Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য

গোপন টেন্ডার করায় ঠিকাদারদের তোপের মুখে তত্ত্বাবধায়ক

কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ৮ জুন, ২০২০, ৪:৩২ পিএম

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সম্প্রতি পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে গোপন টেন্ডারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাসপাতালের যে কোন টেন্ডার দীর্ঘদিন থেকে গোপন করে উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার অভিযোগ অনেক পুরনো বলে জানা গেছে।
করোনা সংকটে জর্জরিত জাতীর এই ক্রান্তিকালে চিকিৎসা সেবা লকডাউন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসোলেশনে থেকে দুনীর্তি, অনিয়ম আর গোপন টেন্ডার চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের পথ্য, ধূপি ও ষ্টেশনারী ঠিকাদারী কাজ গোপনে সম্পূর্ন করার লক্ষ্যে বিজ্ঞাপন গোপন করে টেন্ডার কার্য সম্পন্ন করার অপকৌশল ফাঁস হয়েছে। ফলে টেন্ডার কাজে অংশগ্রহনে বঞ্চিত ঠিকাদারদের তোপের মুখে পড়েন কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা: জাকিরুল ইসলাম লেলিন। গত ২৮ মে দরপত্র দাখিলের শেষ দিনে অন্যান্য ঠিকাদাররা খবর পেয়ে তত্বাবধায়কের কার্য্যালয় ঘেরাও করে। এসময় ঠিকাদারদের এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে সাংবাদিকরা তত্ববধায়কের কার্য্যলয়ে গিয়ে উপস্থিত হন। কোন পত্রিকায় বিজ্ঞপন প্রকাশ করা হয়েছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন বহুল প্রচারিত নয় এমন দুটি পত্রিকা নাম। দৈনিক এশিয়ার বানী ও দৈনিক মুসলিম নিউজ।
পত্রিকা দুটি দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতেও ব্যর্থ হন এবং বলেন করোনার কারণে পত্রিকা দুটি কুড়িগ্রামে আসেনি। আদৌ বিজ্ঞাপনটি কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। টেন্ডার সিন্ডকেটের মূল হোতা, হাসপাতালের হিসার রক্ষক আশরাফ মজিদ জানান, বিজ্ঞাপনটি দৈনিক এশিয়ার বানী ও দৈনিক মুসলিম নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তবে তা অদ্যাবদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এসে পৌঁছায়নি।
অভিযোগে জানা যায়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল জেলাবাসীর চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। কাংঙ্খিত চিকিৎসা সেবা তো দূরের কথা উল্টো হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বিনামূল্যের ওষুধ অতিরিক্ত মূল্যে কিনতে হয় রোগীদের। হাসপাতালে কম্বল, মশারী, চাদর ও বালিশের কভার দেয়ার নিয়ম থাকলেও সেগুলো পায়না সব রোগী। অসাধু উপায়ে হাসপাতালের ঠিকাদারী কাজ পাইয়ে দিয়ে নিজেই ঠিকাদারী করেন হিসাব রক্ষক আশরাফ মজিদ। হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন হাসপাতালের একটি সিন্ডিকেট।
কুড়িগ্রাম শহরের বিশাল অট্রালিকা সহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন হিসাব রক্ষক আশরাফ মজিদ। প্রকাশ্যে অনিয়ম করে হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহের কোটি কোটি টাকার কাজ প্রতিবছর একই ঠিকাদার পাচ্ছেন। তদন্ত করলেই বেরিয়ে পড়বে থলের বিড়াল।
অভিযোগে আরো জানা য়ায়, করোনা সংকটের আগে হাসপাতালে আউট সোর্সিং এর ঠিকাদারী কাজে দরপত্র দাখিল সম্পন্ন হয়। করোনার কারনে দীর্ঘদিন সিদ্ধান্ত না দিলেও তড়িঘরি করে গত সপ্তাহে চুড়ান্ত ঠিকাদার নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেরণ করা হয়। সেখানেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টেন্ডার শর্তবালীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক সলভেন্সী, সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতার সনদ ও কেন্দ্রীয় সিকিউরিটি সার্ভিসের সদস্য হওয়া বাধত্যমূলক। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে ভূয়া সনদ দেখিয়ে চূড়ান্ড ঠিকাদার হিসেবে স্বরলিপী সিকিউরিটি সার্ভিসিং প্রাইভেট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রেরণ করে জোড়ালো তদবির করছেন।
অন্যদিকে দরপত্রের সকল শর্তবলী পূরণ করে আল ফারাহ সিকিউরিটি সার্ভিস টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করলেও তাকে দ্বিতীয় দরদাতা হিসেবে রাখা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে জেলা সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আল ফারাহ সিকিউরিটি সির্ভিস লিমিডেটের স্থানীয় প্রতিনিধি মো: নূরুজামান অভিযোগ করেন স্বরলিপী সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড এর অভিজ্ঞতার সনদ, ব্যাংক সলভেন্সী, কেন্দ্রীয় সিকিউরিটি সার্ভিসের সদস্যের ভূয়া সনদ জমা দিয়েছে। স্বরলিপীর দেয়া সনদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করলে তা ভূয়া প্রমাণিত হবে।
কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির একের পর এক আলামত রীতিমত উদ্বেগজনক। যা সরকারের দূর্নীতি বিরোধী অবস্থানকে মারাত্বক ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বার বার একটি সিন্ডিকেট কে ঠিকাদারী কাজে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে আসলেও অভিযুক্ত দূর্নীতিবাজরা থাকছে বহালতবিয়তে। প্রকাশ্যে অনিয়ম, ঠিকাদারদের বিক্ষোভ, তত্বাবধায়কের কার্য্যলয় ঘেরাও করার পরেও অভিযুক্তরা এবারো যদি দায়মুক্তিপায় তাহলে স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি কেবল সাইনবোর্ড সর্বস্ব হয়ে পড়বে। ব্যবসায়ীক লাভের বিবেচনার কাছে চিকিৎসা প্রার্থীরা বঞ্চিত হবেন, অনেকে মারা যাবেন বিনা চিকিৎসায়।
এসব অনিয়মের ব্যাপারে জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা: জাকিরুল ইসলাম জানান, ঠিকাদারদের সাথে একটু সমস্যা হয়েছিল সেটা সমাধান হয়েছে। অনিয়ম দুর্নীতির কথা বললেই তিনি বলেন সিস্টেমটি দীর্ঘদিনের যা আমি রাতারাতি ঠিক করতে পারবো না। এর পর তিনি ফোন কেটে দেন। একটু পরেই তত্বাবধায়কের টেন্ডার সিন্ডিকেট বাহিনীর লোকজন সাংবাদিকদের নিউজ না করার জন্য অনুরোধ করেন।
উল্লেখিত দূর্নীতির বিপরীতে ঠিকাদারদের লিখিত অভিযোগ রয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ