Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট

বন্যায় ভেসে গেছে অর্ধশত মৎস্য খামার ১২ জেলায় পানিবন্দি তিন লক্ষাধিক মানুষ

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৩০ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম

বৃষ্টি আর ভারতের পানির ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। রংপুর কুড়িগ্রাম, গাইবান্দা, জামালপুর, বগুড়া এবং সুনামগঞ্জে কয়েক লাখ পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও খাবার পানির সঙ্কট। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে শত শত মৎস্য চাষির স্বপ্ন। গবাদি পশুর আশ্রয়স্থল নিয়ে বন্যাকবলিত অসহায় মানুষরা বিপাকে পড়েছেন। বাড়িঘরে পানি ওঠায় গবাদিপশু নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ অথবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। একদিকে বানের পানিতে তলিয়ে গেছে জমির ফসল অন্যদিকে নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ভিটে মাটি সব।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি হতে পারে। এতে চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত পানি বেড়ে বন্যা আরও কয়েক জেলায় বিস্তৃত হবে। সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, সিলেট ও সুনামগঞ্জের পাশাপাশি টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, বগুড়া এবং নেত্রকোণাসহ আরও কয়েকটি জেলা বন্যা কবলিত হতে পারে।
গেল কয়েকদিনে তিস্তা বেষ্টিত রংপুর জেলার নদীপাড়ের মানুষের আহাজারি বেড়েছে। তিস্তা নদীর স্বভাব সুলভ আচরণে ঘরবাড়ি হারিয়েছে অনেক পরিবার। চরাঞ্চলে পানিতে তলিয়েছে সবজি ক্ষেতসহ ফসলি জমি। তিস্তা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে আছে দুই হাজারেরও বেশি পরিবার। গেল ২৪ ঘণ্টায় রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি কিছুটা কমলেও বেড়েছে ভাঙন ঝুঁকি। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি। নদীগর্ভের খুব কাছাকাছি থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মক্তব নিয়ে চিন্তিত স্থানীয়রা। কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা চরে নদী ভাঙনে বিলীনের পথে চরের একমাত্র পাকা সড়কটি। এরইমধ্যে সড়কটির প্রায় ৬০০ ফুট ভেঙে গেছে। এই চরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি মসজিদ রয়েছে ভাঙনের মুখে। ওইসব এলাকায় খাবারের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
গঙ্গাচড়া ছাড়াও কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া, টেপামধুপুর, শহীদ বাগ ও নাজিরদহ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কিছু কিছু জায়গাতে পানি কমে আসলেও দুর্ভোগ কমেনি। ওই চারটি ইউনিয়নে প্রায় ৫ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছেন। অসহায় এসব পরিবারের মানুষের মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর জন্য গো-খাদ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়নি। ফলে চরম বিপাকে পড়েছে বন্যা দুর্গত মানুষজন।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নে পাঁচটি গ্রামে তিস্তার বন্যার পানিতে ভেসে গেছে প্রায় অর্ধশতাধিক মৎস্য চাষির স্বপ্ন। গত কয়েক দিন থেকে তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে বাড়িঘর। ভেসে যায় মৎস্য খামারের পাশাপাশি অসংখ্য পুকুর।
যমুনা নদীতে দ্রুত গতিতে পানি বৃদ্ধির ফলে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে শুভগাছা পাকা সড়ক তলিয়ে গেছে। এর ফলে আশপাশের এলাকায় বন্যার পানি ডুকে পড়ে ডুবে গেছে শতাধিক বাড়িঘর। এ অঞ্চলের ২ হাজার মানুষ ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বগুড়া থেকে মহসিন রাজু জানান, নিয়মিত বর্ষণের পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় ঢলের পানিতে যমুনা ও বাঙালী নদীর পানি প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে। গতকাল বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি ৫৫ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সারিয়াকান্দির মথুরাপুর পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ইতোমধ্যেই যমুনার ঢলে সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়াবাড়ি, হাটশেরপুর, কাজলা, কর্নিবাড়ি, বোহাইল, চন্দনবাইশা, কামালপুর, কুতুবপুর ইউনিয়ন এবং ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে পাট, আউশ ধানসহ বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত।
কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি হু-হু করে বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার ফলে জেলার ১৬টি নদনদীর পানি অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল বিকেলে ধরলার পানি কুড়িগ্রাম ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৬ সেন্টিমিটার ও নুন খাওয়া পয়েন্টে ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বৃদ্ধির ফলে ৭৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এতে চরাঞ্চল ও নিম্নঞ্চলসহ জেলার চার উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৭টি, সদরের ৩টি, ফুলছড়ির ৬টি ও সাঘাটা উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর অধিকাংশ রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। এছাড়া গাইবান্ধা-বালাসীঘাট পাকা সড়কটির আধা কিলোমিটার এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় সড়কের ওপর দিয়ে এখন নৌকা চলাচল করছে।
এদিকে, ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধির গতি মন্থর হলেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীভাঙনের মুখে পড়েছে জিগাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
ভারী বর্ষণ ও ভারতের ঢলে যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এ পর্যন্ত চার উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের ৫৩ গ্রাম প্লাবিত হয়ে ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকালও বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এদিকে সুনামগঞ্জের বন্যার সার্বিক অবনতি হয়েছে। শহরে বেশিরভাগ সড়ক ৫-১০ ফুট পানির নিচে ডুবে আছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর দোয়াবাজার, জামালগঞ্জ উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। অধিকাংশ এলাকার সড়কে এখন নৌকা চলাচল করছে।
জেলা প্রশাসনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, সদরের ৯টি, বিশ্বম্ভরপুরের ৫টি, তাহিরপুরের ৭টি, জামালগঞ্জের ৪টি, ছাতকের ৫টি, শাল্লার একটি, দোয়ারাবাজারের ২টি, জগন্নাথপুরের ৩টি ও ধর্মপাশা উপজেলার ৪টিসহ ৬১টি ইউনিয়ন এবং ৪টি পৌরসভার মানুষ বন্যা কবলিত হয়েছেন। দুর্গতদের জন্য ১২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ১৯৪টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। ৯ উপজেলা ও ৪টি পৌরসভায় ৬৬ হাজার ৮৬৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৪১০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বন্যা

২ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন