঁঠালে ভিটামিন বি-৬ থাকে যা হৃদ রোগের ঝুকি কমায়। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে প্রতিদিন নিয়মিত ২০০ গ্রাম কাঁঠাল খেলে গর্ভবতী মহিলা ও গর্ভের সন্তানের সব ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের অভাব পূরণ হয়। যেসব মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান তারা নিয়মিত কাঁঠাল খান বুকে প্রচুর দুধ উৎপন্ন হবে ও শিশু বলবান হবে। কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি পাওয়া যায় যা আমাদের ঘন ঘন সর্দি, কাশি বা ঠান্ডা লাগা, দাঁতে সমস্যা কমাতে বিরাট ভূমিকা পালন করে এবং মুখের রুচি বাড়ায়। কাঁঠালের অন্টিঅক্সিডেন্টের মধ্যে রয়েছে বিটা ক্যারটিন, লুটেইন যা প্রোস্টেট, স্তন, পাকস্থলি ফুসফুসের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। কাঁঠালের জিংক শরীরের ইনসুলিন হরমোনের সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং ম্যাগনেসিয়াম ও সোডিয়াম দেহের লবণ ও ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা করে।
ঔষধি গুণ ঃ আয়ুর্বেদীয় মতে মানব দেহের কোন অংশ ফুলে গেলে কাঠালের আঠা লাগালে উপকার হয়। * ফোঁড়ার চারপাশে কাঁঠালের আঠা লাগালে ফোঁড়া পেকে যায়। * নেশাকারীদের বা ফুড পয়েজনিং হলে বা অন্যকোন কারণে বমি করানো প্রয়োজন হলে কচি কাঁঠালের পাতার রস খাওয়ালে অতি সহজে বমি হয়। * পেটের কোন সমস্যা হলে বা পাতলা পায়খানা হলে কাঁঠালের বিঁচি পুড়িয়ে বা তরকারি করে খেলে উপকার পাবেন। * মানব দেহের চামড়ার উপর কোন রোগ দেখে দিলে কাঁঠাল গাছের কঁচি পাতার রস লাগালে উপকার পাবেন। * রক্ত আমাশয় হলে কাঁঠাল গাছের বাকলে রস ও চুনের পানি মিশিয়ে খেলে উপকার পাবেন। * গাছের কঁচি পাতার রস ও মূলের রস হাপানি রোগের জন্য বেশ উপকারী। * যারা রোগারোগা থাকেন বা শরীরে শক্তির পরিমাণ কম তারা দুধের সাথে কাঁঠাল মিশিয়ে খান বেশ উপকার পাবেন।
সতর্কতা ঃ কাঁঠালের গন্ধ মজা পেয়ে এক সাথে বেশী খাবেন না, বদ হজম হতে পারে। কেউ কাঠাল খেলে যদি গ্যাসট্রিকে সমস্যা করে তাহলে অল্প পরিমাণ করে ভাতের সাথে খান। ডায়াবেটিস রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কাঁঠাল খাবেন। যারা কিডনী রোগে আক্রান্ত তারা কাঁঠাল খাবেন না। আর যাদের মূত্রতলীতে পাথর আছে বা কিডনীতে পাথর আছে তারাও কাঁঠাল খাবেন না।
মোঃ জহিরুল আলম শাহীন
শিক্ষক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কলাম লেখক
ফুলসাইন্দ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
গোলাপগঞ্জ, সিলেট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন