Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭, ২২ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

করোনায় নেশা বন্ধ নেই

মীর আব্দুল আলীম | প্রকাশের সময় : ৬ জুন, ২০২০, ১২:০১ এএম

করোনাকারণে ঘরেই থাকার কথা কিন্তু মানুষ ঘরে থাকছে না। অপ্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হয়ে আড্ডা দিচ্ছে; যত্রতত্র ঘুরাফেরা করছে অনেকে। এমনকি নেশার টেবিলও জমছে বেশ। এ অবস্থায় বিষাক্ত নেশা সেবনে মানুষের মৃত্যুর খবরও আসছে। ঈদের ছুটির মধ্যে বিষাক্ত ‘স্পিরিট’ খেয়ে রংপুর ও দিনাজপুরে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভয়ঙ্কর করোনাও নেশাগ্রস্তদের দমাতে পারেনি। অনেক ব্যবসায় থমকে গেলেও মাদক ব্যবসায় সচল। ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরইন আর মদ্যপান করে মানুষ কেবল অসুস্থ আর বিকারগ্রস্ত হচ্ছে না, ঘটছে মানুষের জীবনহানীও। বিষাক্ত মদ্যপানে মানুষের মৃত্যুর খবর আমরা প্রায়ই পাচ্ছি।
প্রশ্ন হলো, বিষাক্ত মদ পানে মানুষ মারা যাবার ঘটনা ঘটছে; সরকারের সংশ্লিষ্টরা কী করছে? রংপুরের মাদকের আসরের কথা জানতো এলাকাবাসী। পুলিশকে ম্যানেজ করেই নাকি তারা এ আসর বসাতো। দেশের সর্বত্রই একই অবস্থা চলছে। এ মুহূর্তে দিন তারিখ আর স্থান মনে নেই, সম্প্রতি পার্বত্য কোন জেলায় এক ব্যক্তি মদের নেশায় নিজের স্ত্রী আর কন্যাকে হত্যা করেছে বলে সংবাদপত্রে দেখেছি। স্ত্রী-কন্যাকে হত্যা করে তাঁর ছোট ছেলের গলাতেও কোপ বসিয়ে দিয়েছিল ঐ নেশাগ্রস্ত বাবা। মুমূর্ষ অবস্থায় হাসপাতালে থাকা ঐ সন্তানের ভাগ্যে পরবর্তীতে কী ঘটেছে তা আর পরে জানতে পারিনি। এমন অসংখ্য ঘটনার জন্ম দিচ্ছে নেশাগ্রস্ত মানুষ।
মাদক আর মাদকাসক্ত মানুষ আমাদের সত্যিই ভাবিয়ে তুলেছে। তবুও দেশ থেকে কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ করা হয় না? যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন কী করছেন তারা? দু/চারজন চুনপুঁটিকে ধরলেই মাদক রোধ হবে এমনটা ভাবা ঠিক না। মাদকের মূলউৎপাটন করতে হবে। গডফাদারদের ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদক পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীর ক্রমপ্রসার রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নানারকম কার্যক্রম দেখা গেলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মিলছে না। মাদক শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ-জাতির জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনছে। নানারকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে মাদকের বিকিকিনি এবং বিভিন্ন সীমান্তপথে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
দেশের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদকদ্রব্য বিকিকিনির বিষয়টি বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি অভিযানে মাদকদ্রব্য আটক ও জড়িতদের আটকের কথা শোনা গেলেও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আটক করা হয়েছে কিংবা দৃষ্টান্তম‚লক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে এমন কথা কমই শোনা যায়। ফলে মাদকবিরোধী নানা অভিযানের কিছুদিন যেতে না যেতেই আবারো নতুন করে মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটে। মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে তরুণ সমাজ। দেশের তরুণ সমাজ মাদকের ভয়াবহ প্রভাবে বিপথগামী হচ্ছে। মাদকের নীল ছোবলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। যা একটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ। সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রকট রূপের পেছনে মাদক একটি বড় উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে।
২০১৭ এর শেষের দিকে, লায়ন্স ক্লাবের বাংলাদেশ দলের সাথে মিয়ানমার সফরের অভিজ্ঞতা আমাকে বেশ ব্যথিত করে। বাংলাদেশ ঘেঁষা সীমান্তে মিয়ানমারে অসংখ্য ইয়াবা কারখানা গড়ে উঠেছে। সে সব কারখানায় কোটি কোটি পিস ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। অবাক করার কথা, মিয়ানমারের মানুষ, সেখানকার যুবসমাজ খুব একটা ইয়াবা আসক্ত নয়। কোনো কোনো এলাকার অধিবাসীরা তো জানেই না- ইয়াবা কী জিনিস। ম‚লত বাংলাদেশিদের জন্যই সেখানে ইয়াবা কারখানা গড়ে উঠেছে। যতদ‚র জানতে পারি, তাতে নাকি এ ব্যাপারে সে দেশের সরকারের মৌন সম্মতিও আছে। মিয়ানমার সীমান্তে ইয়াবা কারখানার কথা আমরা জানি, আমাদের সরকারও জানে, কিন্তু ইয়াবা চোরাচালান রোধ হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না? মিয়ানমার ইয়াবা তৈরি করে প্রতিদিন আমাদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাতে আমাদের যুবসমাজ ইয়াবাসক্ত হয়ে ধ্বংসে নিপতিত হচ্ছে। কী করছি আমরা? আমাদের সরকারই-বা কী করতে পারছে? এতে সরকারের সম্মতি আছে এ কথা বলার সুযোগ নেই, তবে সরকারের কর্তাব্যাক্তিদের ম্যানেজ হয়ে যাওয়ার কারণে মাদককারবারীরা প্রতিদিন দেশে মাদকে সয়লাব করে দিচ্ছে। মাদক তথা ইয়াবা ব্যবসা নির্বিঘ্ন হচ্ছে, তা বলছি না। মাদক কারবারীরা ধরাও পড়ছে মাঝে-মধ্যে। এই তো কিছু দিন আগে টেকনাফে ১ লাখ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। এর বাজারমূল্য কম করে হলেও ৫ কোটি টাকা।
মাদক সেবনের কুফল সম্পর্কে মহাসমারোহে আলোচনা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। বিভিন্ন এনজিও মাদক সেবন নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। মাদক পাচার, বহন ও ব্যবহারের বিভিন্ন শাস্তি রয়েছে। তবু মাদক ব্যবহার কমেনি। ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, প্যাথেডিনের ব্যবসা রমরমা। নারী, পুরুষ উভয় শ্রেণির মধ্যে মাদক সেবন প্রবণতা বাড়ছে। বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন দেশের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীকে নেশাগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও অস্বাভাবিক আচরণ করতে শেখাচ্ছে। ঘুমের ওষুধ, হেরোইন, গাঁজা, এমনকি কুকুর মারার ইনজেকশন সেবন করছে মাদকসেবীরা। বিষ শরীরে ঢুকিয়ে নেশা করার মতো অভ্যাস গড়ে উঠছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। এ ব্যাপারে প্রশাসন নির্বিকার। কাজের কাজ কিছুই করে না। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানে এ সব। জানে কোথায় মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়, কোথা থেকে আসে এসব আর কারাই বা বিক্রি করে তা। এর সবই তাদের নখদর্পণে। যদিও এসব ধরার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ী গডফাদারদের ধরা তো দূরের কথা, সংশ্লিষ্টরা এর পাড় ঘেঁষেও দাঁড়াতে রাজি নয়।
মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন শুধু নগর-মহানগরেই সীমাবদ্ধ নেই, গ্রাম পর্যন্ত মাদক এখন সহজলভ্য। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক। তবে মাঝে-মধ্যে মাদকদ্রব্য বহনের দায়ে কেউ কেউ ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। দৃশ্যের আড়ালে এই যে অদৃশ্য মহাশক্তিধর চক্রটির জন্যই মাদকের ক্রমবিস্তার রোধ হয়ে উঠেছে অসম্ভব। আমরা মনে করি, মাদক সংশ্লিষ্ট চুনোপুঁটি থেকে রাঘব-বোয়াল পর্যন্ত প্রত্যেকের ব্যাপারেই আইন প্রয়োগে কঠোরতা দেখাতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগই মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে সহায়ক হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: করোনা


আরও
আরও পড়ুন