Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৫ কার্তিক ১৪২৭, ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

মন্দা মোকাবিলায় বেসরকারি খাতসহ সবাইকে ভূমিকা নিতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ৬ জুন, ২০২০, ১২:০১ এএম

দেশ থেকে সাধারণ ছুটি এবং লকডাউন উঠে গেছে। দীর্ঘ দুই মাসের অধিক সময় দেশ এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল। ঘরবন্দী হয়েছিল মানুষ। মানুষের জন্য এ সময়টি কোনোভাবেই স্বস্তির ছিল না। করোনার ভয়-ভীতির পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে পড়া, অর্থনৈতিক সংকটে পড়া থেকে শুরু করে মানসিক সমস্যা ও দুঃশ্চিন্তা তাদের আঁকড়ে ধরেছিল। দুঃসংবাদ ছাড়া কোনো সুসংবাদ ছিল না। এখনও নেই। প্রতিদিন করোনায় কতজন আক্রান্ত হয়েছে আর কতজন মারা যাচ্ছে, এটাই মূল সংবাদ হয়ে রয়েছে। দুপুর আড়াইটায় বেশিরভাগ ঘরবন্দী মানুষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই সংবাদ লাইভ শুনত এবং এখনও শুনছে। বিষয়টি অনেকটা ক্রিকেটের স্কোর জানার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কত রান হলো আর কত উইকেট পড়লো। এই স্কোর জানার দিন কবে শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারে না। তাই বলে সারাজীবন তো এভাবে বন্দী হয়ে থাকা যায় না। জীবন ও জীবিকা চালাতে হবে। এ বিষয়টি বিবেচনা করেই হয়তো সরকার অনন্যোপায় হয়ে, অনেকটা যা থাকে কপালে বলে বা তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ ছুটি তুলে দিয়েছে। করোনাকে সঙ্গী করেই বাঁচতে হবে, এ কঠোরনীতি অবলম্বন করেছে। এছাড়া সরকারের কাছে আর কোনো অপশনও নেই। এর মধ্য দিয়ে মানুষকে ঘরবন্দী রাখার সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়েছে। এ দায়িত্ব মানুষের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এখন মানুষকে তার নিজের জীবন রক্ষা করে চলতে হবে। করোনা থেকে বেঁচে থাকার মধ্য দিয়েই চলতে শিখতে হবে। যারা পারবে তারা বেঁচে থাকবে, যারা পারবে না, তারা মারা যাবে-এমন এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। যাকে বলে, সার্ভাইবাল অফ দ্য ফিটেস্ট। করোনা সংক্রমণের যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে ধাবিত, তখন সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে এবং প্রশ্ন উঠেছেও। কেউ কেউ বলেছেন, সরকার অন্তত এ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত করোনার শীর্ষ সংক্রমণ ঘটবে। তারপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। এসবই অনুমান। হতেও পারে, নাও হতে পারে। তবে অধিকাংশেরই মত, অপেক্ষা করলে ভাল হতো। সে যাই হোক, সরকার বুঝতে পারছে, দেশ চালাতে গিয়ে তার ভেতরের অবস্থা কোন পর্যায়ে রয়েছে। অচল অবস্থায় অর্থনীতির মেরুদন্ড যে দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং তা নুয়ে ভূমিস্যাত হতে বেশি সময় লাগবে না, তা সরকারের চেয়ে ভাল আর কে জানে? দেশ তো সরকারকেই চালাতে হবে। চালাতে হলে অনেক সময় অপ্রিয় ও অনিবার্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সরকার তাই নিয়েছে। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে লকডাউনের মধ্যেও মানুষ বের হয়েছে। যারা বের হয়েছে, তাদেরও জানের মায়া আছে। তারপরও আল্লাহ ভরসা করে বুকে সাহস নিয়ে বের হয়েছে। রাজধানী ছেড়ে হাজার হাজার মানুষের যাওয়া এবং আসার দৃশ্য আমরা দেখেছি। সরকারও দেখেছে, মানুষ কাজ করতে চায়, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালাতে চায়। মানুষের এই মানসিক শক্তি ও কর্মস্পৃহাও হয়তো সরকারকে সবকিছু খুলে দিতে সাহস যুগিয়েছে।
দুই.
করোনা যেমন মানুষকে ঘরবন্দী করতে বাধ্য করেছে, তেমনি প্রকৃতিকেও হাঁপ ছাড়ার কিছুটা অবকাশ দিয়েছিল। এত দীর্ঘ সময় প্রকৃতিকে তার মতো করে থাকতে দেখা যায়নি। এ সুযোগে সে তার রং ও রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছিল। রাজধানীতে দেখা গেছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। ধুলো-বালিতে ঢাকা পড়া গাছপালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে। বৃক্ষরাজি বৃষ্টিতে ধুয়ে সবুজ হয়ে ওঠে। গাছে গাছে ফুলের সমারোহ এক অনিন্দ্য সৌন্দর্যের অবতারণা করে। সাধারণত রাজধানীতে ষড়ঋতুর সবগুলো অনুভূত হয় না। লাকডাউনকালে বসন্তের রূপ দেখা গেছে। এ রূপ দেখার সুযোগ রাজধানীর মানুষের সবসময় হয় না। ধুলিদূষণে সবকিছুই ঢাকা পড়ে থাকে। এমনকি যেসব অপূর্ব স্থাপত্যকলা নিয়ে বড় বড় ভবন গড়ে উঠেছে, সেগুলোর সৌন্দর্যও ধুলোয় মলিন হয়ে থাকত। দূষণ কমায় এবং বৃষ্টিস্নাত হয়ে ভবনগুলো চকচকে হয়ে উঠেছিল। যে রাজধানীর বায়ুদূষণ সবসময় বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় থাকে, তা কমে স্বাস্থ্য উপযোগী হয়ে ওঠে। রাজধানীর এ সৌন্দর্য আবার কবে দেখা যাবে, তা কেউই বলতে পারবে না। যানবাহন চলাচল ও মানুষের কর্মযজ্ঞ শুরু হওয়ায় রাজধানী আবারও মলিন হতে শুরু করেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, বেঁচে থাকার তাকিদে মানুষকে কাজ করতে হয়। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালাতে হয়। করোনায় অর্থনীতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা সহসা পূরণ হওয়ার নয়। দেশ যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, করোনা তাতে দাড়ি, কমা দিয়ে শ্লথ করে দিয়েছে। সরকার নানামুখী সহায়তার মাধ্যমে তার গতি ধরে রাখতে চেষ্টা করছে। ধরে রাখতে গিয়ে সরকারের কোষাগারে টান ধরেছে। তাকে ঋণ করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। সাহায্যের জন্য বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে হাত পাততে হয়েছে। অর্থনেতিক এই মন্দাবস্থার মধ্যেই ১১ জুন বাজেট ঘোষণা করা হবে। আমাদের ঘাটতির বাজেটে এবার ঘাটতির পরিমাণ যে বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বাড়বে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ ঘাটতি পূরণ এবং অর্থের সংস্থান করা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়াব। সাধারণত বাজেটের অর্থ এবং ঘাটতির বড় উৎস রাজস্ব খাত বা জনগণের পকেটের পয়সা। এখন সাধারণ মানুষের যে দুরবস্থা, তাতে বাজেটের অর্থ জোগাতে গেলে তাদের কতটা সমস্যায় পড়তে হবে, তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। তার ওপর রয়েছে, দারিদ্র্য ও বেকার সমস্যা। সরকারি হিসেবেই দেশে অতি দরিদ্র প্রায় ২ কোটি এবং দরিদ্র ৩ কোটির বেশি। সব মিলিয়ে ৫ কোটির অধিক। কোনো কোনো বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটি প্রায় জনসংখ্যার অর্ধেক বা তার বেশি। তবে করোনাকালে সরকারি হিসেবে যেসব দরিদ্র মানুষ রয়েছে, নিঃসন্দেহে তারা আরও দরিদ্র হয়েছে এবং তাদের সাথে নতুন দরিদ্রও যুক্ত হয়েছে। এই বিপুল দরিদ্র জনসংখ্যার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করে এগিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন। এদের জীবন-জীবিকা যদি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা না যায়, তবে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে খবর বের হয়েছে, দেশে বেকারের সংখ্যা গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। গত সপ্তাহে এডিবি এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের চাকরি খোঁজার পোর্টালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কমেছে ৮৭ শতাংশ। অর্থাৎ নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে কর্মী নিয়োগ করছে না। এ সময়ে যে লোকবল নিয়োগ হতো, তা হয়নি। এ-তো গেল নতুন নিয়োগ কমে যাওয়া। লকডাউন উঠে যাওয়ায় অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের হিসাব-নিকাষ হয়তো নতুন করে করা শুরু করেছে। হিসাব মিলাতে গিয়ে প্রথমেই খরচ কমানোর দিকে হাত দেবে। এক্ষেত্রে প্রথম কোপটি পড়বে জনবল কমানো বা ছাঁটাই করা খাতে। পাশাপাশি বেতন কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথাও শোনা যাচ্ছে। এতে অনেক মানুষ বেকার হবে এবং তাদের জীবনযাপনে টান ধরবে। নতুন বেকার যুক্ত হবে চাকরি প্রত্যাশী লাখ লাখ বেকারের সারিতে। লকডাউনের সময়ই অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো বন্ধ থাকায় খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। ফলে দেশের সামনে যে ভয়াবহ দুর্দিন অপেক্ষা করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তিন.
কারো কারো ক্ষেত্রে বিপদ আর্শীবাদ হয়ে আসে। বিপদকে তারা পুঁজি করে। এর নজির করোনার ত্রাণ কার্যক্রমে আমরা দেখেছি। সরকারের বরাদ্দকৃত চাল-গমের লুটপাট এবং এর সঙ্গে জড়িতদের অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টিও দেখা গেছে। তারপরও লুটপাট থেমে নেই। সরকার যে, দরিদ্র মানুষের মাঝে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ দিয়েছে, এক্ষেত্রেও এন্তার দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ সুযোগে অনেকে লাখপতি হয়েছে। এক এবং একাধিক মোবাইল নাম্বারে অনেকের নাম দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এ নিয়ে বেশ তোলপাড় হয়। এদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী। এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হলেও, কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, আজ পর্যন্ত তা জানা যায়নি। আবার গণপরিবহণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানোর কথা বলে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রাজধানীতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বাসে যেতে আগে যেখানে ২০ টাকা লাগত, এখন তা হয়েছে ৩২ টাকা। তবে এ ভাড়ার চেয়ে বেশি নেয়া হচ্ছে বলে ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছে। বলা বাহুল্য, গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা এবং তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে যাত্রীরা বরাবর অসহায় হয়ে থাকলেও সরকার এ ক্ষেত্রে কখনোই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এ এক শক্তিশালী চক্র, যার কাছে সরকারকেও হার মানতে হয়। ফলে অসহায় জনগণকে তা মেনে নিয়েই কষ্ট করে চলতে হয়। স্বাস্থ্যবিধির কথা বলে এই যে ভাড়া বাড়ানো হলো, তা আর কমবে বলে মনে হয় না। যদিও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগের ভাড়ায় ফিরে যেতে হবে। তা যে হবে না এবং কোনো কালেই হয়নি, দেশের মানুষ তা ভাল করেই জানে। একবার কোনো জিনিসের দাম বাড়লে তার কমার নজির আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। এসব নজির থেকে বোঝা যায়, বিপদ কারো কারো বা কোনো কোনো গোষ্ঠীর জন্য মঙ্গলও বয়ে আনে। এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, এই গোষ্ঠীকে যদি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যুগে যুগে দেখা গেছে, দুর্ভিক্ষ হয়েছে এসব সুবিধাবাদী এবং দুর্নীতিবাজ চক্রের কারণে। এ কথা অনস্বীকার্য, দেশের যে অপরিমেয় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নেয়া সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ করোনার আগে থেকেই সরকারকে ঋণ করে চলতে হয়েছে। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই দুঃসময়েও সরকারের সহায়তা কার্যক্রম ব্যাংক ঋণের মাধ্যমেই চালাতে হচ্ছে। এতে সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে আরও নিম্নগামী হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই। এ পরিস্থিতি সরকারের একার পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব নয়। এজন্য বেসরকারি খাত এবং দেশের ধনিক শ্রেণীকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এই শ্রেণীটিই বিগত প্রায় একযুগ ধরে সরকারের কাছ থেকে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। গত সপ্তাহে বিদেশি এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধনীদের দেশ। বিগত দশ বছরে দেশে ধনীর সংখ্যা ১৪.৩ শতাংশ বেড়েছে। এ হার উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর চেয়েও বেশি। আর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট সম্পদের সিংহভাগই ৫ শতাংশ মানুষের হাতে। যেসব ধনীলোক সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে, এখন তাদের দায়িত্ব করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে সরকারের পাশে দাঁড়ানো উচিত। তাদের উচিত হবে, অর্থ কুক্ষিগত না রেখে বা বিদেশে পাচারের চিন্তা না করে, দেশে বিনিয়োগ করা। এক্ষেত্রে সরকারকেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। দেশে কালো টাকা সাদা করা বা অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শিত করার সুযোগ দেয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। অনেকে মনে করেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না দিয়ে এর মালিকদের আইনের আওতায় আনা দরকার। অনেকে বাজেটে এ সুযোগ দেয়া উচিত। তবে বিতর্কের কারণে বাজেটে সে সুযোগ রাখা হয় না, আবার কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ফলে কালো টাকা আয়ের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই অর্থ বিদেশেও পাচার হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু কালো টাকার উৎস এবং এর মালিকদের ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এবং তা দেশে বিনিয়োগ না হয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে, তাই এ অর্থ দেশে রাখার ব্যবস্থা করাই উত্তম। কারণ, এ অর্থ কোথাও না কোথাও বিনিয়োগ বা ব্যবহৃত হচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে যদি এ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়, তবে অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও গতি সঞ্চারিত হতে পারে।
চার.
করোনায় যে বিশ্ব অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছে, তা সকলেরই জানা। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের অর্থনীতি চাঙা রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। আমরাও বৈশ্বিক এই মহামন্দার বাইরে নই। সরকার বিভিন্ন প্রণোদনামূলক প্যাকেজের মাধ্যমে এর তীব্রতা হ্রাসের উদ্যোগ নিলেও এটা প্রাথমিক চিকিৎসার মতো। তবে অর্থনীতিকে টেকসই করতে এবং তা সচল করতে সরকারকে নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিতে হবে। এ নীতি হতে হবে, জনবান্ধব। এক্ষেত্রে, সুষম বাজেট প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটের অর্থ জোগাড় এবং বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন যাতে চাপে না পড়ে ও নিষ্পেষণের শিকার না হয়, তা খেয়াল রাখা জরুরি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মকান্ড চালানোর জন্য বাজেট প্রণয়ন করা সরকারের দায়িত্ব। তবে সরকারের একার পক্ষে পুরো অর্থনীতিকে টেনে নেয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। বেসরকারি খাতকে চাঙা রাখতে সরকারের অর্থনৈতিক নীতি বড় ভূমিকা রাখে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, পর্যাপ্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোর সুবিধা নিশ্চিত করে দেয়া সরকারের দায়িত্ব। বিগত বছরগুলোতে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের নানা অনুযোগের কথা শোনা গেছে। করোনায় সৃষ্টি অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা কাটাতে এখন আর এ ধরনের অনুযোগ করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। আমরা আশা করি, আগামী যে বাজেট ঘোষণা করা হবে, তাতে বেসরকারি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সুযোগ-সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কৃষি খাতে সহজ ঋণ ও প্রণোদনামূলক সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়া বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হবে বলে পত্র-পত্রিকায় যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে সাধুবাদযোগ্য বলে অনেক অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। এতে বিদেশে অর্থ পাচারের হার যেমন কমবে, তেমনি দেশের টাকা দেশে বিনিয়োগ হয়ে অর্থনীতির সহায়ক হবে। অর্থনীতিকে সচল রাখতে বিদ্যমান এবং সম্ভাবনাময় সকল খাতকে উজ্জীবিত করার বিকল্প নেই। [email protected]



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন