Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

কেস স্টাডি : শিশুদের খাবারের স্বাদ অনুভূতির সমস্যা ও চঞ্চলতা

প্রকাশের সময় : ২৭ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নিপা খন্দকার এবি ব্যাংকে চাকরি করেন, তার ৩.৫ বছরের একটা মেয়ে আছে। স্বামী চাকরি করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ে। মেয়েটাকে নিয়ে তাদের রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়। এখনো স্কুলে ভর্তি করাতে পারেনি। বাবা-মা অফিসে থাকা অবস্থায় বাসায় নানীর কাছে থাকে ‘অহনা’ নামের একমাত্র মেয়েটি। বাবা-মায়ের যুদ্ধ মেয়ের খাবার নিয়ে, মেয়েকে খাওয়ানো নিয়ে। নানীর কাছেও খেতে চায় না। অহনার প্রিয় খাবার ট্যাং শরবত। অনায়াসেই ৩-৪ গ্লাস খেয়ে ফেলতে পারে। সারাদিন ট্যাং শরবত খাওয়ার জন্য নানা রকম তালবাহানা করে। বাবা-মা ২ বছর বয়স থেকেই খাবার নিয়ে যুদ্ধ করছেন। শক্ত, নরম, কোমল, তরল, ঝাল, মিষ্টি, টক, তেঁতো বহুমুখী ধরনের খাবারের মধ্যে কয়েকটা খাবারে অহনার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বা অনুভূতি আছে। এই যেমন কলা খাবে দুধ ভাতের সাথে কিন্তু এমনিতে ছিলে খাবে না, মাংস খাবে খুব কিন্তু সবজি খাবে না। অহনার মা এই খাবারের জন্য রীতিমত অভিনয় করে, ছড়া বলে, গল্প শোনায়, অহনার বাবাকেও ইনভল্ভ করে। তারপরেও খাওয়াতে কষ্ট হয়। কেননা খাওয়ার সময় অহনাকে জোর করে টেবিলে বসানো কঠিন ব্যাপার। এদিক ওদিক সে ছুটোছুটি করে। অহনার বাবা এই খাওয়ার ফাঁকে ইমাজিনেটিভ এবং ক্রিয়েটিভ কিছু খেলা শেখায় অহনাকে। এই যেমন সোফার ফোম দিয়ে ঘর বানানো, সুপারম্যান এর মুখোশ পরে অভিনয় করা ইত্যাদি। সবই করা হয় একমাত্র মেয়েকে ভালোভাবে খাওয়ানোর জন্য। মেয়ে ভালোভাবে পুষ্টিসম্মত খাবার না খেতে খেতে কাঠ হয়ে গিয়েছে। ২ বছর ধরে যুদ্ধ! ডাক্তার, পুষ্টিবিদ দেখাল মেয়ের জন্য। কিন্তু লাভ হয়ত তাৎক্ষণিক, দীর্ঘস্থায়ী না।
প্রশ্ন থেকে যায়, কি হবে তাহলে অহনার ভবিষ্যৎ? তার বাবা-মা কি এভাবেই অহনাকে আজীবন খাওয়ানোর জন্য যুদ্ধ করে যাবেন?
উপরের অনুচ্ছেদটি আবার পড়–ন। সাধারণ কিছু চিত্র বের হয়ে আসবে-
# অহনা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো সব স্বাদের খাবার নিতে চায় না
# অহনার মনোযোগ কম আর সেজন্যই সে ছুটোছুটি করে
# অহনা বুঝতে পারে যে তাকে খাওয়ানোর জন্য তার বাবা-মা তার সাথে যুদ্ধ করে
# জোর করে খাওয়ানোর ব্যাপারটা সে মেনে নিতে পারে না
# অহনার খাবার এর ধরণটা ভিন্ন ও অস্বাভাবিক (কলা খাওয়ার ব্যাপারটা, প্রচুর পরিমাণে ট্যাং শরবত)
# কিছু খাবার তার পছন্দ, বাকিগুলো অপছন্দ। সব ধরনের খাবারের গন্ধটা কি সে নিতে পারে!
# অহনা তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে সময় কম পায় আর যেটুকু পায় সেটুকু সময়ে সেই যুদ্ধ
মূল সমস্যা : অহনা খেতে চায় না/ স্বাভাবিকভাবে নিজে নিজে খেতে পারে না
খাবার গ্রহণ করা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দৈনিক কাজের মধ্যে অন্যতম একটি। এই কাজের পিছনে আমাদের উদ্দেশ্য, অর্থ এবং আত্মতৃপ্তির বিষয় থাকে, সাথে সময়ের ব্যাপারটিও। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু করার পেছনে যদি উদ্দেশ্য, অর্থ এবং তৃপ্ততাবোধ থাকে তবে তাকে কাজ বা পেশা (ঙপপঁঢ়ধঃরড়হ) বলে। এই কাজ আবার তিন প্রকার-
১) যতœমূলক কাজ ২) উৎপাদনমুখী কাজ ৩) অবসরমূলক কাজ. অহনার খাদ্য গ্রহণের বিষয়টি তার জন্য যতœমূলক কাজ এবং যেটা ভালোভাবে সম্পন্ন না হলে তার দৈনিক কর্মব্যস্ত জীবনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। অহনার এই সমস্যা বা রোগটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ঋববফরহম উরংড়ৎফবৎ’, একে অন্যভাবে ‘ঝবহংড়ৎু ফুংভঁহপঃরড়হ’ ড়ৎ ‘এঁংঃধঃড়ৎু ফুংভঁহপঃরড়হ’ ড়ৎ ‘ঝসবষষ ফুংভঁহপঃরড়হ’ ও বলা যেতে পারে। এই সমস্যাগুলো আবার মনোযোগ এবং অন্যান্য ইন্দ্রীয় অনুভূতির সাথে জড়িত বলে অঃঃবহঃরড়হ উবভরপরঃ ঐুঢ়বৎধপঃরারঃু উরংড়ৎফবৎ (অউঐউ) ড়ৎ অঁঃরংস ঝঢ়বপঃৎঁস উরংড়ৎফবৎ (অঝউ) ড়ৎ ঝবহংড়ৎু চৎড়পবংংরহম উরংড়ৎফবৎ (ঝচউ) এ আক্রান্ত শিশুর লক্ষণের সাথে মিলে যায় এবং তাদেরও এই ধরনের সমস্যা থাকে। মূল কথা হচ্ছে সমস্যার সমাধান করবে কে? করবে একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট যিনি একজন শারীরিক, মানসিক, সামাজিকভাবে অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, সহায়ক সামগ্রী, পারিপার্শ্বিক পরিবর্তন, উদ্দেশ্যমূলক এবং অর্থবোধক কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে কাজে বা পেশায় স্বাবলম্বী ও স্বচ্ছল করে তোলেন। অহনার দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়গুলোকে একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এসেসমেনট এর মাধ্যমে সমস্যা নির্ধারণ করবেন, তারপর চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি বিভিন্ন চিকিৎসা প্রদান করে একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর চিকিৎসা পদ্ধতি মূল্যায়ন করবেন। অহনার ক্ষেত্রে একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্টের উদ্দেশ্য থাকবে অহনা যাতে নিজে নিজে সব ধরনের খাবার খেতে পারে এবং সে যাতে তার দৈনিক কাজগুলোতে যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।
শিশুর খাবার সমস্যা, চঞ্চলতা, অমনোযোগী সমস্যাগুলো আর কতদিন লুকিয়ে রাখবেন? এখুনি একজন নিকটবর্তী বিশেষজ্ঞ অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন।
ষ শ. ম. ফারহান বিন হোসেন
ক্লিনিক্যাল অকুপেশনাল থেরাপিস্ট,
সেন্টার ফর স্পেশাল কেয়ার ও ফেইথ বাংলাদেশ; ফিচার সম্পাদক, হেলথনিউজবিডি
মোবাইল : ০১৬৮৫৬৫৬১৯৯
ভধৎযধহথপৎঢ়@ুধযড়ড়.পড়স



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।